রামের পুনঃজন্মের রামায়ণে রাম, রাবনের সন্ধি, বিভীষণ ও লক্ষণ ভাই ভাই

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

রাজীব মুখার্জী, হাওড়াঃ  আজ ৬ ই ডিসেম্বর। ভারতীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে কলঙ্কিত দিন। ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর হিন্দু মৌলবাদী শক্তি প্রথমে বাবরি মসজিদের কাছে জড়ো হয় এবং সেটি ধ্বংস করে ফেলার চেষ্টা করে। এই মসজিদ মুঘল সম্রাট বাবরের নামে নামকরণ করা। এই মসজিদ ধ্বংসের পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হয়েছিল দেশব্যাপী দাঙ্গা। যার ফলশ্রুতি প্রায় দুই হাজার লোক নিহত হয় সেই সময়। নিহতদের প্রায় সবাই ছিলেন মুসলমান তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তখন থেকে মুসলমানরা ওই স্থানটিতে নতুন একটি মসজিদ নির্মাণের আহ্বান জানিয়ে আসছে।

অন্য দিকে হিন্দুরা দাবি করছে, সেটি তাদের দেবতা রামের জন্মস্থান, তাই সেখানে তারা একটি মন্দির নির্মাণ করবে। এই নিয়ে এতো বছরের দড়ি টানাটানি শেষ হয়নি। বর্তমানে এই মামলা সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন।

অতীতের প্রামাণ্য ইতিহাস বলে ১৫২৬ সালে তৎকালীন মুঘল সম্রাট জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর এ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। ১৮৮৫ সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু লোক ফৈজাবাদের আদালতে বাবরি মসজিদ প্রাঙ্গণে দেবতা রামকে সম্মান জানাতে একটি রামমন্দির নির্মাণের জন্য অনুমতি প্রার্থনা করে কিন্তু তাদের সেই আবেদন বাতিল করে দেওয়া হয় আদালতে।

১৯৪৯ সালে হিন্দুদের একটি দল মসজিদে জোর করে প্রবেশ করে রামের একটি মূর্তি স্থাপন করে আসে। পরবর্তীকালে প্রশাসন সেই মূর্তিটি না সরালেও সে জায়গাটি বন্ধ করে রাখে। পরে ১৯৮৬ সালে ফৈজাবাদের জেলা প্রশাসন জায়গাটি খুলে দিয়ে হিন্দুদের সেখানে পূজা করার সুযোগ দেয়। তারপরে ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত ছিল। ঠিক এরই মধ্যে চরমপন্থী হিন্দুরা নিজেদের রাজনীতির স্বার্থে পরিকল্পনা মাফিক আক্রমণ চালিয়ে মসজিদটি ধ্বংস করে দেয়। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে এই দেশে এখনো মামলা চলছে সুপ্রিম কোর্টে। এই মামলা আগামী শুনানির তারিখ আগামী বছরের জানুয়ারিতে নির্ধারণ করা হয়েছে।

ভারতবর্ষ বরাবরই বৈচিত্রের দেশ। এই ৬ ই ডিসেম্বর দিনটি আরেক দিকে বৈপরীত্য বহন করে চলেছে। সেই দিক থেকেও এই দিনটি সমান তাৎপর্য পূর্ণ। বাবরি মসজিদ ভাঙার কলঙ্কিত ইতিহাসের পাশাপাশি এই দিন ভারতীয় গণতন্ত্রের অন্যতম রূপকার বাবা সাহেব আম্বেদকরের মৃত্যু দিবস। এদিনই বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিল। ভারতের সংবিধান রচনার প্রধান কারিগর, সমাজসংস্কারক, রাজনীতিবিদ এবং অর্থনীতিবিদ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন বাবা সাহেব আম্বেদকর। যিনি এদেশে দলিত ও পিছিয়ে পড়া বর্ণের মুখ হিসাবে পরিচিত।

এই দেশে সব কিছুই একটি নির্দিষ্ট দিনে বিশেষ ভাবে জনমানসে ভাসিয়ে রাখার কাজ করে এদেশের খারাপ ভালোর অধিকার প্রাপ্ত্য রাজনৈতিক দল গুলো। তাই সেই পরম্পরা বজায় রেখেই আজ বৃহস্পতিবার কলকাতা শহরের একাধিক জায়গাতে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ২৬ বছরে প্রতিবাদী এবং হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতির জন্য একাধিক মিছিল করে বিভিন্ন সংগঠন। সিপিএম, কংগ্রেসের পাশাপাশি অল ইন্ডিয়া মজলিশ-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিম(A.I.M.I.M.), সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন এবং মুসলিম উলেমা সংগঠনগুলি৷

আজকে মহাজাতি সদন থেকে সি.পি.এম-এর নেতৃত্বে বাম জোটগুলির একটি মিছিল হবে৷ চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, এমজি রোড, শিয়ালদহ, মল্লিকবাজার, পার্কসার্কাস হয়ে বামেদের মিছিল ঘুরবে বলে পুলিশ সূত্রের খবর৷ অল ইন্ডিয়া মজলিশ-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিম(A.I.M.I.M.) মিছিল পার্কসার্কাস থেকে শুরু হয়ে রানী রাসমণি অ্যাভিনিউ অবধি আসবে৷ শিয়ালদহ স্টেশন থেকে আর একটি মিছিল আসবে রানী রাসমণি রোড অবধি৷বাবরি মসজিদ ভাঙার দিনটিকে এক কলঙ্কিত দিন হিসেবে প্রতিবছরই স্মরণ করে আসে সিপিএম৷

২০১৯ সালের নির্বাচনের নির্ঘন্ট প্রকাশ হওয়ার পড়ে এই মুহূর্তে কেন্দ্রে বিজেপির সরকারের বিরুদ্ধে সেই সমাবেশকে আরও জোরালো করে সংখ্যালঘুদের বার্তা দিতে চাইছে বলেই রাজনৈতিক মহলের মত৷ আজ দুপুর ৩ টের সময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখতে এবং গণতন্ত্র বাঁচাতে বিজেপির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলনের ডাক দিয়ে ‘সংহতি যাত্রা’ শুরু করেছে হাওড়া তৃণমূল কংগ্রেসও। মূলত বিজেপির রথযাত্রার পাল্টা জবাবে হাওড়া জেলাতে এই ‘সংহতি যাত্রা’ জানা যাচ্ছে। হাওড়ার ময়দান এলাকা থেকে শুরু হয় এই সংহতি যাত্রা।

এই মিছিলে উপস্থিত রাজ্যের সমবায় মন্ত্রী অরূপ রায় বলেন, “বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের জন্য তৎপরতা চালাচ্ছে, তারই বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য আজ ৬ই ডিসেম্বর রাজ্যের সব জেলাতেই চলছে এই সংহতি যাত্রা। কেন্দ্রীয় মোদি সরকার সংবিধান মানছে না। আজ আমাদের সংবিধান আক্রান্ত। রাজ্যের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও আঘাত করতে চাইছে। সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ থেকে শুরু করে আমাদের অনেক মুক্তমনা বুদ্ধিজীবী খুন হয়েছেন। রাজ্যে রথযাত্রার নামে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করছে বিজেপি। তাই সংবিধান দিবসে বিজেপির রথযাত্রার পাল্টা আমরা সূচনা করলাম সংহতি যাত্রার।”

তিনি আরো বলেন, “বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এই রাজ্যে সংখ্যালঘু এবং দলিত নির্যাতন বেড়েছে। এখন আমাদের সংবিধান সাংঘাতিকভাবে আক্রান্ত। সংবিধানের মূল চরিত্র “ধর্মনিরপেক্ষতা” আক্রান্ত। আজ দেশজুড়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হচ্ছে। বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। দলিত ও আদিবাসী সমাজের ন্যায্য অধিকার দেওয়া হচ্ছে না। তাই সংবিধান রক্ষা করার লক্ষ্য নিয়ে এবং বিজেপির রথযাত্রার পাল্টা হিসেবে আমরা শুরু করেছি সংহতি যাত্রা।”

অন্যদিকে চলতি মাসের ১৮ তারিখে কলকাতায় ‘হুঙ্কার সভা’র মতো সভা করার কথা জানিয়েছে সংঘ পরিবার৷ রাম মন্দির নিয়ে সারা দেশেই একের পর এক কর্মসূচি নিয়েছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল এবং আরএসএসের মতো হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি৷ একাধিক জায়গাতে সাধু-সন্তদের নিয়ে সমাবেশ করেছে তারা৷ রাজ্যের প্রতিটি জেলায় গেরুয়া সমাবেশের পাশাপাশি রাম মন্দিরের দাবি নিয়ে রাজ্যের প্রত্যেক সাংসদদের দ্বারস্থ হচ্ছে ভিএইচপি ৷


সংগঠনটির বাংলার মিডিয়া কো-অর্ডিনেটর সৌরিশ মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, “প্রতিটি এলাকা থেকে সাধারণ মানুষের এক বড় অংশ এবং সংগঠনের ‘প্রতিনিধিমন্ডল’ নিজেদের কেন্দ্রের সাংসদের সঙ্গে দেখা করছে রামমন্দির নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা জানাতে৷ তারা সেই সাংসদকে অনুরোধ করবেন যাতে তিনি লোকসভায় প্রধানমন্ত্রীকে রামমন্দির তৈরির জন্য চাপ দেন৷ রামমন্দির তৈরি হলেই রাজ্যের অগণিত রামভক্ত মানুষের বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা মিটবে৷”

প্রসঙ্গত, আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের প্রচারের অংশ হিসেবে বিজেপি আগামী কাল থেকে রাজ্যজুড়ে তিনটি সুসজ্জিত প্রচার রথ বের হওয়ার কথা ছিল। তিনটি আধুনিক বাসকে রূপান্তর করা হয়েছিলো এই রথে। এই রথ পশ্চিমবঙ্গের ৪২ টি লোকসভা কেন্দ্র পরিভ্রমণ করে মিলবে এসে কলকাতায়। তারপর আগামী ২৩ শে জানুয়ারি কলকাতায় ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত বিজেপির মহাসমাবেশে যোগ দেবে এই রথের সারথি সহ অন্যরা।

সেই রথযাত্রা রুখে দেওয়ার জন্য সিপিএম রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র আজ মিছিল শেষে বলেন, “বিজেপির ওই রথের চাকায় লেগে আছে আমাদের ভাই হত্যার রক্ত। এবার ৬ই ডিসেম্বর আমাদের পথে নেমে রুখে দিতে চাই ওই রথের চাকা। কারণ, ভগবান জগন্নাথ দেবের রথ নয় এটি। এটা বিজেপির ভোটের রথ”।

তিনি আরও বলেছেন, তাই দেশের ১৭টি বাম দল আজ ৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দিনে ‘সম্প্রীতি দিবস’ পালন করছে। বিজেপির রথ বের হওয়ার পূর্ব নির্ধারিত তারিখ ছিল আগামী ৭, ৯ ও ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮। ৭ই ডিসেম্বর কোচবিহার থেকে শুরু হবে, ৯ই ডিসেম্বর দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগরদ্বীপ থেকে শুরু হবে আর ১৪ই ডিসেম্বর বীরভূমের তারাপীঠ থেকে শুরু হবে।

ভারতের উত্তরপ্রদেশে ১৬ শতকের ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ২৬বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ ৬ই ডিসেম্বর। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক ভাষ্যকারেরা বলছেন, হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা আগামী নির্বাচনের আগে মুহূর্তে নিজেদের ভোটব্যাংক সমৃদ্ধ করতে ইস্যুটিকে কাজে লাগাতে চাইছে। এরই মাঝে রথ যাত্রা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে বড়সড় ধাক্কা খেলো রাজ্য বিজেপি। রথযাত্রার অনুমতি দিল না কলকাতা হাইকোর্ট। দীর্ঘ সওয়াল জবাব শেষে বিজেপির গণতন্ত্র বাঁচাও রথযাত্রার অনুমতি দিল না কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী।

মূলত আইনশৃঙ্খলা ইস্যুতেই বিজেপির রথযাত্রার আবেদন খারিজ করে দিল আদালত। শুধু তাই নয়, গত বুধবার সওয়াল জবাবের মধ্যে জমা পড়ে রাজ্য গোয়েন্দা রিপোর্ট। যেখানে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় যে যেভাবে রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে কোচবিহার তাতে রথযাত্রার দিন অশান্তির আশঙ্কা রয়েছে। এই রিপোর্ট খতিয়ে দেখার পরেই আদালত বিজেপির আবেদন খারিজ করে দেয়।

একই সঙ্গে আদালত নির্দেশে জানায়, ৯ই জানুয়ারি পর্যন্ত রাজ্যে কোথাও রথযাত্রা সংক্রান্ত কোনও মিছিল বা সমাবেশ করা যাবে না। ফলে কবে হবে বিজেপির এই রথযাত্রা তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। আজকের শুনানিতে বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর এজলাসে রাজ্য সরকার মুখবন্ধ খামে রিপোর্ট জমা দেয়।

রাজ্যের আডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত জানান, কোচবিহারের পুলিশ সুপার রথযাত্রার অনুমতি দেননি। কেন অনুমতি দেননি তা নিয়ে মুখবন্ধ খামে বিশদে রিপোর্ট রয়েছে। এরপরেই পালটা হলফনামা জমা দেয় বিজেপি। এরপর দীর্ঘক্ষণ ধরে চলে দুপক্ষের মধ্যে সওয়াল-জবাব। সওয়াল জবাব শেষে আদালত বিজেপির আবেদন খারিজ করে দেয়। এই ঘোরালো রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজ্য বি. জে. পি. র নতুন পদক্ষেপ কি হবে এখনও কিছু জানা যাচ্ছে না। আমরা কথা বলেছিলাম রাজ্য বি. জে. পি.- র অন্যতম মুখ জয় ব্যানার্জীর সাথে।

তিনি জানান, “আমি দিল্লিতে আছি। এই নিয়ে সুস্পষ্ট জানি না। খোঁজ নিয়ে জানাবো “। সিদ্ধান্ত যাই হোক যেভাবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও দলীয় রাজনীতির জাঁতাকলে সাধারণ মানুষ পিষছে তাঁদের দৈনন্দিন জীবন যাত্রায়, সেখানে রথ বা রাম কতটা তাঁদের কঠিন জীবনে সুরাহা আনবে সেই নিয়ে ভাবনার জায়গাতে কোনো রাজনৈতিক দল নেই। সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানের জায়গাতে রাম মন্দির বা সংহতি, সম্প্রীতি দিবসের মিছিল কতটা সুদূরপ্রসারী হয় তা এই মুহূর্তে দিন আনি দিন খাওয়া মানুষের মধ্যে কতটা ছাপ ফেলে সেইটার দিকে তাকিয়ে আছে ওয়াকিবহাল মহল।

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment