প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া এই দেশে অপরাধ, ঘুষ খাওয়া নয়! ব্যস্ত মেট্রোয় গো-বলয়ের খাপ পঞ্চায়েতের ছায়া!

Share Bengal Today's News
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অরিন্দম রায় চৌধুরী, কলকাতাঃ

শালীনতা-অশালীনতা নিয়ে তর্ক। এক প্রবীণ ব্যক্তির উস্কানির জেরে দমদম মেট্রো স্টেশনে ব্যাপক মারধর করা হল তরুণ-তরুণীকে। যদিও বিষয়টি নিয়ে মেট্রো কর্তৃপক্ষ কিংবা কোনও থানাতে এখনও পর্যন্ত কোনও অভিযোগ দায়েরের খবর পাওয়া যায়নি। তবে শহর কলকাতায় খাপ পঞ্চায়েতের ছায়ায় উদ্বিঘ্ন অনেকেই।

কোথায় কে আলিঙ্গন বদ্ধ হবেন, কিংবা চুমু খাবেন তা নিয়ে বলার অধিকার কারও নেই। তবে দৃশ্য যদি অশালীন হয়, তা নিয়ে পুলিশে অভিযোগ জানানো যেতেই পারত। এবিষয়ে আইন হাতে তুলে নেওয়া নিয়ে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগছে কেন এতটাই মেজাজ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষের একাংশ।

ঘটনায় স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, যখন চারিদিকে ধর্ষণের এত ঘটনা, সেই ঘটনাকে ঠেকাতে না পেরেই কি এই উত্তেজনা। নাকি প্রকাশ্যে আলিঙ্গন বদ্ধ হওয়া থাকে বাধা দিলে সমাজে নারী নিগ্রহের মতো ঘটনা কমবে।

উল্ল্যেখ্য এক তরুণ-তরুণী মেট্রোয়ে উঠেছিলেন দক্ষিণের কোনও স্টেশন থেকে। অভিযোগ, এরপর তাঁরা পরষ্পরকে আলিঙ্গন বদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন মেট্রোর মধ্যেই। আলিঙ্গনবদ্ধ যুবককে দেখে প্রথমে প্রতিবাদ করেন এক প্রবীণ ব্যক্তি। সমাজে অবক্ষয়ের নানা প্রশ্নও করেন। তবে ওই তরুণ প্রবীণ ব্যক্তির নানা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন ঠাণ্ডা মাথায়। বাংলা প্রথম শ্রেণীর এক দৈনিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুবকের ঠাণ্ডা মাথার উত্তরে ওই প্রবীণ ব্যক্তি আরও ক্ষেপে যান। এরই মধ্যে তরুণীও উত্তর দেন প্রবীণ ব্যক্তির। তরুণী বলেন, ভিড়ের মধ্যে যদি নিজেরা নিজেদের সিকিওরিটির ব্যবস্থা করে নেয়, তাহলে আপত্তি কোথায়। এই সময় প্রবীণ ব্যক্তি তরুণ-তরুণীকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার শাসানি দেন বলে অভিযোগ। এই সময়ই এক ব্যক্তি দমদমে নামার পর দেখে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন বলে অভিযোগ।

দমদমে মেট্রোর দরজা খুলতেই টেনে নামানো হয় ওই তরুণ-তরুণীকে। সিঁড়ির রেলিঙে ধরে শুরু হয়ে যায় গণপ্রহার। হামলায় অভিযুক্তদের অনেকেই ছিলেন মধ্যবয়সী। যদিও এরই মধ্যে কয়েকজন এগিয়ে গিয়ে ওই তরুণ-তরুণীকে উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে যান।

প্রসঙ্গতই একুশ শতকের বাংলায় কি রাজস্থান, হরিয়ানার মতো হিন্দিবলয়ের খাপ পঞ্চায়েতের নির্দেশের ঘটনা ঘটবে। তাদের নির্দেশের মতোই কি সমাজ চলবে। সেই প্রশ্ন তুলছেন সমাজের একাংশের মানুষ।

অপরদিকে এই ঘটনায় কলকাতা শহরকে উদ্দেশ্য করে প্রখ্যাত গায়ক নচিকেতা বলেন, এই শহরে তালেবানি শাসন চলছে নাকি! এখন কি এই ধরনের পঞ্চায়েতই ঠিক করে দেবে, কে কার হাত ধরবে? আশ্চর্যের বিষয় প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া এই দেশে অপরাধ, আর ঘুষ খাওয়া নয়!

এই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “আসলে এই বুড়োগুলো যৌন ঈর্ষায় ভোগে। নিজেরা করতে পারছে না। তাই যে করতে পারছে তাকে ধরে মারো। এরা নিজেদের ছেলেমেয়েকে আমেরিকাতে পাঠায়। সেখানে নিজেদের ছেলেমেয়েরা প্রকাশ্যে চুমু খেলে দোষ হয় না। এখানে সেটা অন্য কেউ করলেই যত দোষ। যখন লালকেল্লা বিক্রি হয়ে যায়, হেরিটেজ নিলাম হয়ে যায়, তখন এই বীরপুঙ্গবরা মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকে।”

তিনি আরো বলেন, “আমি সে কারণেই অনেক দিন আগেই গান লিখেছিলাম, প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া এই দেশে অপরাধ, ঘুষ খাওয়া কখনোই নয়। এই যে লোকগুলো এই জঘন্য কাজটা করলো, তারা নিজেদের কর্মজীবনে কোনো অপরাধ করেননি? তারা কখনো ঘুষ খায়নি? কোনো অন্যায় সুবিধা নেয়নি? পুলিশের উচিত, এই লোকগুলোকে খুঁজে বের করে জেলে ঢোকানো। এদের শাস্তি হওয়া দরকার। শ্লীল-অশ্লীল পুরো বিষয়টাই খুব আপেক্ষিক। আলিঙ্গন করা মানুষের মানুষকে ভালোবাসার একটা অনুভূতি। মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে না? এটা কি সভ্যতার চিত্র? আসলে আইন-কানুনের দায়িত্ব আমরা গাধাদের হাতে দিয়ে দিয়েছি। আমাদের শহরে প্রেম করার কোনো জায়গা নেই। ক্রিকেটের মাঠের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়। অথচ ছেলেমেয়েরা প্রেম করার জন্য জায়গা পায় না। গোটা শহরটা কংক্রিটে ভরে গেছে। প্রেম করার, ভালোবাসার প্র্যাকটিস করতে দেব না, খালি হিংসার প্র্যাকটিস। এই শহরে প্রেমিক-প্রেমিকার নিরাপত্তা নেই। অথচ বাকি সব এখানে প্রকাশ্যে হয়। ইউ ক্যান্ট কিস ইন পাবলিক প্লেস, বাট ইউ ক্যান পিস ইন পাবলিক!”

উল্লেখ্য, কলকাতার দমদম মেট্রো স্টেশন ছাড়ার পর আলিঙ্গন ‘করার’ অভিযোগে টেনে নামিয়ে গণপ্রহার করা হয়েছে এক যুগলকে। সেই ঘটনার প্রতিবাদে এসব কথা বলেন নচিকেতা।

সম্পর্কিত সংবাদ