জানেন কিসমিস খাওয়ার উপকারিতা?

Share Bengal Today's News
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ওয়েবডেস্ক, বেঙ্গল টুডে:

আমাদের অতি পরিচিত, প্রিয় একটি উপাদান, যা পায়েস থেকে কেক, সবেতেই একটু না দিলে মনে হয় কী যেন নেই, কী যেন নেই। কখনও কখনও খুব খিদে পাচ্ছে, কিছুই নেই বাড়িতে, অথচ টুক টাক খেতে ইচ্ছে করছে, এক মুঠো টক মিষ্টি কিসমিস বসে বসে অনেকেই খেয়েছেন। কিন্তু জানেন কি, কিসমিস খাওয়ার উপকারিতা? এক নয়, একাধিক উপকারিতা রয়েছে এই আপাতদৃষ্টিতে মিষ্টি মুখ করার ছোট ছোট কিসমিসের দানাতে। কিসমিস যেমন নানা ধরনের সুখাদ্যে রান্নার সময়ে দেওয়া হয়, তেমনি হেলথ টনিক বলুন বা হাই এনার্জি ফুড সাপ্লিমেন্ট হিসেবেও খাওয়া হয়ে থাকে।

কস্টিপেশন কমাতে সাহায্য করে ঃ

শুকনো বলে কিসমিস-এর ফাইবারগুলোও শুকিয়ে থাকে, যাকে বলে দড়ি পাকিয়ে থাকে। ফলে, জলের মধ্যে পড়লে সেগুলি ফুলে ওঠে। এবারে ভাবুন, এটা পেটের ভেতরে বাকি খাবারের সাথে গেলে পেটের স্বাভাবিক ফ্লুইডগুলিকে টেনে নিয়ে ফুলে ওঠে এবং খাবার পাকস্থলী থেকে নিচে নামতে সাহায্য করে, ফলে কনস্টিপেশনের সমস্যায় যারা ভোগেন তারা নিয়মিত কিসমিস খান। কিসমিস-এ যে ফাইবার থাকে সেটা জলে গোলে না, তাই এটাকে ইনসলিউবল ফাইবার বলা হয়। সেই জন্যই কিসমিস জল টেনে ফুলে ওঠে। একই ভাবে, ডায়োরিয়ার সমস্যাতেও কিসমিস সাহায্য করে, কারণ স্টুলের অতিরিক্ত জল শুষে নেয় কিসমিস, ফলে বার বার বেগ পাওয়াটা আটকে দেয়।

সুস্থভাবে ওজন বাড়ানোতে সাহায্য করে ঃ

সব ড্রায়েড ফ্রুট যেমন খেজুর কাজুবাদাম ইত্যাদির মতই, কিসমিস সুস্থ উপায়ে ওজন বাড়াতে সাহায্য করে, কারণ এতে আছে প্রচুর ফ্রুক্টোজ এবং গ্লুকোয এবং পোটেনশিয়াল এনার্জিতে ভরপুর এই কিসমিস। বডিবিল্ডার বা অ্যাথলিটদের ক্ষেত্রে কিসমিস খেতে বলা হয় কারণ তাদের প্রচুর এনার্জি লাগে, বা ওজন বাড়ানোর জন্য ক্ষতিকর কোলেস্টেরল এড়িয়ে কিসমিস খেলে সুস্থ ভাবে ওজন বাড়তেও সাহায্য পাওয়া যায়। ডায়েটে কিসমিস রাখতে বলার আরো একটি কারণ হলো, কিসমিসে আছে ভিটামিনস, অ্যামাইনো অ্যাসিড এবং সেলেনিয়াম এবং ফসফরাসের মতন মিনারেল যেগুলি প্রোটিন এবং অন্যান্য নিউট্রিয়েন্টগুলিকে শোষিত হতে সাহায্য করে। এছাড়াও কিসমিস অন্যান্য খাবার থেকে প্রাপ্ত ভিটামিন, প্রোটিন শরীরে শুষে নিতেও সাহায্য করে, ফলে সার্বিক এনার্জির মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে আরো শক্তিশালী করে তোলে।

ক্যান্সার প্রতিরোধ ঃ

একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ যাতে কিসমিস সাহায্য করে, সেটি হল, কিসমিস-এ থাকা ক্যাটেচিন নামক একধরনের অ্যান্টিওক্সিডান্ট থাকে যা শরীরে ভেসে বেড়ানো ফ্রী র‍্যাডিকলগুলিকে লড়াই করে নিঃশেষ করে। এটা জানা গেছে যে শরীরের এই ফ্রী র‍্যাডিকলগুলিই ক্যান্সার সেল এর স্বতঃস্ফুর্ত বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং মেটাস্টাসিসএও সাহায্য করে। কিসমিস নিজের রোজকারের খাবারের মধ্যে রাখলে শরীরে ক্যাটেচিন এর মতন শক্তিশালী অ্যান্টিওক্সিড্যান্ট এর মাত্রা বৃদ্ধি পায়,ফলে ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে বা যারা এতে আক্রান্ত, তাদের শরীরে বৃদ্ধির পরিমাণ খানিকটা হলেও কমিয়ে দেয়।

অ্যানিমিয়া প্রতিরোধ ঃ

কিসমিস-এ প্রচুর পরিমাণে আয়রন আছে যা রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া কমাতে সরাসরি সাহায্য করে। এছাড়াও, ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের অন্তর্গত বেশ কিছু ভিটামিন এতে পাওয়া যায়, যা নতুন রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে। কিসমিস-এ কপারও থাকে যা রেড ব্লাড সেল তৈরিতে সাহায্য করে।

চোখের স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী ঃ

কিসমিসে আছে ভিটামিন এ, বিটা ক্যারোটিন এবং এ ক্যারোটিনয়েড, যা চোখের স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই উপকারী।এছাড়াও পলিফেনলিক ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস থাকার দরুণ, চোখকে ফ্রী র‍্যাডিকলের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচায়, ফলে বয়সকালীন চোখের দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাওয়া, ম্যাকুলার ডিজেনারেশন বা ছানি পড়া প্রতিরোধ করে।

হাড়ের স্বাস্থ্য বর্ধন ঃ

কিসমিসে পাওয়া যায় আরো এক উপাদান, ক্যালসিয়াম, যা হাড় এবং দাঁতের জন্য খুব প্রয়োজন। এছাড়াও, বোরন নামক এক মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টও কিসমিসে থাকে যা সঠিক ভাবে হাড় গঠন হতে সাহায্য করে এবং ক্যালসিয়ামকে তাড়াতাড়ি শুষে নিতে শরীরকে সাহায্য করে। মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট শরীরে খুব অল্প পরিমাণে দরকার বলেই মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট হিসেবে পরিচিত কিন্তু শরীরে এর উপস্থিতির গুরুত্ব অসীম। তাই বোরন মেনোপজ ঘটে যাওয়া মহিলাদের মধ্যে অস্টিয়োপোরসিস এবং হাড় ও জয়েন্ট এর জন্য খুব উপকারী। পটাসিয়াম আরেকটি মিনারেল যা প্রচুর পরিমাণে কিসমিস-এ পাওয়া যায়। বলাই বাহুল্য, পটাসিয়াম হাড় শক্ত করে এবং হাড়ের ক্ষয় থেকে বাঁচায়।

দাঁতের যত্ন নিতে কিসমিস ঃ

হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন, দাঁতের যত্ন নিতে কিসমিসের জুড়ি নেই। কেন? অলিওনেলিক অ্যাসিড বলে একটি ফাইটো কেমিকল আছে যেটি দাঁতের ক্ষয়, ক্যাভিটি এবং দাঁতের ভঙ্গুরতা থেকে সুরক্ষা প্রদান করে। স্ট্রেপ্টোকক্কাস মিউটান্স এবং পরফিরোমনাস জিঙ্গিভালিস, দাঁতের ক্ষয়ের জন্য দায়ী এই দুটি ব্যাক্টেরিয়ার বৃধি ঠেকাতে এই অ্যাসিডের জুড়ি নেই। তাছাড়াও, কিসমিস-এ প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম থাকার জন্য এটি দাঁত শক্ত করে এবং এনামেল গড়তেও সাহায্য করে, যা সুস্থ দাঁতের জন্য খুব দরকারী। জানেন কি, এমনিতে কিছু খাওয়ার পরে মুখ কুলকুচি করে দাঁতে লেগে থাকা খাবারের কণা সরিয়ে দিতে বলা হলেও, কিসমিস দাঁতে লেগে থাকাটা আসলেতে দাঁতের পক্ষেই ভাল, কারণ তাতে করে অলিওনেলিক অ্যাসিড এর সংস্পর্শে দাঁত বেশিক্ষণ থাকে, ফলে ক্যাভিটি এবং দাঁতের ক্ষয় রোধের প্রক্রিয়াটি আরো কার্যকরী হয়।

অ্যাসিডসিস হতে বাধা দান করে ঃ

অ্যাসিডসিস হলো রক্তে অ্যাসিডের পরিমাণ বৃধি পাওয়া, বা গ্যাসে বৃদ্ধি আমাদের শ্বাস প্রশ্বাসের মধ্যে। এটিকে শরীরে টক্সিসিটি বৃদ্ধি পাওয়াও বলে। এই অ্যাসিডসিসের ফলে আমাদের শরীরে নানা ধরনের রোগ দেখা দিতে পারে, যেমন ফোস্কা, স্কিনের রোগ, অভ্যন্তরীণ অর্গান গুলির ক্ষতি, আর্থারাইটিস, বাত, চুল পড়া, হার্টের রোগ, টিউমার এমনকি ক্যান্সার পর্যন্ত। কিসমিস-এ আছে পটাসিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম, যা কিনা অ্যাসিডিটি দূর করতে অ্যান্টাসিডে থাকে, যেটি শরীরের পি এইচ ব্যালেন্স মেন্টেন করতে সাহায্য করে।

সেক্সুয়াল সমস্যা প্রতিরোধ ঃ

কিসমিসকে বহুদিন থেকেই লিবিডো বর্ধনকারী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আর্জিনিন যা পাওয়া যায় কিসমিসে, তা স্পার্মের চলাচলে সাহায্য করে, যেটি গর্ভধারণে সাহায্য করে। ভারতীয় বিয়েতে বৌভাতের দিনে বর বধূকে গরম দুধে কিসমিস এবং কেশর দিয়ে খাওয়ানোটা প্রাচীন রীতি। যাদের যৌন সহনশীলতা কম, তাদেরকেও রেগুলার কিসমিস খেতে পরামর্শ দেওয়া হয়।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করে ঃ

শুনতে আশ্চর্য লাগলেও, কিছু কিছু পরীক্ষায় দেখা গেছে যে কিসমিস পোস্টপ্রান্ডিয়াল ইন্সুলিন রেস্পন্সকে নামিয়ে দেয়, যার মানে দাঁড়ায় যে কিসমিস খেলে লাঞ্চ বা ডিনারের পরে শরীরে যে ইনসুলিনের হঠাৎ বৃদ্ধি বা ঘাটতি দেখা দেয়, তা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। লেপটিন আর ঘ্রেলিন নামক দুটি হোরমোনের রিলিজেও কিসমিস সাহায্য করে, যেগুলি শরীরকে সিগনাল দেয় কখন খিদে পেয়েছে বা কখন যথেষ্ট পরিমানে খাদ্য গ্রহণ করা হয়েছে। তাই কিসমিস খেলে অত্যাধিক খাওয়া রোধ করা সম্ভব।

তবে অধিক পরিমাণে কিসমিস খেলে সমস্যা হতে পারে, তাই অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে খাবেন, বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাঁরা। কারণ ফ্রুক্টোজ বা গ্লুকোজ ডায়াবেটিস-এর রুগীর জন্য মারাত্মক হতে পারে।

কিসমিস ছোট হলেও উপকারিতা অনেক। তাই আপনার নিত্যদিনের খাবারে অল্প পরিমাণে কিসমিস রাখুন এবং দেখুন আপনার শরীরে এর প্রভাব।

সম্পর্কিত সংবাদ