বেআইনি পথের রোজগার বন্ধে আরেক বেআইনি পথের নিদান

Spread the love
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

 

রাজীব মুখার্জী, কলকাতাঃ কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের দায়িত্ব নিজের হাতেই রেখেছেন নতুন মেয়র ফিরহাদ হাকিম। সদ্য পুরসভার দায়িত্ব নিয়েই কলকাতা পুর এলাকায় বেআইনি বাড়ি ও আবাসন নির্মাণ আটকাতে কঠোর রাস্তায় হাঁটতে চাইছেন নতুন মেয়র। তিনি জানিয়েছেন “শহরের পুরসভার অনুমোদন ছাড়া বাড়ির কোনও অংশে নির্মাণ করলেই পুরো বাড়িটিকেই বেআইনি ঘোষণা করে ভাঙার পদক্ষেপ করবে পুরসভা। এত দিন পর্যন্ত জরিমানা দিয়ে বেআইনি নির্মাণকে আইন সিদ্ধ করার প্রথা চালু ছিল পুরসভায়। সেই সুযোগে জরিমানা দিয়ে বেআইনি নির্মাণ করেও পার পেয়ে যেতেন প্রোমোটাররা। কিন্তু সেই সুযোগও এ বার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে”।

প্রসঙ্গত এই বেআইনি নির্মাণকে আইনি সিদ্ধ করার জন্য পুরসভার বিল্ডিং বিভাগে আলাদা একটি দপ্তর ছিল। সেই দপ্তরটিকেও তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে পুরসভা সূত্রের খবর। সদ্য মেয়র পদে যোগ দিয়েই ফিরহাদ হাকিম অফিসারদের সঙ্গে প্রথম বৈঠকেই সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, শহরে আর কোনও বেআইনি নির্মাণ বরদাস্ত করা হবে না। তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করতে পুর আধিকারিকদের নির্দেশ দিয়েছেন নতুন মেয়র। তারই রূপরেখা তৈরি করতে এই দিন পুরভবনে বিল্ডিং বিভাগের আধিকারিকদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেছিলেন পুর কমিশনার। সেখানেই, বেআইনি নির্মাণ রুখতে একাধিক কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই বৈঠকেই ঠিক করা হয় বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ পেলেই সংশ্লিষ্ট জমির মালিকের পাশাপাশি প্রোমোটার অথবা ডেভেলপারের বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক ভাবে এফআইআর দায়ের করা হবে। এত দিন, শুধুই জমির মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হতো। এর ফলে প্রোমোটার এবং ডেভেলপাররা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে যেতেন। এই সব অসাধু প্রোমোটারদের আইনের আওতায় আনতে এবার কৌশল বদলানো হচ্ছে।

পুরসভার এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে কলকাতার ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ জানান, “শহরের বহু বাড়িতেই দেখা যায় এক বা একাধিক ফ্লোর বেআইনি ভাবে বানানো হয়। কোনও বাড়ি যদি তিনতলা হয়, তার উপরে আরও দু’টি তলা বেআইনি ভাবে বানিয়ে ফেলেন প্রোমোটারেরা, তারপর সেটিকে আইনসিদ্ধ করার জন্য পুরসভায় আবেদন জানান। বেআইনি অংশ ভাঙতে গেলে বাড়ির যে অংশটা আইনমাফিক তৈরি হয়েছে, সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেই ভয়ে বেআইনি অংশ পুরোটা ভাঙা সম্ভব হয় না। বড় জোর ছাদ ফুটো করে নিজেদের দায় সারে পুরসভা। তাই সিদ্ধান্ত হয়েছে, বাড়ির কোনও ফ্লোর বেআইনিভাবে তৈরি হলেই সমগ্র বাড়িটিকে অবৈধ বলে ঘোষণা করা হবে এবং পুরো বাড়িটিকেই ভেঙে দেবে পুরসভা। এর জন্য পুর আইনে সংশোধনী আনা হবে। তবে সাধারণ মানুষের কথা মাথায় রেখে প্রস্তাবিত আইনে কিছু ছাড় রাখা হবে। মন্দির বা রান্নাঘর বেআইনি ভাবে নির্মাণ করা হলে পুরসভা বিবেচনা করে ছাড় দেবে”।

পুর আইনের প্রসঙ্গ উঠতেই আমরা কথা বলেছিলাম কলকাতা পুরসভার ভূতপূর্ব মেয়র ও আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচাৰ্য -এর সাথে। তিনি জানান, “এখনও এই বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা পুরসভাতে আসেনি। যদি বিষয়টা আসে তাহলে নতুন করে পুর আইনের বদল করেই করতে হবে। বর্তমান আইনে পুর বাড়িকে বেআইনি ঘোষণা করার কোনো নিদান নেই “।

এক্ষেত্রে পুর কমিশনার আরো জানান, “এই মিটিং থেকে শুধু আইন তৈরি নয়, বেআইনি বাড়ি ভেঙে দেওয়ার উদ্দেশে প্রতিটি বরো এবং পুরসভার কেন্দ্রীয় স্তরেও একটি বিশেষ টিম গঠন করা হবে। তাতে পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের আধিকারিকরা ছাড়াও পুলিশ ও প্রশাসনের আধিকারিকদেরকেও রাখা হবে। বর্তমানে পুরসভার হাত থেকে রেহাই পেতে প্রোমোটাররা সাধারণত বেআইনি বাড়িতে তাড়াহুড়ো করে লোক ঢুকিয়ে দেন। ফলে মানবিক কারণে সেই বেআইনি বাড়ি আমরা ভাঙতে পারি না। তাই এই বিষয়টি মাথায় রেখেই বেআইনি বাড়ি নির্মাণের শুরুতেই এবার থেকে ব্যবস্থা নেবে পুরসভা”। 

তবে মেয়র, ডেপুটি মেয়র বা পুর কমিশনার যতই বলুন নতুন আইন নিয়ম নীতি বদলের কথা, এই নতুন সিদ্ধান্তে অবশ্য অশনি সংকেত দেখতে পাচ্ছেন পুরসভার অর্থ বিভাগের আধিকারিকরা। তাঁরা বলছেন, বেআইনি বাড়ি আইনি করে পুরসভাতে জরিমানা বাবদ বছরে কয়েকশো কোটি টাকা জমা পড়ে। সেই থেকে আয়ের টাকা পুরসভার পরিষেবাতে খরচ হয় কিন্তু এই প্রক্রিয়া থেমে গেলে, পুরসভার আয়ের জায়গাতেও ঘাটতি পড়বে, সেক্ষেত্রে এই ঘাটতি কিভাবে মিটবে তার কোনো রাস্তা এই মুহূর্তে নেই।

দক্ষিণ কলকাতায় প্রোমোটারি রাজ যেভাবে থাবা দিয়েছে এখনও উত্তর কলকাতায় সেভাবে থাবা দিতে পারেনি। উত্তর কলকাতায় শরিকি ও ভাড়াটে সমস্যার দরুন কিছুটা হলেও থমকে গেছে নতুন বাড়ি প্রোমোটারের হাতে দিয়ে দেওয়ার কাজ। এই নতুন আইন কোনোভাবে উত্তর কলকাতায় প্রোমোটারি রাজকে উৎসাহিত করার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বেশ কিছু উত্তর কলকাতার মানুষ।

এই বিষয়ে বি. জে. পি.- র সায়ন্তন বসু জানান, “এটা ব্ল্যাকমেল করার একটা উপায় । রাজ্যে সর্বত্র যেভাবে তোলাবাজি চলছে সেই তোলাবাজিকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রচেষ্টা এটা। এটা ভয় দেখানোর একটা প্রয়াস, যে আমার কথা মতো না চললে বিপদে ফেলে দেব এটা তার প্রবণতা। তোলাবাজি আর সিন্ডিকেট রাজকে তোল্লা দেওয়ার প্রয়াস এটা। আর আমার মর্জি মতো না করলে তাঁকে ভয় দেখানোর প্রয়াস এইটা এবং এটা আইনের চোখে কি ভাবেই দাঁড়াবে এটা আইনের বিচার্য বিষয়। এটা করা যায় না কারন বৈধ্য অনুমতি পত্র পাওয়া সম্পত্তি তৈরি হলে কর্পোরেশন তাকে কোনো আইনের মাধ্যমেই বেআইনি বলতে পারে না। এটা অসাংবিধানিক। এভাবে চলতে পারে না”। ওপর দিকে এই নতুন আইন কার্যকর করা পুরসভার পক্ষে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলেই মনে করছেন পুরসভার কর্তাদের একাংশ। 

উল্লেখ্য ২০১৭ সালের দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল হাউজিং ইন্ডাস্ট্রি রেগুলেশন অ্যাক্ট-২০১৭ পাশ হয়েছে ২০১৭ সালেই। তার পরবর্তীকালে পাশ হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের আবাসন সংক্রান্ত আইন রিয়াল এস্টেট রেগুলেটরি অ্যাক্ট বা রেরা। এখন মেয়রের ঘোষণা মতো পুর আইনের পরিবর্তন এই দুই কেন্দ্রীয় ও রাজ্য আইনের পরিপূরক হিসাবে আর এর সঠিক ভাবে এর আইনকে কার্যকারি রূপে কতটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন মেয়র তার দিকেই তাকিয়ে আছে ওয়াকিবহাল মহল।

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment