শ্রমিক আন্দোলন যা আজও মানুষের প্রেরণা হয়ে আছে

Share Bengal Today's News
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ওয়েবডেস্ক, বেঙ্গলটুডেঃ

বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় নানা সময়ে শ্রমিক আন্দোলন হয়েছে। যা আজও বিশ্বের কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষসহ সকল সস্তরের মানুষের কাছে প্রেরণা হয়ে আছে। তেমনই কয়েকটা আন্দোলন সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হলো।

হে মার্কেট চত্বরের শ্রমিক আন্দোলন

১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেট চত্বরে শ্রমিকরা নেমেছিলেন তুমুল আন্দোলনে। তাদের দাবি,উপযুক্ত মজুরি ও দৈনিক আট ঘণ্টার বেশি কাজ নয়। মে মাসের প্রথম দিনেই শ্রমিকরা ধর্মঘটের আহ্বান জানায়।প্রায় তিন লাখ শ্রমিক যোগ দেয় সেই সমাবেশে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের রুখতে মিছিলে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় পুলিশ।এতে বহু শ্রমিক হতাহত হন।

মে দিবস

পরে আন্দোলনের অংশ নেয়ার অপরাধে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় গ্রফতারকৃত কয়েকজন শ্রমিককে।কারাগারে বন্দিদশায় এক শ্রমিক নেতা আত্মহত্যাও করেন।পরবর্তীতে আন্তর্জাতিকভাবে দিনটিকে মে দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস

মে মাসের প্রথম দিনটিকে পুরো পৃথিবীতে মে দিবস হিসেবে পালন করা হয়।পৃথিবীতে সব শ্রমিকের লড়াই-সংগ্রাম-পরিশ্রমের প্রতি সম্মান জানিয়েছে তাদের আত্মত্যাগের প্রতি এই দিনে সম্মান জানানো হয়।


শ্রমজীবী মানুষের সংগঠন

আমেরিকা স্বাধীন হওয়ার আগে শ্রমজীবী মানুষের প্রথম সংগঠন গঠে ওঠে ১৬৮৪ সালে। ঠেলাগাড়ির চালকরা প্রথম ঠেলাশ্রমিক ইউনিয়ন গড়ে তোলেন।১৮৪২ সালে আমেরিকার শ্রমিক শ্রেনি ট্রেড ইউনিয়ন ধর্মঘট করার অধিকার পায়। আমেরিকায় নারী শ্রমিকরা প্রথম ধর্মঘট করে ১৮২৩ সালে।বিশ্বের শিল্প-কারখানাগুলোতে শ্রমিক আন্দোলন শুরু ১৮২৮ সালে।

আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সংগঠন

ঊনবিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রমিক শ্রেনি নিজ নিজ দেশে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলে। ১৮৬৪ সালে মার্কস-এঙ্গেলসের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সমিতি। ইতিহাসে এটাই প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সংগঠন।

প্যারিস কমিউন

১৮৭১ সালের ১৮ মার্চ প্যারিসের শ্রমিকরা শহর থেকে বুর্জোয়া শাসকদের হটিয়ে নিজেদের হাতে ক্ষমতা নিয়ে নেয়।১০ দিন পরে ২৮ মার্চ শ্রমিকরা গঠন করে পৃথিবীর প্রথম প্রলেতালিয়েত রাষ্ট্র প্যারিস কমিউন।

অক্টোবর বিপ্লব

অক্টোবর বিপ্লবকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত অঞ্চলগুলোয় বলা হয় মহান অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব।১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার বলশেভিকরা ক্ষমতা দখল করে। শুরু হয় লাল ও সাদাদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ।অক্টোবর বিপ্লবের বিজয় রাশিয়াকে রাজনৈতিকভাবে একটি অগ্রসর রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল।

পুঁজিবাদী দাসত্ব থেকে মুক্তি

এই বিপ্লব জনগণকে পুঁজিবাদী দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছিল।এটা কেবল শ্রমিক ও মেহনতি কৃষকদের জন্য সামাজিক মুক্তিই আনেনি, রাশিয়ার গণতান্ত্রিক সমস্যাগুলোও সমাধান করতে সক্ষম হয়েছিল।১৯২৪ সালে লেনিন পরলোকগমন করেন। কিন্তু রুশ বিপ্লব, সোভিয়েত রাশিয়া ও কমিউনিজমের সঙ্গে তার নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

তেভাগা আন্দোলন

১৯৩০ সালে বাংলার কয়েকটি জেলায় কৃষকরা তেভাগার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিল। তাদের মূল দাবি ছিল,ভাগচাষিকে ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ দিতে হবে। এ আন্দোলনটি ছিল সম্পূর্ণ বর্ণ হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলমান ও নমঃশূদ্র চাষিদের অসহযোগ আন্দোলন। এতে জমিদারদের পাইক-বরকন্দাজদের লাঠিয়াল বাহিনীর সঙ্গে সুম্মুখযুদ্ধ করতে হয়েছিল কৃষকদের।১৯৪৬ সালেও আরেক দফা আন্দোলন হয়েছিল।

দক্ষিণ আফ্রিকায় খনি শ্রমিকদের আন্দোলন

দেশটিতে খনি শ্রমিকদের ওপর নানা নির্যাতন,মজুরি বৃদ্ধি, থাকা-খাওয়া ও জীবনমান উন্নয়ন সমস্যা নিয়ে আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৯৪৬ সালে ৭০ হাজার শ্রমিকের অংশগ্রহণে ধর্মঘট পালিত হয় কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে।এএনসি এই আন্দোলনে যোগদানের বিষয়ে নীরব থাকলেও ম্যান্ডেলা পরিচিত কয়েকজনকে নিয়ে এতে একাত্মতা ঘোষণা করেন।

জার্মানির শ্রমিক আন্দোলন

১৯৫৩ সালের ১৭ জুন তৎকালীন পূর্ব জার্মানির সরকারের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিল শ্রমিকসহ সাধারণ জনগণ।পূর্ব জার্মানি সরকার বড় কোম্পানিগুলো জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যার প্রতিবাদে ১৬ জুন থেকে আন্দোলন শুরু করেছিল শ্রমিকরা। প্রায় সাতশ শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন থেকে সরকারের পদত্যাগ, স্বাধীন নির্বাচন অনুষ্ঠান ও দুই জার্মানির একত্রীকরণের দাবি ওঠে। এতে সেনাদের গুলিতে ৫০ আন্দোলনকারী নিহত হন।

শ্রমিক বিক্ষোভে উত্তর ইউরোপ

স্পেন ও পর্তুগালে ২০১২ সালের ১৪ নভেম্বর বুধবার পালিত হয়েছিল সাধারণ ধর্মঘট।কর্মবিরতি পালন করেছিল গ্রিস ও ইতালির শ্রমিকরাও।এ আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানায় বেলজিয়াম, জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য,পোল্যান্ডসহ পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো। এতে বিভিন্ন দেশের শিল্প-কারখানা অচল হয়ে পড়ে। বাতিল হয় ইউরোপের অনেক ফ্লাইট। চারদেশে একযোগে ধর্মঘট পালনের ঘটনা ইউরোপে এটাই প্রথম।

ফ্রান্সে শ্রমিক আন্দোলন ২০১৬

একবিংশ শতাব্দীতে এসেও ফ্রান্সে সর্ববৃহৎ শ্রমিক বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে ২০১৬ সালে। শ্রম আইন সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে অসন্তোষের জের ধরে জেনারেল কনফেডারেট অব লেবার (সিজিটি)ইউনিয়নের ডাকে এই আন্দোলনে দেশটির প্রায় সব বিভাগের শ্রমিকরা অংশগ্রহণ করেছিল।এতে প্রায় ৩৫ লাখ শ্রমিক রাস্তায় নেমে আসেন।তাদের সঙ্গে শামিল হয় ছাত্র ও তরুণরাও।

সর্বভারতীয় সাধারণ ধর্মঘট

১৯৮২ সালের ১৯ জানুয়ারি সেই ধর্মঘট ছিল দেশটির সবচেয়ে বড়, ঐতিহাসিক ও সবদিক থেকে সফল। পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালায় সর্বাত্মক বনধa পালিত হয়েছিল।

ভারতে শ্রমিক বিক্ষোভ

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১৮ হাজার রুপি করা ও শিল্প-কারখানার বেসরকারিকরণ ঠেকাতে ১৮ দফা দাবিতে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতজুড়ে সাধারণ ধর্মঘট পালন করেন সেবা খাতের লাখ লাখ শ্রমিক। ১৫ কোটির বেশি শ্রমিক এ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল।

সম্পর্কিত সংবাদ