শিবপুরে গুলি, বোমার প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক চাপানউতোর

Spread the love
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

 

রাজীব মুখার্জী, শিবপুর, হাওড়াঃ একটা সময় ছিল যখন প্রকাশ্য দিবালোক হোক বা রাত্রি শিবপুর এলাকায় অবাধেই বিচরণ করতো কুখ্যাত সমাজবিরোধীরা। সেই অতীত আবার ফিরে এলো শনিবার গভীর রাতে। রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। এক বছরের বাচ্ছা মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছিলেন রাফহা জাহান। ওই ঘরেই তার পাঁচ বছরের বড় মেয়েও ঘুমোচ্ছিল। আচমকাই খাটের পাশের জানলার কাচ ফুটো করে একের পর এক গুলি ছুটে আসতে থাকে বাইরে থেকে।

জানলার কাঁচ ভেঙে ছিটকে সেই টুকরো ঢুকে যায় তাঁর কপালে ও ডান হাতে। ওই অবস্থাতেই দুই মেয়েকে আঁকড়ে ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে চিৎকার শুরু করেন তিনি। এরই মধ্যে পাশের ঘরের জানলা লক্ষ করেও গুলি চলছে নীচের রাস্তা থেকে। এইরকম দৃশ্য আমরা সচারচর সিনেমাতেই দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু শুক্রবার রাতে এই ঘটনা বাস্তবে প্রতক্ষ্য করলো জি.সি.আর.সি. ঘাট রোডের বাসিন্দারা।

রাত তখন সাড়ে ১২টা, কাউস ঘাট রোডের উপরে ২০-২৫ জনের একটি দুষ্কৃতী দল তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। মুহুর্মুহু গুলি ও বোমাবাজি চলছে। এই দুষ্কৃতীর দল এলাকার বাসিন্দা আবিদ আলি কুরেশির বাড়িতে আক্রমণ করে ওই গভীর রাতেই। ঘটনা চলাকালীন এলাকার কোনো বাসিন্দারা ঘরের বাইরে বেরোনোর সাহস করেননি।

পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনার দিন আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বাড়ি ঘিরে ফেলা হয় এবং তিনতলার উপরে থাকা পরিবারের ফ্ল্যাটের জানলা লক্ষ করে গুলি চালায় তারা। প্রায় আট রাউন্ড গুলি চলান হয়। বরাত জোরে প্রাণে বেঁচে যান আবিদ আলি কুরেশির ভাইয়ের স্ত্রী রাফহা জাহান। তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে তার দুই কন্যা সন্তানকেও বাঁচাতে সক্ষম হোন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে খবর, ঘটনার পরে এলাকার বাসিন্দারা জড়ো হয়ে আক্রমণকারীদের তাড়া করলে সঙ্গে এলাকাবাসীদের সাথেও দুষ্কৃতীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। ফের চালানো হয় কয়েক রাউন্ড গুলি, সাথে বোমাও পড়ে। সেই সঙ্গে জি.সি.আর.সি. ঘাট রোডের উপরে ইট ও কাচের বোতলের বৃষ্টি চলে। বোমার স্‌প্লিন্টার ঢুকে গুরুতর আহত হন এক স্থানীয় যুবক।

এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, পুলিশের সামনেই এলাকার তৃণমূল কাউন্সিলরের স্বামী এলাকার দুষ্কৃতীদের নিয়ে তাণ্ডব চালালেও পুলিশ কার্যত ছিল নীরব দর্শক। যদিও পুলিশের দাবি, ঘটনার পরেই র‌্যাফ ও পুলিশ বাহিনী নামিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

এই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত তৃণমূল কাউন্সিলর শমিমা বানুর স্বামী শামিম আহমেদ ওরফে বড়ে জানান,” মাজহার খান ওরফে টিঙ্কু নামে এক দুষ্কৃতীর নেতৃত্বে এই গোলমাল হয়েছে, আমি এর মধ্যে ছিলাম না। সেই বোমা মেরেছে ও গুলি চালিয়েছে।”

তিনি আরো বলেন, “কুরেশিদের বাড়িতে যে গুলি চালানোর কথা বলছে, তা ঠিক নয়। সব মিথ্যা।” কুরেশি পরিবারের এক সদস্য সাহেব কুরেশি জানান, “কাউন্সিলরের স্বামীর বিভিন্ন অবৈধ কাজ কারবারের বিরুদ্ধে আমরা সব সময়ে প্রতিবাদ করে এসেছি। এর আগে ২০১২ সালেও আমাদের উপরে আক্রমণ করা হয়েছিল। এই বারও বড়ের নেতৃত্বেই দুষ্কৃতীরা আমাদের বাড়িতে আক্রমণ করল।” 

স্থানীয় বাসিন্দা সুকুমার গাঙ্গুলি জানান, “গুলির আওয়াজ ও চিৎকার শুনে আমরা বেরিয়ে এসেছিলাম। এরপরে আমরা সকলে মিলে দুষ্কৃতীদের তাড়া করি। পুলিশের সামনেই গোটা ঘটনা ঘটে। পুলিশ কার্যকরী পদক্ষেপ নিলে এটা হতো না।”

অন্যদিকে পুলিশ সূত্রে খবর, ওই দুষ্কৃতীরা পালিয়ে গিয়ে ট্রাম ডিপোর কাছে ফের কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। পুলিশ এলে পুলিশ ও এলাকার বাসিন্দাদের লক্ষ করে ইট ও বোতল ছুড়তে শুরু করে. শীতের রাতের নিঃস্তব্ধতা ভেঙে বোমা পড়তে থাকে পরপর। ভাঙচুর করা হয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চারটি গাড়ি। পরিস্থিতি সামালাতে হাওড়া সিটি পুলিশের পদস্থ কর্তারা বিশাল বাহিনী নিয়ে ছুটে যান। রাত তিনটে নাগাদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।


হাওড়া সিটি পুলিশের এক কর্তা বলেন, “পুরনো শত্রুতা ও এলাকা দখল ঘিরে এই সংঘর্ষ। দু’পক্ষই সশস্ত্র হামলার অভিযোগ করেছেন।” শনিবার রাতে গ্রেফতার করা হয় অভিযুক্ত বড়েকে।

পুলিশ জানায়, এর পরেই ফের উত্তেজনা ছড়ায় এলাকায়। আবার কয়েক রাউন্ড গুলি চলে। পরিস্থিতি সামলাতে এ দিনও নামাতে হয় র‌্যাফ। শিবপুর ট্রামডিপোয় জমি দখলের চেষ্টার ফলশ্রুতিতেই যে গুলি চালনার ঘটনাটা আরো ভয়ানক দিক নিতে পারতো, এমনটাই মনে করছেন হাওড়া সিটি পুলিশের তদন্তকারী অফিসারেরা।

ইতিমধ্যেই গতকাল গ্রেপ্তার করে আদালতে তোলা হয় ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কংগ্রেস সভাপতি শামীম আহমেদ ওরফে টিঙ্কু। অতীতে এই এলাকার স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে ছিনতাই করা, বিভিন্ন বেআইনি কর্মকাণ্ডে ওই এলাকারই কংগ্রেসের নেতা জাভেদ কুরেশি-এর সাথে একটি তিক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা হয়েছিল বেশ কিছু বছর ধরেই। কাল গ্রেফতারের পড়ে আহমেদকে ছয় দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠানো হয়েছে।

হাওড়া শহর তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বিষয়টি পরিষ্কার করে জানিয়েছে যে পুলিশি তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো দ্রুত পদক্ষেপ নেবে না। হাওড়া সদরের তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি অরুপ রায় বলেন, “তিনি (আহমেদ) একজন মানুষের নেতা। নিঃস্বার্থ ভাবেই তিনি রাজনীতি করে এসেছেন। এই ঘটনাতে রাজনৈতিক বিরোধীদের দ্বারা তৈরি চক্রান্ত ইচ্ছাকৃত ভাবেই তৈরি করা হয়েছে। এই সব মিথ্যা অভিযোগ, একজন ভাড়াটে হত্যাকারী আহমেদকে হত্যা করার জন্য চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু এলাকার সাধারণ মানুষ এই প্রচেষ্টাটি প্রতিরোধ করেছেন। এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। পুলিশ মামলার তদন্ত করছে।”

নিজের স্বামীর অপরাধের কথা অস্বীকার করলেও শামীমের স্ত্রী ও তৃণমূল কাউন্সিলর শামীমা বেগম অভিযোগ করেন, এই হামলার উৎপত্তি মূলত জমি দখল করাকে কেন্দ্র করে। তিনি বলেন “বেশ কয়েকজন স্থানীয় লোক ছিল, যারা আমাকে অভিযোগ করেছিল যে কুরেশি জোরপূর্বক তাদের জমি দখল করেছে এবং তাদের কাজ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। আমি এটা আমার স্বামীকে বলেছিলাম। সেই বিষয় নিয়েই আমার স্বামীকে ফাঁসানো হচ্ছে। “

এই ঘটনায় ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের পৌর প্রতিনিধি শুধু কুরেশিকে অভিযুক্তই করেননি, বরং গোটা বিষয়টিতে কুরেশির হাত আছে বলেই দাবি করেছেন। তিনি যা চেয়েছিলেন তা লড়ে পেতে অক্ষম, তার আরো চাঞ্চল্যকর অভিযোগ “এই কুরেশিই মজহার খান নামে একজন ভাড়াটে হত্যাকারী দিয়ে আমার স্বামীকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিলেন।”

এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন জানান, হাওড়া পৌর কর্পোরেশনের ওয়ার্ড নম্বর ৩৬ এর অধীনে এলাকায় বেশ কয়েকটি বড় বিল্ডিং নির্মাণে কুরেশির হাত রয়েছে। অতীতে সিপিএম থেকে আরজেডি এবং এখন তৃণমূল কংগ্রেসে থাকা আহমেদের সাথে কাজের কারণে এই এলাকাতে রেষারেষি আছে। কুরেশিকে হত্যার চেষ্টা ও আগ্নেয়াস্ত্র অবৈধ অস্ত্রোপচারের অভিযোগে ইতিমধ্যেই পুলিশ আহমেদকে গ্রেপ্তার করেছে।
আজও শিবপুর ট্রাম ডিপো এলাকা থমথমে চেহারা। গোটা বিষয়কে কেন্দ্র করে এলাকাতে চাপা আতঙ্কের পরিবেশ রয়েছে।

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment