দল, প্রশাসন মিলেমিশে একাকার, সার্টিফিকেট দেবেন ওয়ার্ড সভাপতিরাই

Spread the love
  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    9
    Shares

রাজীব মুখার্জী, হাওড়াঃ আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে হাওড়া পুরসভার নির্বাচনের পথে হাঁটছে না রাজ্যের সরকার, এই বিষয়টি স্পষ্ট করে রাজ্য সরকার না বললেও, বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যত দিন যাচ্ছে। গত ১০ই ডিসেম্বর ২০১৮-তেই মেয়াদ শেষ হয়েছে বর্তমান হাওড়া পুর-বোর্ডের। পুরসভার বর্তমানের প্রশাসক ও পুর কমিশনার জানিয়েছিলেন “মেয়াদ পেরোনোর পড়ে বাসিন্দাদের নিত্যদিনের পুরসভার প্রয়োজনীয় কাজ কি ভাবেই হবে এই বিষয়। সেই নিয়ে আপাতত যা সংশয় ছিল, কিভাবে মানুষ পরিষেবা পাবেন সেই বিষয় নিয়ে আশ্বাস বাণী পাওয়া গেছিল সদ্য দায়িত্ব প্রাপ্ত প্রশাসক ও হাওড়া পুরসভার কমিশনার বিজিন কৃষ্ণের কাছ থেকে। তিনি জানান, নতুন বোর্ড তৈরি না হওয়া পর্যন্ত ফেসবুক ও হোয়াট্সঅ্যাপের মাধ্যমে পুর-পরিষেবা সংক্রান্ত বিষয়ে নাগরিকদের সমস্যার কথা জানাতে পারবেন হাওড়া পুরসভা।

এর আগে হাওড়ার পুর-প্রশাসক বলেছিলেন, “আগামী ১০ দিনের মধ্যে চালু করা হচ্ছে পুরসভার হোয়াট্সঅ্যাপ নং ও ফেসবুক পেজ। যে কেউ তাঁদের সমস্যার কথা জানালে দ্রুত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে। আর যারা হোয়াটসআপ বা ফেইসবুক ব্যবহার করেন না তাঁর ক্ষেত্রে পুরসভার মূল দফতরে বা বড় অফিসে গিয়েও আগের মতো অভিযোগ জানাতে পারবেন।” কিন্তু অনলাইনে অভিযোগ জমা দেওয়ার নির্দিষ্ট বিধি জানানোর সময় সীমা উতীর্ণ হতে আর মাত্র এক দিন বাকি, এখনও কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষ পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।

মেয়াদ পেরোনোর পড়ে বাসিন্দাদের নিত্যদিনের পুরসভার প্রয়োজনীয় কাজ কি ভাবে হবে। সেই নিয়ে আপাতত শংকিত হাওড়া পুরবোর্ডের প্রাক্তন সদস্যরা নিজেরাই। প্রতিদিন যে বিভিন্ন ধরণের শংসাপত্রে কাউন্সিলরদের যে সই করতে হতো, তাঁদের পরিবর্তে তখন কে বা কারা করবেন, কিভাবে মানুষ পরিষেবা পাবেন তাও জানা যাচ্ছেনা।

হাওড়া পুরসভার ইতিহাসে প্রথম বার এই ঘটনা ঘটলো, যেখানে নির্দিষ্ট সময় পেরোনোর পরেও পুরসভার ভোট এই মুহূর্তে হচ্ছে না। তাই প্রথম এমন ঘটনা ঘটায় পুরসভার অন্দরমহলে ও দলের অভ্যন্তরেও ইতিমধ্যেই নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

এরই মাঝে হাওড়া পুরবোর্ডের নির্বাচন না করে প্রশাসক বসিয়ে পুরসভা চালানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা শুরু করেছে বিরোধী রাজনৈতিক দল গুলো। হাওড়া পৌরসভার মেয়াদ উতীর্ণ হওয়ার পরে যে অসুবিধার মধ্যে হাওড়াবাসি পড়েছেন, সেই অসুবিধা গুলো দূর করার উদ্দেশ্যে গতকাল হাওড়া জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি ও সমবায় মন্ত্রী অরূপ রায় সন্ধ্যায় সাংবাদিক সম্মেলন করে জানান “আমি ও আরো ৪ জন হাওড়ার বিধায়ক ও সাংসদ কে সাথে নিয়ে তৈরি করেছি একটি রূপরেখা, যাতে নাগরিক পরিষেবা সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারে, মানুষ যাতে পরিষেবার থেকে বঞ্চিত না হয়, কোথাও কোনো সমস্যা তৈরি হলে। পুরানো বাড়ি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে বা মৃত প্রাণীর দেহ পরে আছে সেগুলো পুরসভায় লিখিত জানানোর সাথে আমাদের জানাও। যে সমস্ত পরিষেবা পৌরসভার থেকে দেওয়া হতো যেমন রূপশ্রী, সমব্যাথী প্রকল্প এগুলোর জন্য ডিসেন্ট্রালিসড ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পৌর প্রতিনিধিরা যে সার্টিফিকেট গুলো দিতো সেগুলো আমরাও দিতে পারবো। যারা দলে দায়িত্ব পূর্ণ পদে আছে, তাদের হাত দিয়েই এগুলোর বন্টন করা হবে। এর জন্য আলাদা রেজিস্টার রাখা হবে। তারা তাদের প্রয়োজন মতো নিয়ে যাবে আবার পরের বার নেওয়ার সময় হিসেব দেবেন বিধায়ক ও এম. পি. কে. দলের কাউন্সিলরেরাও এটা করতে পারেন।

ওয়ার্ড অফিসে এখন বিধায়ক আর এম. পি. রা বসতে পারেন, কিন্তু পৌরপ্রতিনিধিরা বসতে পারবেন না তাদের আলাদা অফিস খোলার ব্যবস্থা করতে হবে”। এর মাঝে ঘটেগেছে অনেকগুলি ঘটনা, যে ঘটনাগুলো তৃণমূল কংগ্রেসের তথা শাসক দলকে যথেষ্ট বিড়ম্বনা এবং চাপে ফেলেছে।

কিছুদিন আগে হয়ে যাওয়া জেলা বিজেপির আইন অমান্য আন্দোলন পৌরসভা কে নিয়ে। বা বাম, কংগ্রেস দলগুলো নিয়মিত হাওড়া জেলা জুড়ে মিছিল মিটিং করে যে প্রচার করছে এবং আক্ষরিক অর্থে সামান্য ইনকাম সার্টিফিকেট ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের চেয়ে অসুবিধা বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। লোকসভা নির্বাচন আর ৪ মাস মতো বাকি, এর মাঝখানে যাতে কোন রকম সমস্যা তৈরি না হয়, কোনোভাবে শাসকদল বিড়ম্বনার মুখে না পরে তারই পরিকল্পনার অংশ হিসাবে এই উদ্যোগ বলেই জানা যাচ্ছে দলের অন্দরমহল থেকে।

কিন্তু এখানে প্রশ্ন একটাই, প্রশাসনিক কাজে এভাবে সরাসরি পার্টির হস্তক্ষেপ যেখানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিষেধ করছেন সেখানে এই ধরণের একটি সিদ্ধান্ত শাসকদলের নেতাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া এই বিষয়টা বিরোধী থেকে সাধারন মানুষ কি ভালো চোখে দেখবেন, সেটা নিয়েও একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

এলাকার এক সাধারণ মানুষ কদমতলার বাসিন্দা অনন্ত রায় জানালেন, “ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট হোক বা অন্যান্য সার্টিফিকেট হোক, আগে বিধায়ক বা কাউন্সিলর এর পেছনে ছুটতে হতো। এখন ছুটতে হবে দলের নেতাদের পেছনে এবং নেতার পছন্দের লোক না হলে বা সদস্য বা অনুগামী না হলে এ ধরনের সার্টিফিকেট পেতে কাল ঘাম ছুটে যাবে। আমি নিজে ভুক্ত ভোগী, আমি বিষয়টা জানি কিন্তু কথা টা হচ্ছে দীর্ঘদিন নির্বাচন না করে এভাবে প্রশাসক নিয়োগ করার পরে প্রশাসকের পুরসভার কাজকে সুনিশ্চিত করার জন্য এভাবে দলের নেতাদের কে নিযুক্ত করে দেওয়া প্রশাসনের অভ্যন্তরে কাজ করানোর এই রীতিটি বহু জায়গায় চলে আসছে, যেটা গণতন্ত্রের বিরোধী। হাওড়ার মানুষ চাইছে নির্বাচন হোক কিন্তু এই মুহূর্তে নির্বাচনের কোনো পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে না”।

রাজ্যের অন্যান্য জেলার মতো হাওড়া জেলাতেও ক্রমবর্ধমান বি. জে. পি.-র সংগঠন ইতিমধ্যেই শাসক গোষ্ঠীর কপালেও চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। এই বিষয়ে হাওড়া জেলার বাসিন্দা ও বি. জে. পি.-র দায়িত্বে থাকা সুরজিৎ সাহার প্রতিক্রিয়া নেওয়া হলে তিনি বলেন, “এটা পুরসভার প্রতিনিধি দিয়েই দেওয়ানো যেত। সাধারণ মানুষ এদেরকেই চেনে। এরা মানুষের ভোটে জিতে এসেছে, এরা পরিষেবা দিচ্ছে কিন্তু পার্টি-র লোকেদের দিয়ে এটা করানো মানে পুরো ব্যবস্থা কে দলদাশে পরিণত করে দেওয়া। ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের ওয়ার্ড সভাপতি এখন জেলে বোমা ছোড়ার মামলায়। ভাবুন তিনি সাধারণ মানুষকে দেবেন ক্যারেক্টর সার্টিফিকেট”।

এ বিষয় জেলা কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি পলাশ ভান্ডারী বললেন, “দল ও প্রশাসন সম্পূর্ণ আলাদা। দুটো এক নয়, দুটো এক হয়ে গেলে এটা একটা মনোপলি ব্যাবসার জায়গায় চলে আসবে। এটা অগতান্ত্রিক, আগে পৌরসভা থেকে ১১ টাকায় জন্ম শংসাপত্র পাওয়া যেত, এবার এখন তা ৫০০ টাকায় বিক্রি হবে। তৃণমূলের নেতারা এবার ব্যবসাতে নেমেছেন। যদি এভাবেই চালানো যায় তাহলে পুরসভার কি দরকার আছে”।

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment