“লং মার্চ ” -এর রাজনীতির পথ ধরেই রাজ্য রাজনীতিতে ক্ষমতার লং মার্চ -এ মরিয়া প্রয়াস বামের

Spread the love
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

 

রাজীব মুখার্জী, হাওড়াঃ ইতিহাস প্রসিদ্ধ “লং মার্চ ” -এর সাক্ষী হয়েছিল গোটা বিশ্ব। সালটি ছিল অক্টোবর ১৯৩৪ থেকে অক্টোবর ১৯৩৫। নেতৃত্বে ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টি অফ চায়নার বিপ্লবী নেতৃত্ব মাও জেদং। যার পরবর্তী সময়ে গোটা দুনিয়া প্রত্যক্ষ করেছিল চীনের কুয়ামিংটাং সরকারের হাত থেকে ক্ষমতার রাশ কেড়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া।

শেষ মাসে নভেম্বর বিপ্লবের ১০২ তম বার্ষিকীতে উদ্ভুদ্ধ হয়ে নতুন করে নিজেদের সংগঠন ও রাজ্যের সাধারণ মানুষের মধ্যে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার মরিয়া চেষ্টায় আরেকটি “লং মার্চ” প্রত্যক্ষ করলো রাজ্যবাসী। অতীতেও রাজ্যে শিল্প চাই, বেকারদের চাকরি চাই সহ আরও বেশ কয়েকটি দাবি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সরব হওয়ার বামদল গুলি রাজ্য রাজনীতিতে ক্রমশই পেছনের সারিতে চলে গেছিলো। সেখান থেকে আগামী লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন করে সংগঠনকে চাঙ্গা করতে এই পরিকল্পনা বলছেন রাজ্যের ওয়াকিবহাল মহল। এই মাসের ২৮ ও ২৯ শে নভেম্বর রাজভবন অভিযান সংগঠিত করলো নিজেদের গণসংগঠনের কৃষক ও খেতমজুরদের নিয়ে।

২০১১ সালে যে সিঙ্গুর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে বামদল গুলির বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল সেখান থেকেই নিজেদের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রয়াস শুরু করলো অধুনা পিছিয়ে থাকা বাম দলগুলি। তাই রাজ্য রাজনীতির ইতিহাসের সেই সিঙ্গুর থেকেই ৫২ কিমি দীর্ঘ এই পদযাত্রার সূচনা করলেন বাম নেতৃত্ব। মূলত সি.পি. আই.(এম)- র কৃষক সভা ও খেতমজুর সংগঠনের উদ্যোগে দলের প্রায় সব গণসংগঠনই ওই পদযাত্রায় অংশ নিলো।

প্রসঙ্গত, ২০০৬ সালে রাজ্যে ক্ষমতাসীন হবার পর বামফ্রন্ট সরকার যে স্লোগান তুলেছিল “কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ “। সেই স্লোগানকে বাস্তবায়িত করতে গিয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ত্রুটি বিচ্যুতিতে নিজেদের দলের ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারে ফেলে দিয়েছিলো তৎকালীন বাম নেতৃত্ব। সেই সময় রাজ্যে শিল্পের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ও বেকার সমস্যা দূর করতে সিঙ্গুরে টাটাকে মোটরগাড়ি তৈরির অনুমতি দিয়েছিলেন বুদ্ধ বাবুর সরকার। আর সেই মর্মে ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ নিজ ইচ্ছায় কারখানার জন্য জমি দিয়েছিলেন সিঙ্গুরে ন্যানো প্রকল্পে।


পাশাপাশি অল্প কিছু সংখ্যক অনিচ্ছুক কৃষককে কাজে লাগিয়ে তৎকালীন বিরোধী নেত্রী ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী প্রায় ২১ দিন দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে অবরোধ করে ৯০ শতাংশ তৈরি হয়ে যাওয়া কারখানাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন গুজরাতের সানন্দে। আবার সেই সিঙ্গুর থেকেই শিল্পের দাবিতে পথে নেমেছে বামেরা। এর মধ্যে অবশ্য তিন বছর আগেও একবার শিল্পের দাবিতে সিঙ্গুর থেকে শালবনী পদযাত্রা সংগঠিত করেছিল। যার সূচনা করেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিজেই। তবে এবারের সিঙ্গুর থেকে রাজভবন অভিযান ধারে ও ভারে ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

বাম নেতৃত্বের অভিযোগ, সুপ্রীমকোর্টের রায় অনুযায়ী সিঙ্গুরে অধিকৃত সমস্ত কৃষিজমি চাষযোগ্য করে কৃষকদের ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল বর্তমান সরকারের কিন্তু জমিগুলোকে চাষ যোগ্য করার কোনো চেষ্টাই করেনি বর্তমান সরকার। বর্তমানে সিঙ্গুরের ৯৯৭ একর জমির মধ্যে মাত্র ১১ একর জমি চাষযোগ্য রয়েছে। এই রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পরে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসীন হবার ৭ বছর কেটে গেলেও রাজ্যে নতুন কোনো শিল্প হয়নি। অথচ শিল্প সম্মেলনে কোটি কোটি টাকা খরচ করলেও কোনো শিল্পপতি এ রাজ্যে বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক হননি। মৌ স্বাক্ষরিত হয়েছেন অনেক। বিনিয়োগ আসেনি।

আরো অভিযোগ মেলা, উৎসবের নামে কোটি কোটি টাকা নয়-ছয় হলেও শিক্ষক বা সরকারি কর্মীদের মহার্ঘ্যভাতা দেওয়ার টাকা সরকারি কোষাগারে নেই। রাজ্যে টেট ও এস. এস. সি. পরীক্ষা তুলে দিয়ে বেকার শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের চপ-চা-মুড়ীর দোকান খোলার নির্দেশ দিচ্ছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী।

বামেদের আরও অভিযোগ, ধান, আলু, পাট কোনো ফসলেরই কৃষকরা উপযুক্ত দাম পাচ্ছে না উল্টে উৎপাদন মূল্য কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে। মহাজনের ঋণ শোধ করতে না পেরে ইতিমধ্যেই ১৮৭ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন, রাজ্যে মহিলাদের ওপর আক্রমণ, নারী নির্যাতন, চুরি-ডাকাতি সবই বেড়েছে বর্তমান সরকারের আমলে। অথচ মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চুপ।

এই দিনের পদযাত্রা থেকে রাজ্যের পাশাপাশি কেন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধেও সরব হয়েছেন বামেরা। স্বামীনাথন কমিশন অনুযায়ী কৃষকদের ফসলের লাভজনক দাম ও কৃষিঝণ মকুবের দাবি তুলেছেন কৃষক সভা ও খেতমজুর সংগঠনের কর্মীরা।কৃষক সভা ও খেত মজুর সংগঠনের ডাকে সিঙ্গুর থেকে রাজভবন অভিযানে যে দাবিগুলো নিয়ে আওয়াজ তোলা হলো সেগুলি হলো —সিঙ্গুর সহ সারা রাজ্যে শিল্প চাই। বেকার যুবক-যুবতীদের কাজ চাই।উৎপাদন খরচের দেড়গুণ দামে কৃষকদের ফসলের লাভজনক দাম চাই।বছরে ক্ষেতমজুরদের ২০০ দিন কাজ চাই। ৬০ বছরের উর্ধ্বে শ্রমজীবী ও কৃষকদের ৬ হাজার টাকা পেনসন চাই।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারে বামেদের এই রাজভবন অভিযানের বিশেষ দুটি গুরুত্ব রয়েছে। এক, লোকসভা নির্বাচনের আগে সংগঠনকে চাঙ্গা রাখা যাবে। দুই, বিজেপির রথযাত্রা ও তৃণমূলের পাল্টা যাত্রা ঘিরে মেরুকরণের বাতাবরণ তীব্র হওয়ার সময় নিজেদের পৃথক অস্তিত্ব প্রমাণ করতে সাহায্য করবে। এবং বি. জে. পি. র রথযাত্রা রুখতে পারার কৃতিত্বেও ভাগ বসাতে পারবে।

কৃষকসভার সাধারণ সম্পাদক হান্নান মোল্লা ২৮ শে নভেম্বর সিঙ্গুর থেকে এই পদযাত্রার উদ্বোধন করেন। ঐদিন রাতে হাওড়ার বালীতে অনেক জনসাধারণের বাড়িতে বাড়িতে পদযাত্রীরা থাকেনো। পরদিন বালী খাল থেকে শুরু হয়ে পদযাত্রা বেলুড়, হাওড়া ব্রিজ হয়ে পৌঁছায় কলকাতায়। গতকালের রানি রাসমণি অ্যাভিনিউয়ের সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন দলের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র, বিমান বোস সহ অন্যান্য নেতৃত্ব। মিছিলকে কেন্দ্র করে রাস্তায় দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে লড়াইয়ের সূচনা বাম নেতৃত্ব শুরু করলেন সেই লড়াই বাম দল গুলোর পালে কতটা হাওয়া দিতে পারে এখন সেটাই দেখার।

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment