আমিনবাজারে ৬ জন ছাত্রের হত্যায় ৭ বছরেও বিচার হয়নি

আমিনবাজারে ৬ জন ছাত্রের হত্যায় ৭ বছরেও বিচার হয়নি

মিজান রহমান, ঢাকা:

শবেবরাত এলেই রাজধানীর আমিনবাজারে ডাকাত সন্দেহে হত্যার শিকার ৬ শিক্ষার্থীর স্বজনদের পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। আজ থেকে ৭ বছর আগে শবেবরাতের রাতে ওই শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এদিকে ঘটনার ৭ বছর পার হলেও শেষ হয়নি মামলার বিচার। ৫ বছর আগে চার্জ গঠন হলেও বিচারে নেই অগ্রগতি। কচ্ছপ গতিতে চলছে সাক্ষ্যগ্রহণ। এদিকে মামলার খোঁজখবর না নিতে নিহত ছয় ছাত্রের স্বজনদের অনবরত প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চলেছে আসামিপক্ষ। হুমকির বিষয়ে থানা-পুলিশকে জানালেও কোনো লাভ হচ্ছে না। এ কারণে চরম আতঙ্ক ও হতাশায় দিন কাটাছে তাদের। এ পরিস্থিতিতে হত্যার সুবিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় তারা। ২০১১ সালের ১৭ জুলাই (শবেবরাতের রাতে) সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রামের কেবলাচরে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় মিরপুর সরকারি বাঙ্লা কলেজের তিন শিক্ষার্থী সহ ৬ কলেজ ছাত্রকে। তারা হলেন তৌহিদুর রহমান পলাশ, ইব্রাহিম খলিল, কামরুজ্জামান কান্ত, টিপু সুলতান, সিতাব জাবির মুনিব ও শামস রহিম শামীম।

মূলত এ কারণে শবেবরাত এলেই নিহতদের পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। নিহত ইব্রাহিম খলিলের মা বিউটি বেগম বলেন, ‘দেশে কত কিছুর বিচার হয়। কিন্তু নৃশংস এই হত্যাকান্ডের বিচার হয় না। খুনিরা আদালতে হত্যার কথা স্বীকারও করেছে। এরপর ৭ বছর পার হয়ে গেল। দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। অনেক কষ্ট পেয়ে আমার ছেলে মারা গেছে, এ যে কী বেদনা আমি তা কাউকে বলে বোঝাতে পারব না। অসুখ কিংবা অ্যাকসিডেন্ট হয়ে মারা গেলেও এত দুঃখ ছিল না। আল্লাহর কাছে একটাই চাওয়া, খুনিদের বিচার চাই।’ এছাড়া তিনি আরো বলেন, ‘আদালতে যাই বলে আমাদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। দুর্বৃত্তরা বলছে মামলার খোঁজখবর নিতে আদালতে গেলে মেরে ফেলা হবে। গত মাসেও টেলিফোনে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। ওই সময় আমিও বলেছি, যাই হোক হবে। জীবন গেলেও আদালতে যাব, সাক্ষ্য দেব। জীবনের বিনিময়ে হলেও ছেলে হত্যার বিচার চাইব।’ তিনি দাবী করেন , ‘বালুর ব্যবসায়ী আবদুল মালেকই নাটেরগুরু। সেই থানা-পুলিশ, চোর-ডাকাত সব ডিল করে। ওর (মালেকের) বিচার হলেই, সবার বিচার হতো।’

নিহত কামরুজ্জামান কান্তর বাবা আবদুল কাদের সুরুজ বলেন, শবেবরাত এলেই ছেলের শোকে কাতর হয়ে যায় কান্তর মা। সারাক্ষণ কান্না করে আর আল্লাহর কাছে বিচার চায়। আরা বলতে থাকে, ‘আমার ছেলেকে হত্যা করে ডাকাতির মিথ্যা মামলা দিয়েছিল। পবিত্র রাত বলেই আল্লাহর অশেষ রহমতে সত্য ঘটনা উদঘাটন হয়েছে। সত্য উদ্ঘাটনের পর আমাকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে।’ প্রাণনাশের হুমকির ঘটনায় ২০১৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর দারুসসালাম থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি নম্বর ৯১৬) করা হয়।
মামলার নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলায় চার্জ গঠনের পর থেকে অদ্যাবধি মামলার বাদী সহ ৪৯ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। অপরদিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সহ ৩৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ এখনো বাকি রয়েছে। ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর এ মামলার প্রথম সাক্ষ্যগ্রহণ হয়। আগামী ৯ মে এ মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে। ওইদিন সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য তদন্ত কর্মকর্তা সহ ৯ জন সাক্ষীর প্রতি ইতিমধ্যেই সমন দেওয়া হয়েছে।

আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর শাকিলা জিয়াছমিন (মিতু) বলেন, এ মামলার বাদী, ময়নাতদন্তকারী ডাক্তার, আসামিদের স্বীকারোক্তি গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেট ও নিহতদের স্বজনদের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। মামলাটি তিনজন তদন্ত করেছেন। এখন শুধু তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সাক্ষ্যগ্রহণ বাকি রয়েছে। নথিপত্র সূত্রে আরো জানা যায়, ঘটনার রাতে ওই ৬ জন ছাত্রের বন্ধু আল-আমিন গুরুতর আহত হলেও পরে প্রাণে বেঁচে যান। ঘটনার পর কথিত ডাকাতির অভিযোগে বেঁচে যাওয়া আল-আমিন সহ নিহতদের বিরুদ্ধে সাভার মডেল থানায় একটি ডাকাতি মামলা করেন স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী আবদুল মালেক। ওই সময় পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা গ্রামবাসীকে আসামি করে সাভার মডেল থানায় আরেকটি মামলা করে। পুলিশ, সিআইডির হাত ঘুরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্তভার র্যাবের হাতে দেওয়া হয়। তদন্ত শেষে ২০১৩ সালের ৭ জানুয়ারি র্যাবের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরীফ উদ্দিন আহমেদ আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। এ মামলায় ৯ আসামি পলাতক। এরা হলেন সাব্বির, সালাম, আফজাল, মাসুদ, শাহদাত, আমির হোসেন, মোবারক, সাত্তার ও কালাম। আর আসামি রাশেদ মারা গেছেন। এছাড়া প্রধান আসামি আবদুল মালেক সহ ৫০ আসামি জামিনে।

You May Share This
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *