বাংলাদেশে বেপরোয়া কোচিং বাণিজ্য

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মিজান রহমান, ঢাকাঃ শিক্ষাবর্ষের শেষ সময়ে বেপরোয়া শিক্ষা বাণিজ্যে লিপ্ত হয়েছে কোচিং ব্যবসায়ীরা। কোচিং সেন্টারে ভর্তির প্রচারণাও চলছে জোরেশোরে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিং এবং বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির নামে কোচিং বাণিজ্যে সরগরম রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা। ঢাকার বিভিন্ন অলিগলিতেও কোচিং ব্যবসায়ীদের ব্যানার, ফেস্টুনের আধিক্য। শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে চটকদার বিজ্ঞাপন ব্যবহার করছে কোচিং ব্যবসায়ীরা।

শিক্ষা আইন না থাকায় শুধুমাত্র সরকারি পরিপত্র ও নীতিমালা জারি করে কোচিং সেন্টার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছেন শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। প্রশ্নপত্র ফাঁসের তকমা থেকে রক্ষা পেতে গত কয়েক বছর ধরে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী এবং অষ্টম শ্রেণীর জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে সব ধরনের কোচিং সেন্টার বন্ধের নির্দেশ দিয়ে আসছে শিক্ষা প্রশাসন। এই নির্দেশও খুব একটা আমলে নিচ্ছে না কোচিং ব্যবসায়ীরা।

নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষায় সঙ্গবদ্ধভাবে কোচিং অ্যাসোসিয়েশন গঠন করেছে শিক্ষা ব্যবসায়ীরা। এবারের জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে পুলিশের পক্ষ থেকে সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে রাজধানীর কোচিং সেন্টারের একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে। এই তালিকা অনুযায়ী ঢাকা মহানগরীতে কোচিং সেন্টার রয়েছে ৪৮৮টি। এর মধ্যে রমনা এলাকায় ৪৬টি, লালবাগে ৫১টি, মতিঝিলে ৯৬টি, ওয়ারীতে ৫২টি, গুলশানে ২০টি, তেজগাঁওয়ে ৬৪টি, মিরপুরে ৮৮টি এবং উত্তরা এলাকায় ৩১টি কোচিং সেন্টার রয়েছে। এই তালিকার বাইরে ঢাকার অলিগলিতে আরও অনেক কোচিং সেন্টারের কার্যক্রম চালু রয়েছে।

গত ১লা নভেম্বর জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে, যা চলবে ১৫ই নভেম্বর পর্যন্ত। এরপর ১৮ই নভেম্বর পঞ্চম শ্রেণীর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। এর আগে গত ২৯শে অক্টোবর সচিবালয়ে জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। ওইদিন মন্ত্রী বলেন, এই পরীক্ষা চলাকালে সব কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখা হবে। কেউ যদি পরীক্ষা চলাকালে কোচিং সেন্টার খোলা রাখে তবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের আশঙ্কা থাকে উল্লেখ করে বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “সব ধরনের কোচিং সেন্টার অবৈধ। তাই এ সময় সব প্রকার কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা আয়োজনে চার স্তরের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”

২০১২ সালে কোচিং বাণিজ্য বন্ধে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নীতিমালায় স্কুল শিক্ষকদের তাদের নিজ প্রতিষ্ঠানের ১০ জনের বেশি শিক্ষার্থীর কোচিং করানোর ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের ওই নীতিমালা উপেক্ষা করে কোচিং সেন্টারগুলো শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য করছে। এ সংক্রান্ত আইন না থাকায় কোচিং বাণিজ্য রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না শিক্ষা প্রশাসন। এমনটি স্কুল শিক্ষকরাই বিভিন্ন আবাসিক বাড়ির ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে কোচিং সেন্টার খুলে বসেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সুপারিশের ভিত্তিতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪/৫শ’ শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানারকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপরও নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না কোচিং বাণিজ্য।

তবে কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানো বন্ধ এবং সব ধরনের নোট-গাইড, অনুশীলন বা সহায়ক বই নিষিদ্ধ করে সম্প্রতি শিক্ষা আইনের খসড়া চূড়ান্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই আইন পাস করে কোচিং সেন্টার বন্ধে অভিযান পরিচালনা করতে পারবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ব্যাপারে মাউশি অধিদফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালক প্রফেসর ড. শামছুল হুদা সংবাদকে বলেন, ‘শিক্ষা আইন না থাকায় কোচিং সেন্টার ও নোট-গাইড বইয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। সরকারি পরিপত্র ও নীতিমালার মাধ্যমে এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। আইন করার আগ পর্যন্ত কোচিং বাণিজ্য ও নোট-গাইডের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাধারণ স্কুল পর্যায়ের পাবলিক পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে এমনিতেই কোচিং সেন্টারের কার্যক্রম কিছুটা সীমিত হয়ে পরে। কারণ ওই সময় পরীক্ষার্থীদের পেছনে অভিভাবকদেরও দৌড়াতে হয়। পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে অভিভাবকদের ভিড় করতে দেখা যায়। এই সুযোগে পরীক্ষা কেন্দ্রের আশপাশে দেয়ালে পোস্টার, বিলবোর্ড ও সাইনবোর্ড লাগানোর পাশাপাশি অভিভাবকদের হাতে হাতে লিফলেটও বিতরণ করছেন কোচিং সেন্টারের মালিকরা। চলমান জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা চলাকালীন সময়েও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। কোচিং সেন্টারগুলো তাদের কথিত একাডেমিক কার্যক্রম কিছুটা সীমিত করে প্রচারমূলক কাজের ওপর জোর দিচ্ছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করছেন, সামনে সংসদ নির্বাচন। এর আগে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিতর্কিত করার জন্য একাধিক চক্র সক্রিয় রয়েছে। চক্রটি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের তৎপরতায় লিপ্ত ছিল। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থার কড়া নজরদারির কারণে তা সম্ভব হয়নি। এরপর চক্রটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের চেষ্টা চালায় এবং ‘ঘ’ ইউনিটের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। এখন জেএসসি ও জেডিসি চলমান রয়েছে।

এরপর প্রাথমিক শিক্ষা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের চেষ্টা করে এটিকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করতে পারে কোচিং সেন্টার চক্র। কোচিং ব্যবসায়ীদের এই পরিকল্পনা নস্যাৎ করার জন্য পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের ৬টি দল কাজ করছে। পাশাপাশি পরীক্ষার আগে সকল কোচিং সেন্টার বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারাদেশের কোচিং ব্যবসায়ী মিলে ‘কোচিং অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠন করেছেন, যার কার্যালয় রাজধানীর ফার্মগেটে।

সম্প্রতি এই সংগঠনের এক নোটিশে বলা হয়, ‘ফার্মগেটে অবস্থিত সকল কোচিং পরিচালক ও মালিকদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, গত ১৬ জুলাই তারিখে কোচিং অ্যাসোসিয়েশনের সভায় ছাত্রছাত্রীদের বেতন/টিউশন ফি পরিশোধের বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে। এগুলো হচ্ছে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত টিউশন ফি পরিশোধ করবে। অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা চলতি অক্টোবর পর্যন্ত টিউশন ফি পরিশোধ করবে। অন্যান্য শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা ভর্তির পর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত টিউশন ফি পরিশোধ করবে। ক্লাসে উপস্থিত না থাকলেও প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে যথাসময়ে টিউশন ফি পরিশোধ করতে হবে।’

ফার্মগেট ছাড়াও ঢাকার মালিবাগ, মৌচাক, খিলগাঁও, গোড়ান, সবুজবাগ, শাহজাহানপুর, মতিঝিল, বাড্ডা এলাকায়ও বিপুলসংখ্যক কোচিং সেন্টারের কার্যক্রম চলছে। পাড়া-মহল্লার বেকার যুবকরাই মূলত এলাকাভিত্তিক কোচিং সেন্টার খুলে ব্যবসায় নিয়োজিত হচ্ছেন। এছাড়া সরকারি ও বিভিন্ন এমপিওভুক্ত স্কুলের শিক্ষকরা নিজেরাও কোচিং সেন্টার ব্যবসায় জড়িয়ে পরছেন। কেউ কেউ অন্যের কোচিং সেন্টারে ভাড়াটে শিক্ষক হিসেবেও খাটছেন। এর কোনোটিতে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী, কোনোটিতে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত, আবার কোনোটিতে মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্তও কোচিং করানো হয়। আবার কিছু কোচিং মূলত পাবলিক পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও মডেল টেস্ট নির্ভর।

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment