32 C
Kolkata
Tuesday, May 28, 2024
spot_img

আমার জীবনকথা ভাগ-৭

হাওড়াবাসীর নানা রঙের দিনগুলি ভাগ-২

রোটারিয়ান স্বপন কুমার মুখোপাধ্যায়

১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ভারত স্বাধীনতালাভ করে। সেই দিনটির কথা আজও মনে পড়ে ১৪ই আগস্টেও হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয়েছিল। কিন্তু পরের দিনই পরিবেশটা যেন আশ্চর্যভাবে পাল্টে গেল। ভোরবেলায় বন্দেমাতরম সঙ্গীতের সঙ্গে প্রতি পরিবারের বাড়িতে জাতীয় পতাকা উড্ডীন হল। সেদিন পাবলিক বাসে কোনো টিকিট লাগেনি-যথা ইচ্ছা বিনা পয়সায় ঘুরে বেড়ানো হল। কোনো সিনেমা হলে টিকিট লাগেনি-বিনা পয়সায় যে কোনো সিনেমা হলে ইচ্ছামতো ছায়াছবি দেখা গেল। অনেক বাড়ির গৃহবধূরা সকালে ও সন্ধ্যাবেলায় শাঁক বাজায়। আরও মজার ব্যাপার হল যখন আমি শ্যামবাজার থেকে ৩এ বাসে করে কার্জন পার্কের বাস স্টপে পৌঁছে দেখেছি 'রাজভবন' জনসাধারনের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে এবং কাতারে কাতারে জনগন রাজভবনের ভেতরে প্রবেশ করছে। আমিও বাস থেকে নেমে পড়ে রাজভবনের একতলায় সাউথ মার্বেল হল দেখার পর ওই প্রাসাদের উত্তরদিকে দোতলায় ওঠার যে লম্বা লম্বা সিঁড়ি বাইরে থেকে দেখা যায় সেই সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে দেখি এক বিরাট হলঘর। পুরো হলটার চারপাশের দেওয়ালে পূর্ববর্তী লাটসাহেব, বড়লাট সাহেব ও ইংল্যান্ডের রাজারানীদের বিশাল সাইজের সব অয়েল পেণ্টিং করা বাঁধানো ছবির সমাহার। ওই হলের একদম দক্ষিন প্রান্তে ডবল বেড খাটের সাইজের সিংহাসন যেটা লাল ভেলভেট দিয়ে আপাদমস্তক মোড়া। ঐ সিংহাসনের দেওয়াল প্রান্তে ছোট ছোট অ্যালুমিনিয়ামের রডের মধ্যে আমাদের জাতীয় পতাকা। লাট সাহেবের শোবার খাটে আমিও খানিকক্ষণ শুয়েছিলাম। খাবার ঘরে দেখি সদ্য কেউ আম খেয়ে চলে গেছে- খোসাগুলি তখনও পাশে রাখা। বোধহয় শেষ ইংরেজ লাটসাহেব স্যার ফ্রেদারিক বারোজ আম খেয়ে তার নিজের দেশ ইংল্যান্ডে ফিরে গেছেন। আসলে আমি ৩এ বাসে চেপে আমার দাদামশাই-এর বড়িশার সাবর্ণ পাড়ায় ১৫নং নারায়ণ রায় রোডের বাড়িতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ রাজভবন খোলা দেখে নেমে পড়েছিলাম। কিন্তু ফেরার সময় ৩এ বাসে ভীড়ের জন্য উঠতে পারছিলাম না। পরিশেষে একটি পুলিশ ভ্যানের অফিসারের আনুকূল্য বেহালা থানা পর্যন্ত আসি এবং সেখান থেকে ৩এ বাসে চেপে বড়িশা শখের বাজারে নেমে মামার বাড়ি যাই। তখন ৩এ বাস স্ট্যান্ড আজ যেখানে পেট্রল পাম্প সেখানে ছিল। ওইদিন সন্ধ্যায় পাড়ার বড়দাদারা ছোটদের নিয়ে একটা লরি ভাড়া করে কলকাতার আলোকসজ্জা দেখাতে নিয়ে যায়। সেইদিন সবচেয়ে আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন। কারন ওইদিন বেলেঘাটায় জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীকে আমার দর্শন করার সৌভাগ্য হয়। বড়দাদারা এরপর লোয়ার চিৎপুর রোডে(বর্তমান নাম রবীন্দ্র সরনি) অবস্থিত নাখোদা মসজিদ দর্শনে নিয়ে যান। ওখানে মুসলিম ভাইরা আমাদের লাড্ডু খাওয়ান, গায়ে গোলাপজল স্প্রে করেন আর তুলায় আতর লাগিয়ে আমাদের দু'কানে গুঁজে দিয়ে আলিঙ্গন করেন। আমাদের খুব অদ্ভুত লেগেছিল। ১৪ই আগস্ট দাঙ্গা আর ১৫ই আগস্ট আলিঙ্গন। বিচিত্র এই দেশ। মহাত্মাজিকে ১৯৪৭ সালেই আরও দুবার দর্শন করি তাঁর প্রার্থনা সভায়। প্রথমবার 'হাওড়া ময়দানে' আর দ্বিতীয়বার উত্তর কলকাতার 'দেশবন্ধু পার্কে'। ১৯৪৮ সালে ৩০শে জানুয়ারি দিল্লির বিড়লা বাড়িতে জনৈক নাথুরাম বিনায়ক গডসে জাতির জনককে গুলি করে হত্যা করে। সেদিন হাওড়ার বাড়ির আশেপাশের সব দোকান-বাজার বন্ধ হয়ে যায়।

ক্রমশ....

Related Articles

Stay Connected

17,141FansLike
3,912FollowersFollow
21,000SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles