আমার জীবনকথা ভাগ-৬

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হাওড়াবাসীর নানা রঙের দিনগুলি ভাগ-১

রোটারিয়ান স্বপন কুমার মুখোপাধ্যায়

আমাদের হাওড়ার পঞ্চাননতলার বাড়ি থেকে পঞ্চাননতলা রোডের উপর হাওড়া টাউন স্কুল খুবই কাছে ছিল। ওই স্কুলে ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে চতুর্থ শ্রেনিতে আমাকে আমার পিতৃদেব ভর্তি করে দেন। আমার বড় বোন মিনতি বড়িশায় দাদামশাই-এর কাছে থাকত বলে “বড়িশা গার্লস হাইস্কুলে” পড়ত। স্কুলটি সাবর্ণপাড়ায় দ্বাদশ শিব মন্দিরের কাছে আজও আছে। আমার মেজদিদি প্রনতি হাওড়া ময়দানের কাছে হাওড়া গার্লস স্কুলে পঞ্চম শ্রেনিতে ভর্তি হয়। আমার সেজো বোন কল্পনা তৃতীয় শ্রেনিতে ও ন’বোন ঝরনা দ্বিতীয় শ্রেনিতে ওই স্কুলেই ভর্তি হয়। আর ছোট বোন বন্দনার বয়স তখন তিন বছর। এসব ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসের কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখনও চলছে। সেইসময় রেশন কার্ড দেখিয়ে চাল,আটা, চিনি, সরষের তেল, কেরোসিন তেল, কয়লা ও শাড়ি, ধুতি ও শার্ট-প্যান্টের কাপড় লাইন দিয়ে সীমাবদ্ধের মধ্যে রেশন দোকান থেকে জনপ্রতি দেওয়া হত। পিতৃদেবের সময়াভাবে এসব কাজ ও কালীবাবুর বাজার থেকে প্রত্যহ বাজার করা ছিল আমার দায়িত্ব যখন আমার বয়স ছিল দশ বছর। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি হলেও- রেশন ব্যবস্থা আগের মতোই বলবৎ ছিল। সেইসময় পাঁঠার মাংস সের প্রতি ২ টাকা চার আনা ছিল। পার্শে, বাগদা ও গলদা চিংড়ি, ট্যাংরা মাছ সের প্রতি দেড় টাকা। ১০/১৫ সের ওজনের কাতলা মাছের কাটা ছিল মাংসের চেয়ে চার আনা বেশি। বাটা মাছ, ন্যাদশ মাছ, বেলে মাছ ছিল এক টাকা সের। ইলিশ মাছ ওজনে বিক্রি হত না। গঙ্গার ইলিশ একসের ওজনের থাওকো দাম ছিল এক টাকায় একটা। ৭/৮ জনের কাঁচা বাজার এক টাকায় পাওয়া যেত। আজকের যে মিষ্টি ৪ টাকা সেটা ৪ পয়সা অর্থাৎ এক আনায় পাওয়া যেত। সেইসময় হিন্দুরা মুরগির ডিম খেত না-তারা বড় বড় সাইজের হাঁসের ডিম খেত। একটা ডিমের দাম ছিল দু’ আনা। এক টাকায় ৮টা ডিম কিনলে একটা ডিম ফাউ দিত। ফাইন চালের সের দশ আনা। সরষের তেল একসের এক টাকা। এসব লিখতে পারছি যেহেতু আমি নিজে বাজার করতাম। ১৯২৮ সালে সোনার ভরি ছিল কুড়ি টাকা। ষাটের দশকে ভরির দাম ছিল ৯০ টাকা। সত্তর দশকে এর দাম ছিল ২৫০ টাকা। ১৯৭৭ সালে যে বছর মোরারজি দেশাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী সেই বছরে হঠাৎ সোনার ভরি হয়ে গেল ৫০০ টাকা। যাইহোক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ১৯৪৫ সালে শেষ হলেও ভারতে ওই সালে নউ-বিদ্রোহ হয়েছিল। মুসলিম লিগের সর্বময় কর্তা পাকিস্তানের দাবিতে ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের’ ডাক দিলেন কায়েদে আজম মহম্মদ আলি জিন্না। সেইসময় হাওড়া ও কলকাতায় হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা শুরু হয়। হুগলি জেলায় বিশেষ করে চন্দননগরে তেলিনিপাড়ায় প্রচন্ড দাঙ্গা শুরু হয়। শুনেছি পরে ওই দাঙ্গা নোয়াখালিতেও ছড়িয়ে পরে। পরবর্তীকালে বিহারেও ওই দাঙ্গা বিস্তারিত। বয়স অল্প থাকার জন্য আর কোথায় কি হয়েছে আমার জানা নেই। কিন্তু হাওড়ায় ১৬ই আগস্ট, ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট ওই দাঙ্গা সমানে চলেছে। অনেক দোকান ও বস্তিতে আগুন জ্বলছে-অনেকের প্রানহানি হয়েছে। ১৬ই আগস্ট থেকে ২৪শে আগস্ট, ১৯৪৬ সালে আমরা গৃহবন্দি ছিলাম। ওই আটদিন ডাল, ভাত, কচু আর পেঁয়াজ ছাড়া বাড়িতে কোনো খাদ্য জোটেনি। এই অসহনীয় অবস্থার মধ্যে বাস করার পর আমার পিতামহ বালির বাড়ি থেকে তাঁর চেভ্রোলেট গাড়ি পুলিশ প্রহরায় পাঠিয়ে নিঃস্ব অবস্থায় আটদিন পর আমাদের সকলকে নিয়ে যান বালির বাড়িতে। যতদূর মনে পড়ে দুর্গাপূজার পর আমরা আবার হাওড়ার বাড়িতে ফিরে আসি কারন আমাদের স্কুলের বাৎসরিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে। বোনেরা স্কুলে যেত না কারন ওদের স্কুলে যেতে হলে মুসলিম অধ্যুসিত এলাকা পার করতে হত।

ক্রমশ…..

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment