অনিশ্চিয়তায় পুরসভার ভবিষ্যৎ, শিকেয় উঠতে চলেছে পরিষেবা, ধীরে চলো নীতিতেই রাজনৈতিক মোকাবিলার পথে

Spread the love
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

 

রাজীব মুখার্জী, হাওড়াঃ আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে কোনো রকমের ঝুঁকি নিয়ে প্রস্তুত নন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে যত সময় এগোচ্ছে। রাজ্যের সাথে সাথে হাওড়া জেলাতেও ক্রমবর্ধমান বি. জে. পি.-র সংগঠন ইতিমধ্যেই শাসক গোষ্ঠীর কপালেও চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। তাই তাড়াহুড়ো না করে ধীরে সুস্থেই এগোচ্ছে হাওড়া পুরসভা এই বিষয়ে। আগামী ১০ই ডিসেম্বর ২০১৮ তেই মেয়াদ শেষ হচ্ছে বর্তমান হাওড়া পুর বোর্ডের।

পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, সে দিনের পর থেকে মেয়র পারিষদ ও কাউন্সিলরদের ভূমিকা কী হবে, তা এখনও তাঁদের কাছেই স্পষ্ট নয়। মেয়াদ পেরোনোর পড়ে বাসিন্দাদের নিত্যদিনের পুরসভার প্রয়োজনীয় কাজ কি ভাবেই হবে। সেই নিয়ে আপাতত শংকিত হাওড়া পুরবোর্ডের সদস্যরা নিজেরাই। প্রতিদিন যে বিভিন্ন ধরণের শংসাপত্রে কাউন্সিলরদের যে সই করতে হয়, তাঁদের পরিবর্তে তখন তা কে বা কারা করবেন, কিভাবে মানুষ পরিষেবা পাবেন তা-ও জানা যায়নি। এক্ষুনি নির্বাচনে না গিয়ে প্রশাসক নিয়োগ করার সিদ্ধান্তে কার্যত দোটানাতে রয়েছে অবস্থা হাওড়া পুরসভা। বিভিন্ন জনমোহনী কার্য করতে গিয়ে বিশেষ ছাড়ের সুবিধা দিতে গিয়ে খরচের চাপে কোষাগারের “নুন আনতে পান্তা ফুরানোর” মতো অবস্থা। তার উপরে বাকি রয়েছে হাতে নেওয়া অসমাপ্ত একাধিক প্রকল্পের কাজ। এখন অবস্থা তাতে, ৬৬ টি ওয়ার্ডের সব কটিতে ন্যূনতম পুর পরিষেবাটুকু দেওয়া যাবে কি না, তা নিয়েই সংশয় দেখা দিচ্ছে। সব থেকে বড় কথা, বর্তমান তৃণমূল পুরবোর্ডের মেয়র, মেয়র পারিষদ ও কাউন্সিলরদের ভূমিকা আগামী দিনে কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। পুরবাসীরা প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সার্টিফিকেট কীভাবে সংগ্রহ করবেন, সেটাও এখন প্রশ্নের মুখেই।

মেয়াদ উত্তীর্ণ সময়ের এই সমস্যা নিয়েই কয়েক মাস আগে হাওড়া পুরসভার তৃণমূল বোর্ডের মেয়র পারিষদেরা রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরকে লিখিত ভাবে জানিয়েছিলেন, তাতে তাঁরা জোরের সাথেই জানিয়েছিলেন যে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত কিন্তু রাজ্য সরকার সেই প্রস্তাবে গুরুত্ব না দিয়ে মঙ্গলবার বিধানসভায় পুর আইনের সংশোধনী বিল এনে অনির্দিষ্ট কালের জন্য নির্বাচন স্থগিত করে প্রশাসক বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে হাওড়া পুরসভা তৈরি হওয়া এই সমস্যার সমাধান সূত্র কি ভাবেই বেরোবে সেই নিয়ে এখন কার্যত দ্বিধাগ্রস্ত হাওড়া পুরসভা। হাওড়া পুরসভার ইতিহাসে এই প্রথম বার এই ঘটনা ঘটছে যে নির্দিষ্ট সময় পেরোনোর পরেও পুরসভার ভোট এই মুহূর্তে হচ্ছে না। তাই প্রথম এমন ঘটনা ঘটায় পুরসভার অন্দরমহলে ইতিমধ্যেই নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন রকমের সংশয় দেখা দিয়েছে কাউন্সিলরদের মধ্যেই। সমস্যা আছে সত্যিকারের বেশ কিছু।

৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জানান, “শুধু শংসাপত্র দেওয়া নয়, পাড়ায় কোনও পশুর মৃতদেহ পড়ে থাকলেও লোকজন কাউন্সিলরকে ফোন করেন। অথচ, এখন আমাদের হাতে ক্ষমতা না থাকলে পুর অফিসারেরা কি আমাদের কথা মেনে কাজ করবেন?”

এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত হাওড়ার পুর কমিশনার বিজিন কৃষ্ণও, তিনিও বলেন, “এই বিষয়গুলি আমি রাজ্য সরকারের কাছে জানতে চেয়েছি। চন্দননগর পুরসভাতেও প্রশাসক রয়েছেন। তাঁর সঙ্গেও আমি কথা বলব।” পুরসভার হিসাবের খতিয়ান বলছে বিগত চার বছরে হাওড়া পুরসভার আয়তনের বহর যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে কাজকর্মের পরিধিও। সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে খরচের পরিমাণও। সদ্য বালি পুরসভা সংযুক্তিকরণের ফলে এই মুহূর্তে হাওড়া পৌরসভার মোট ওয়ার্ডের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৬৬। একই সঙ্গে বড় অফিসের সংখ্যা পাঁচ থেকে বেড়ে হয়েছে সাতটি। গত চার বছরে পুরসভায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে নিযুক্ত হওয়া কর্মীর সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার।

মেয়র রথীন চক্রবর্তীর অবশ্য দাবি করছেন , “গত চার বছরে আমাদের পুরসভা প্রায় ১৪০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে সক্ষম হয়েছি। সেই টাকা দিয়েই হাওড়ার উন্নয়ন ও কর্মী নিয়োগ করেছি আমরা। এর পাশাপাশি, ব্যাঙ্কেও প্রায় ১০০ কোটি টাকার স্থায়ী আমানতও তৈরি করতে পেরেছি এই চার বছরে।” তবে মেয়র এ কথা বললেও পুর অফিসারদের একাংশের গলায় সোনা যাচ্ছে ভিন্ন সুর, তাঁদের অভিযোগ প্রথম ২ বছর আয় বাড়লেও বর্তমানে আয়ের থেকে ব্যয় অনেকটাই বেড়েছে, যার ফলে সব কটি প্রকল্পের গতি থমকে দাঁড়িয়েছে। এমনকি মেয়রের দাবি করা স্থায়ী আমানতও ভাঙতে হয়েছে ইতিহাস মধ্যে। তাই হাওড়ার পুরকর্মী ও অফিসারদের আশঙ্কা, প্রশাসক থাকার মেয়াদ দীর্ঘ হলে পুরসভার অর্থসঙ্কট আরো বাড়বে বই কমবে না কারণ, অধিকাংশ দফতরে ঠিক ভাবে পরিচালিত হবে না, নজরদারি কমবে। অহেতুক খরচ বাড়বে যা অন্যান্য পৌরসভা গুলোর সাথে অতীতে ঘটেছে।

অপরদিকে কর্মীদের মনে প্রশ্ন এইটাও এখন যে পরিমাণ খরচ বেড়েছে, সেই অর্থের সংস্থান করে প্রকল্পগুলির কাজ শেষ করা বা কর্মীদের নিয়মিত বেতন দেওয়া কি প্রশাসকদের পক্ষে সম্ভব হবে? এই প্রসঙ্গে মেয়র জানান, “মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর আমাদের অগাধ ভরসা আছে। তাই এই নিয়ে কোনও সমস্যা তৈরি হবে বলে আমার মনে হয় না।” প্রায় একই বক্তব্য মধ্য হাওড়ার বিধায়ক তথা রাজ্যের সমবায়মন্ত্রী অরূপ রায়েরও। তিনি বলছেন, “হাওড়া শহরে আমাদের পাঁচ জন বিধায়ক আছেন। একজন সাংসদও আছেন। তাছাড়া, দলের এতজন কাউন্সিলরেরা আছেন। তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব কর্তব্য নিশ্চই পালন করবেন মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পরেও। তাই সাধারণ মানুষের পুর পরিষেবা পেতে কোনও অসুবিধা হবে না।” সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। আমরা কথা বলছিলাম উপেন পাত্রের সাথে।

৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের দীর্ঘ দিনের বাসিন্দা বয়স্ক উপেন বাবু বলছেন, ” এই ওয়ার্ডের পুর প্রতিনিধি মারার গিয়েছেন অনেক দিন হলো, এখানে নেই কোনো নূন্যতম পরিষেবা। হাতের কাছে পুর প্রতিনিধিকে পাওয়া গেলে তাও তাঁকে সমস্যার কথা জানানো যায়, আর এখন প্রশাসক নিযুক্ত হলে তাঁকে নাগালের মধ্যে পাওয়াটাই তো সব চেয়ে বড়ো সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। রাস্তায় আবর্জনা জমে থাকলে, রাস্তার আলো না জ্বললে কোথায় খুঁজবো তাঁকে?” একই কথা বলছেন ৪৮ এর কংগ্রেস নেতা স্বরূপ মুখার্জীর সাথে, তিনি জানান ” পুর প্রতিনিধি থেকেই কাজ পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর প্রশাসক কি কাজ করবেন সেটা চিন্তার ও যথেষ্ট সন্দেহের বিষয়। বর্তমান শাসক দল ভয় পেয়েছে মানুষের মুখোমুখি হতে। উন্নয়ন সত্যিকারের হলে এতো ভয় কিসের? “

এই বিষয়ে আমরা প্রতিক্রিয়া নিয়েছিলাম হাওড়ার বাসিন্দা ও রাজ্য বি. জে. পি. র দায়িত্বে থাকা জয় ব্যানার্জীর থেকে। তিনি জানাচ্ছেন, “এই চিত্র সারা বাংলাতেই। অনেক পুরসভার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ার পরেও নির্বাচন হচ্ছে না। এস. ডি. ও. র মাধ্যমে প্রশাসক নিয়োগ করেই চলছে। বর্ধমান, ডায়মন্ডহারবার, চন্দননগর এরম অনেক পৌরসভা আছে রাজ্যে। আসল কথা হলো এরা ভয় পাচ্ছে নির্বাচনেই আসতে। আমরা চাইছি অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। এই মুহূর্তে ক্ষমতা ওঁদের হাতে। এভাবে প্রশাসক নিয়োগ করে নির্বাচন আটকে রাখার কাজ ঠিক নয়। নির্বাচন করতেই হবে। মানুষ সব দেখছে, এসবের জবাব তাঁরাই দেবেন। তাই বি. জে. পি. বাড়ছে এই রাজ্য। আমাদের রথ যাত্রা কর্মসূচি শেষ হলেই এই বিষয় নিয়ে রাস্তায় নামবো। “

মূলত অভিযোগ প্রতি অভিযোগ নিয়ে রাজনৈতিক দলের রাজনীতির চাপান উত্তরের মাঝে এই মুহূর্তে সাধারণ মানুষদের কাছে নিত্য পরিষেবা যাতে বজায় থাকে সেটাই চাইছেন হাওড়া পুরসভার নাগরিকেরা আর এই কাজে কতটা পুরসভা তাঁদের স্বস্তিতে রাখতে পারে এটাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন?

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment