Saturday, August 13, 2022
spot_img

আজ রাজা রামমোহন রায়ের জন্মবার্ষিকীতে গুগলের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন

শর্বাণী দে, বেঙ্গল টুডে

রাজা রামমোহন রায় ১৭৭২ সালে ২২ মে হুগলী জেলার রাধানগর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত কুলীন বংশে জন্মগ্রহন করেন। বাবা বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ রামকান্ত রায় ও মা শৈব তারিণীদেবী । এদিন এই মহান মানুষের জন্মবার্ষিকীতে গুগল ডুডলের তরফ থেকেও সম্মান জানানো হয়। এদিন গুগলের এই ডুডলের মাধ্যমে প্রত্যেক ভারতবাসিকে মনে করিয়ে দেন “আধুনিক ভারতে স্রষ্টা এবং “ভারতীয় নবজাগরণের পিতা” কথা।

রামমোহন রায় তার বাবা মায়ের ভিন্ন দর্শন শৈশব থেকেই প্রভাবিত হয়েছিলেন। রামমোহন রায় পনেরো-ষোলো বছর বয়সে তিনি গৃহত্যাগ করে নানাস্থানে ঘোরেন। কাশীতে ও পাটনায় কিছুকাল ছিলেন এবং নেপালে গিয়েছিলেন। তিনি বারানসী থেকে প্রথাগত সংস্কৃত শিক্ষার পর তিনি পাটনা থেকে আরবি ও পারসি ভাষা শেখেন। পরে তিনি ইংরেজি, গ্রিক ও হিব্রু ভাষাও শেখেন। সমাজের অচলায়তন গুঁড়িয়ে দেওয়া রামমোহনের জীবনের শুরুটা কিন্তু ছিল হিন্দু আটপৌরে রীতিনীতিতে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা। সামাজিক নিয়ম মেনে তাঁরও বিয়ে হয়েছিল অল্প বয়সে এক নাবালিকার সঙ্গেই। অল্প দিনেই মৃত্যু হয় প্রথমা স্ত্রীর। তারপর দ্বিতীয় বিয়ে। দ্বিতীয়া স্ত্রী জন্ম দেন দুই পুত্রের। রাধাপ্রসাদ ও রমাপ্রসাদ। দু ভাইয়ের বয়সের ব্যবধান ছিল ১২ বছর। দ্বিতীয়া স্ত্রীর প্রয়াণে ১৮২৪ সালে তৃতীয় বিয়ে করেছিলেন ৫২ বছর বয়সী রামমোহন রায় ।

এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত তান্ত্রিক হরিহরানন্দ বিদ্যাবাগীশ তিনি রামমোহনকে নিয়ে গিয়েছিলেন উইলিয়াম কেরীর কাছে। ধর্ম প্রচারক কেরীসাহেব তখন ভারতীয় সভ্যতার সঙ্গে পরিচিত হতে সেতু খুঁজছিলেন। রামমোহন হয়ে উঠলেন তাঁর সেই সেতুবন্ধন। এরপর ১৭৯৫-১৭৯৭ অবধি একসঙ্গে কাজ করেছিলেন কেরী-রামমোহন-বিদ্যাবাগীশ। রচনা করেছিলেন বিখ্যাত বই ‘মহানির্বাণ তন্ত্র’। প্রচারিত হয়েছিল একেশ্বরবাদের তত্ত্ব । কিন্তু এরপর আলাদা হয়ে যায় কেরী সাহেব আর রামমোহনের চলার পথ । রামমোহন চেয়েছিলেন হিন্দু ধর্মের সঠিক রূপ ও মাহাত্ম্য ব্রিটিশদের কাছে তুলে ধরতে । হিন্দুধর্ম মানেই যে শুধু আচার বিচার আর কুসংস্কারে ভরা লৌকিকতা নয়, সেটা বোঝাতে বেদান্ত ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন তিনি । কিন্তু মিশনারি উইলিয়াম কেরীর লক্ষ্য ছিল খ্রিস্টান ধর্মের প্রচার ও প্রসার । ফলে মার্শম্যান আর ওয়ার্ডকে নিয়ে কেরী থেকে গেলেন হুগলির ওলন্দাজ উপনিবেশ শ্রীরাম পুরে । আর ১৭৯৭ সালে রামমোহন চলে এলেন কলকাতা । রামমোহন কলকাতায় বেশ কিছুদিন ছিলেন কুশীদজীবী। ধার দিতেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্রিটিশ কর্মীদের। তারপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুন্সি হয়ে কাজ করেছেন ১৮০৩-১৮১৫, টানা ১২ বছর। এই সময়ে আবার সখ্যতা গড়ে ওঠে কেরী সাহেবের সঙ্গে।

উনিশ শতকের শুরুতে রামমোহনের কাজের স্রোত বারবার গতিপথ পাল্টেছে | একসময় তিনি কেরী সাহেবের সঙ্গে আঘাত হেনেছেন বঙ্গ সমাজের কৌলীন্য প্রথায়। সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, পণপ্রথা, পৌত্তলিকতা-সহ একাধিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছেন তিনি | প্রথম ভারতীয় ধর্মীয়-সামাজিক পুনর্গঠন আন্দোলন ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা এবং বাঙালি দার্শনিক ছিলেন। তৎকালীন রাজনীতি, জনপ্রশাসন, ধর্মীয় এবং শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখতে পেরেছিলেন। তিনি সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত হয়েছেন, সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত করার প্রচেষ্টার জন্য। কারন তখন হিন্দু বিধবা নারীদের স্বামীর চিতায় সহমরণে যেতে বা আত্মহুতি দিতে বাধ্য করা হত। ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে রামমোহন কলকাতার স্থায়ী বাসিন্দা হন, এখন থেকেই প্রকাশ্যে তাঁর সংস্কার-প্রচেষ্টার শুরু। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ফারসি ভাষায় লেখা ‘তুহফাতুল মুহাহহিদিন’। বইটিতে একেশ্বরবাদের সমর্থন আছে। এরপর একেশ্বরবাদ (বা ব্রাহ্মবাদ) প্রতিষ্ঠা করার জন্য বেদান্ত-সূত্র ও তার সমর্থক উপনিষদগুলি বাংলার অনুবাদ করে প্রচার করতে থাকেন। ১৮১৫ থেকে ১৮১৯ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে প্রকাশিত হয় বেদান্তগ্রন্থ, বেদান্তসার, কেনোপনিষদ, ঈশোপনিষদ, কঠোপনিষদ, মাণ্ডূক্যোপনিষদ ও মুণ্ডকোপনিষদ। তবে তার লেখায় রক্ষণশীল ব্যক্তিরা ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর লেখার প্রতিবাদ দেখাতে লাগলেন।

প্রতিবাদ-কর্তাদের মধ্যে প্রথম ও প্রধান ছিলেন মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, এঁর গ্রন্থের নাম ‘বেদান্তচন্দ্রিকা’। বেদান্তচন্দ্রিকা’র প্রতিবাদে রামমোহন ভট্টাচার্যের সহিত বিচার লিখে প্রতিবাদীদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ‘বেদান্ত গ্রন্থ’ প্রকাশের সঙ্গে তিনি ব্রহ্মনিষ্ঠ একেশ্বর উপাসনার পথ দেখালেন আত্মীয় সভা প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও পরে ১৮২৮ সালে ইংল্যান্ড যাত্রার আগে দ্বারকানাথ ঠাকুরের সহিত আত্মীয় সভাকেই তিনি ব্রাহ্মসমাজ নাম ও রূপ দেন। পরবর্তীকালে এই ব্রাহ্মসমাজ এক সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলন এবং বাংলার পুনর্জাগরণের পুরোধা হিসাবে কাজ করে। রামমোহন রায় ১৮৩১ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের দূত হিসেবে যুক্তরাজ্য ভ্রমণ করেন, তিনি ফ্রান্সও পরিদর্শন করেছিলেন। ১৮৩৩ সালে মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয়ে ব্রিস্টলের কাছে স্টেপল্‌টনে মৃত্যুবরণ করেন। ব্রিস্টলে আর্নস ভ্যাল সমাধিস্থলে তাঁকে কবর দেওয়া হয়। ১৯৯৭ সালে মধ্য ব্রিস্টলে তাঁর একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়।

এদিন তাঁর জন্মবার্ষিকীতে এটাও মনে রাখবেন তাঁকে নিন্দিত করতেও পিছপা হয়নি সমাজ। আমৃত্যু যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন তিনি। কখনও পরিবারে অপাংক্তেয়, নিজের মতাদর্শের জন্য। আবার কখনও সমাজে অবাঞ্ছিত। কারণ তিনি নাকি হিন্দু ধর্মকে হেয় করেছেন বিশ্বের কাছে। ব্রিটিশদের সঙ্গে আফিমের ব্যবসা করে কত উপার্জন করেছিলেন, সেসব নিয়েও কম ভাবনাচিন্তা করেনি উর্বর নিন্দুক মস্তিষ্ক। হিন্দু ধর্মের বাহ্যিক আচার বিচার বাদ দিয়ে সনাতন উৎসের জয়গান করতে চেয়েছিলেন। সেটাই সমাজের চোখে ছিল তাঁর মস্ত ‘অপরাধ’ |

Related Articles

Stay Connected

0FansLike
3,431FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles