চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা চক্র কসবায়, ধৃত দুই

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অরিন্দম রায় চৌধুরী, কলকাতাঃ

কসবার রাজডাঙা অঞ্চলে ভুয়ো অফিস সাজিয়ে প্রতারণার কারবার ফেঁদে বসেছিলেন দুই মূর্তিমান । ভুয়ো সংস্থার গালভরা একটা নাম দেওয়া হয়েছিল—ব্র্যান্ডসন ম্যানপাওয়ার কনসালটেন্সি। উদ্দেশ্য ছিল, সরকারি-বেসরকারি সংস্থায় নিশ্চিত চাকরির লোভ দেখিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের থেকে প্রচুর টাকা হাতিয়ে চম্পট দেওয়ার। কসবা থানার পুলিশ বাধা হয়ে দাঁড়াল।

কোনও নির্দিষ্ট খবর থানার কাছে ছিল না। প্রতারণার অভিযোগও জানাননি কেউ। স্রেফ নজরদারি থেকেই মিলেছিল চক্রের খোঁজ, গতকাল। এলাকায় নিয়মমাফিক নজরদারি চালাচ্ছিলেন থানার তিনজন কনস্টেবল। তাদেরই একজন, আশিস চক্রবর্তীর চোখে পড়ল রাজডাঙার একটি কমপ্লেক্সের নিচে যুবক-যুবতীদের ভিড়।

কী ব্যাপার ? খোঁজ নিয়ে আশিস জানলেন, একটি ম্যানেজমেন্ট সংস্থার পক্ষ থেকে ইন্টারভিউ চলছে সেখানে।সংস্থার নাম, ব্র্যান্ডসন ম্যানপাওয়ার কনসালটেন্সি। আশিসবাবুর সন্দেহ হয়। এ তল্লাটে এমন কনসালটেন্সি সংস্থার কথা আগে তো শোনেননি। হঠাৎ গজিয়ে উঠল ?

ইন্টারভিউ দিতে আসা যুবকযুবতীদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললেন আশিস। জানা গেল, একটি বিখ্যাত বাংলা দৈনিকের পাতায় নাকি ফলাও করে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল এই সংস্থা। সঙ্গে ঢালাও প্রতিশ্রুতি। ইন্টারভিউতে পাশ করলেই ভারতীয় রেল, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক সহ সরকারি-বেসরকারি নানা ক্ষেত্রে চাকরির গ্যারান্টি।

সেই বিজ্ঞাপন দেখেই প্রায় ৫৫০-৬০০ জন চাকরিপ্রার্থীর ঢল সংস্থার অফিসের সামনে। প্রত্যেকের নাম নথিভুক্তিকরণের জন্য বরাদ্দ মাথাপিছু ২০০ টাকা। ইন্টারভিউয়ের পরে ওয়েবসাইট থেকে ফলাফল জেনে নেওয়ার কথা বলেছেন কর্তৃপক্ষ। ফলাফল ইতিবাচক হলে অর্থাৎ ইন্টারভিউতে উতরোলে তবেই জমা দিতে হবে মোটা টাকা।

ঝাঁ চকচকে অফিস, নিজস্ব ওয়েবসাইট, বিখ্যাত দৈনিকে বিজ্ঞাপন.. সন্দেহের তেমন কারণ খুঁজে পাননি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চাকরির খোঁজে ছুটে আসা ওইসব যুবক-যুবতীরা।

সন্দেহ দৃঢ় হল আশিসের। এরা কারা ? এভাবে চাকরি হয় নাকি ? থানায় জানালেন সব। থানার ওসি সঙ্গে সঙ্গে গঠন করলেন টিম। ছক কষা হল। ঠিক হল, কনস্টেবলদেরই একজন,লাল্টু হালদার, চাকরিপ্রার্থী সেজে ইন্টারভিউ দিতে যাবেন। বাইরে লাল্টুর সঙ্গে আসা বন্ধু হিসেবে অপেক্ষায় থাকবেন দুই সাব-ইন্সপেক্টর মানসী পাত্র ও প্রেমশঙ্কর ওঝা। সাদা পোশাকের পুলিশও ছড়িয়ে থাকবে চারপাশে।


লাল্টু গেলেন ইন্টারভিউ দিতে। তাঁকে সংস্থার ‘ডিরেক্টর’ গোপাল পাঁজার সামনে হাজির করা হল। ‘ ভারতের জাতীয় পতাকায় কয়টি রং আছে ?’ জাতীয় কয়েকটি প্রশ্নের পরেই জানানো হল, লাল্টু পরের ধাপে উত্তীর্ণ হয়েছেন।ওয়েবসাইটে লাল্টুর নাম লিখে সার্চ দিলেই দেখা যাবে ‘ কোয়ালিফায়েড ‘। মেল করে নিয়োগপত্র পাঠানো হবে অল্পদিনের মধ্যেই। তখন ষাট হাজার টাকা দিতে হবে।

বসে, ওসি দেবাশিস দত্ত। দাঁড়িয়ে, বাঁ দিক থেকে, কনস্টেবল আশিস চক্রবর্তী ও লাল্টু হালদার, সাব-ইন্সপেক্টর মানসী পাত্র, প্রেমশঙ্কর ওঝা ও শুভঙ্কর রায়।

বাইরে তখন ভুয়ো সংস্থার ভুয়ো ‘পাবলিক রিলেশন অফিসার’ সমীর বিশ্বাসের সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলেছেন মানসী ও প্রেমশঙ্কর। একটু চাপ দিতেই কথায় কথায় ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে এল। নথিভুক্তকরণের টাকা এবং কিছুদিন পরে ভুয়ো নিয়োগপত্র বাবদ টাকা… সব গুছিয়ে নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল গোপাল-সমীরের।

ধরা হল দুই প্রতারককে। অফিস থেকে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা, জাল নিয়োগপত্র, চাকরিপ্রার্থীদের বায়োডেটা সহ অসংখ্য প্রামাণ্য নথি। প্রাপ্ত নথি থেকে এবং অপরাধীদের জেরা করে জানা যাচ্ছে,ইতিমধ্যেই ৮০০-রও বেশি যুবকযুবতী ইন্টারভিউয়ের নামে প্রতারিত হয়েছেন।

সম্পর্কিত সংবাদ