ট্রেনে ঈদ যাত্রায় অনেক প্রস্তুতি সত্বেও বিপর্যয় সময়সূচিতে

ট্রেনে ঈদ যাত্রায় অনেক প্রস্তুতি সত্বেও বিপর্যয় সময়সূচিতে

বেঙ্গলটুডে প্রতিনিধি, ঢাকা:

পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ করতে সড়ক, রেল ও নদীপথে ছুটছে মানুষ। ঈদ যাত্রায় আগের বছরগুলোর চেয়ে দুর্ভোগ এখন পর্যন্ত কিছুটা কম। তবে ১৪ জুন সবচেয়ে বেশি যাত্রীর চাপ ভোগান্তির মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে একতা এক্সপ্রেস ট্রেনটির ছাড়ার সময় ছিল সকাল ১০টা। ট্রেনটি ছাড়তে ছাড়তে ২০ মিনিট দেরি হয়। গন্তব্যে পৌঁছার কথা সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে।

বিকেল ৫টায় রেলওয়ের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ট্রেনটি তখন নাটোর রেলস্টেশন পার হচ্ছিল। রাত ৯টাও গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে না বলে জানানো হয়। ওই ট্রেনেই ভিড়ে ঠাসা বগিতে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী হাসানুজ্জামান আখন্দ মোবাইল ফোনে বলেন, ‘দিনাজপুরে কখন ট্রেন গিয়ে পৌঁছবে বুঝতে পারছি না। ভিড়ের ঠেলায় এক কামরা থেকে অন্য কামরায় এসে পড়েছি। তবু ট্রেন থামেই।’ ঈদুল ফিতরের উৎসব পরিবারের সঙ্গে উদ্যাপন করতে কয়েক দিন ধরেই রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে মানুষ। ১৩ই জুন থেকে শুরু হয়েছে বিশেষ ট্রেন সেবা। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বাংলাদেশ রেলওয়ে বিভিন্ন রুটে নিয়মিত ট্রেন ছাড়াও ৯ জোড়া বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে। আগে আগে নানা প্রস্তুতি নেওয়া, আন্তনগর ট্রেনের সাপ্তাহিক বিরতি বাতিল সহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার পরও ট্রেনের সময়সূচি ভেঙে পড়েছে। বৃহস্পতিবার যাত্রীর চাপ আরো বাড়বে।

জানা যায়, বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রী তোলার কারণে রাজধানী থেকে ছেড়ে যাওয়া ৬৩টি ট্রেনই ছিল যাত্রীতে ঠাসা। আর যাত্রী তুলতে গিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি সময় থামতে হওয়ায় ট্রেনগুলোর বেশির ভাগই গন্তব্যে পৌঁছে দেরিতে। ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্তই ২১টি ট্রেন কমলাপুর থেকে ছেড়ে যায়। কমলাপুর থেকে বেশির ভাগ ট্রেনের ছেড়ে যেতে দেরি হয়। সেই সঙ্গে বিভিন্ন ট্রেনে পর্যাপ্ত আসন, বগি ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকায় তীব্র গরম ও ভিড়ে যাত্রীদের খুব ভোগান্তি পোহাতে হয়।

১৩ই জুন রাজশাহী, জামালপুর, দেওয়ানগঞ্জ, দিনাজপুরের পার্বতীপুর, লালমনিরহাট ও খুলনার উদ্দেশ্যে কমলাপুর ছেড়ে যাওয়া ঈদের বিশেষ ট্রেনে ছিল প্রন্ড ভিড়। দেওয়ানগঞ্জগামী বিশেষ ট্রেন সকাল পৌনে ৯টায় ছাড়ার কথা ছিল। তা ছেড়ে যায় প্রায় এক ঘণ্টা পর। ছাদের যাত্রীরা তখন রোদ মাথায় নিয়ে অপেক্ষায় ছিল। জানালায় পা রেখে ট্রেনের ছাদে উঠতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন সবজি ব্যবসায়ী সবুজ মিয়া। অন্যরা সহযোগিতা করায় তিনি কোনো রকমে ছাদে ওঠেন, তবে ছাদেও ছিল ভিড়।

খুলনার উদ্দেশ্যে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি কমলাপুর ছাড়ার নির্ধারিত সময় ছিল সকাল ৬টা ২০ মিনিট। সেটি ছেড়ে যায় সকাল ৭টা ১৭ মিনিটে। এরপর প্রতিটি রেলস্টেশনেই ট্রেনটি নির্দিষ্ট সময়ের বেশি সময় দাঁড়িয়েছে। বিকেল পৌনে ৫টায় ট্রেনটি যশোর স্টেশন পার হচ্ছিল। তখন পর্যন্ত ট্রেনটির দেরি হয় দুই ঘণ্টা ২৪ মিনিট। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি রংপুরের উদ্দেশ্যে ছাড়ার সময় ছিল সকাল ৯টা। ১০ মিনিট দেরিতে ছাড়ার পর বিকেল সাড়ে ৪টায় বগুড়ার আদমদীঘি স্টেশনে ছিল ট্রেনটি। ট্রেনটির গন্তব্যে পৌঁছার কথা ছিল ৫টা ৫৪ মিনিটে। অর্থাৎ বগুড়া পৌঁছার আগ পর্যন্ত বিলম্ব হয় এক ঘণ্টা ২৪ মিনিট।

কমলাপুর থেকে লালমনিরহাটের উদ্দেশ্যে লালমনি বিশেষ ট্রেনে যুক্ত করা হয়েছে মেরামত করা বগি ও ইঞ্জিন। এটি কমলাপুর ছেড়ে যায় দুই ঘণ্টা দেরিতে। এ ট্রেনে বাড়ি যেতে আগের রাত থেকেই যাত্রীরা কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশনে প্রস্তুতি নিয়ে বসে ছিল। তবে সবচেয়ে কম দেরি হয় সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনে। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ট্রেনটি বিকেল ৩টায় নির্ধারিত সময়ে ছাড়ে। ট্রেনটি শ্রীবরদী স্টেশনে যাওয়ার আগেই দেরি হয়ে যায় ১৩ মিনিট। রাজধানীর কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশনে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ট্রেন ধরার জন্য আসা যাত্রীদের ভিড় ছিল উপচে পড়া। সারা রাত নির্ঘুম কাটিয়ে গত ৪ জুন সকালে আগাম টিকিট পেয়েছিল এসব যাত্রী। তাদেরই একজন হারিছ আলী ভোর ৬টার আগেই সুন্দরবন ট্রেনে ওঠার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন কমলাপুর রেলস্টেশনে। ভিড় ঠেলে ওঠেন ঠিকই; কিন্তু ট্রেন ছাড়ে দেরিতে। সকালে আধাঘণ্টা দেরিতে ছাড়ে ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়াগামী তিতাস কমিউটার, জামালপুরের তারাকান্দিগামী অগ্নিবীণা ট্রেনটি। আগাম টিকিট নেওয়া যাত্রীর পাশাপাশি টিকিটবিহীন যাত্রীর ভিড়ও ছিল কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশনে।

ট্রেনের সময়সূচি কেন ভেঙে পড়ল, জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন এদিন বিকেলে বলেন, ‘আমি রেলমন্ত্রী মহোদয়কে নিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে পরিস্থিতি দেখেছি। বিকেল ৩টা পর্যন্ত ৩০টি ট্রেন ছেড়ে গেছে। তার মধ্যে লালমনি এক্সপ্রেসসহ দুটি ট্রেনের একটু দেরি হয়েছে। কমলাপুর স্টেশন ছাড়ার পর বিভিন্ন স্টেশনে যাতে যাত্রাবিরতি বেশি না হয় সে জন্য আমরা তদারকি বাড়িয়েছি। বিভিন্ন স্থান থেকে ট্রেন যাত্রী নিয়ে আসার পর ট্রেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে দ্রুত, তার পরই ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।’ বিভিন্ন লাইনে ট্রাফিক থাকায় একটু সমস্যা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

আমজাদ হোসেন আরো বলেন, ‘কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনের ছাদে যাত্রী পরিবহনের বিষয়ে তদারকি বাড়ানো হবে। ঈদের জন্য যাত্রীর বাড়তি চাপ বড় কষ্টে সামাল দিতে হচ্ছে।’

You May Share This
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *