আমার জীবনকথা ভাগ-৫

আমার জীবনকথা ভাগ-৫

বালির বাড়ির ইতিকথা

রোটারিয়ান স্বপন কুমার মুখোপাধ্যায়

বালির উত্তর দিকে বিবেকানন্দ সেতুর আদিনাম ছিল “ওয়েলিংটন ব্রিজ” এবং এই সেতুর অপর প্রান্ত হল দক্ষিণেশ্বর। এই সেতুই আর বালিখাল হল বালির উত্তর সীমানা। তারপর হুগলি জেলা শুরু হয়েছে উত্তরপাড়া থেকে আর দক্ষিণদিকের সীমানা হল পূর্বে গঙ্গানদী আর পশ্চিমে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে বেলুড় স্টেশন রোড শুরু হয়েছে। তারপর থেকে বেলুড়। অর্থাৎ বালির দক্ষিনে বেলুড় লিলুয়া আর উত্তরে উত্তরপাড়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কয়েক বছর আগে পর্যন্ত বালির লোকসংখ্যা ছিল পঁয়তাল্লিশ হাজার হিন্দু-ব্রাহ্মন পরিবার এবং এঁরা এতটাই গোঁড়া ব্রাহ্মন ছিলেন যে বেলুড় ও উত্তরপাড়ায় লোকেরা কলের জল পান করলেও বালির বসবাসকারী লোকেরা গঙ্গাজল গরম করে ফিটকিরি দিয়ে পান করতেন। আমাদের বাড়িতেও কল ছিল না। পুকুর, পাতকুয়া ও টিউবকল ছিল। বালিতে তদানীন্তন কালে বিবেকানন্দ সেতুর পাশেই ছিল স্যার ওঙ্কারমল জেটিয়ার মন্দিরবাড়ি। উনি এই মন্দিরবাড়িতে বাস করতেন। প্রত্যেকদিন কলকাতা থেকে গাড়ি করে তাঁর ব্যবহারের জন্যে কলের জল আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যেত আর তার সঙ্গে ওনার গৃহে পূজার জন্য ফুল সরবরাহ হত। আমার পিতৃদেব স্যার ওঙ্কারমলের স্নেহধন্য থাকার জন্য পিতৃদেবের অনুরোধে ওনার গাড়ি থেকে আমাদের বাড়িতে পানীয় জল আসতো। ফলে বালির লোকজন বলতো উনি ম্লেচ্ছ। পরবর্তীকালে আমাদের বাড়ির পাশেই হরমিলার ডকের ইংরেজ সাহেবের ফিল্টার করা জল আমাদের বাড়ির কাজের লোকেরা নিয়ে আসতো। এসব ছিল আমাদের বাড়ির প্রাচীন ব্যবস্থা।

এরপর ১৯৪০ সালের শেষদিকে আমার পিতামহ ডা. নরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় চুঁচুড়ার বাসাবাড়ি পরিত্যাগ করে আমাদের সকলকে নিয়ে বালির বাড়িতে চলে আসেন। সম্ববত আমার বয়স তখন ছয় বছর। ১৯৪১ সালের জানুয়ারি মাসে বালির “রিভার থমসন স্কুলের” প্রথম শ্রেনিতে আমাকে ভর্তি করা হয়- তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। এই স্কুলের বর্তমান নাম “শান্তিরাম বিদ্যালয়।” ওই স্কুলের পাশেই ছিল বালির পাবলিক লাইব্রেরি। তার পাশে ছিল বালি মিউনিসিপ্যালিটির অফিস বাড়ি। এর উল্টোদিকে ছিল বালির বাজার। এসব আজও আছে। আজও আমার মনে আছে ওই যুদ্ধকালীন ভয়াবহতাকে পরিহার জন্য আমার পিতামহ কয়েক মাসের জন্য আমাদের সকলকে নিয়ে ও সঙ্গে আমার বড় পিসিমা অমলাদেবী ও তাঁর দুই পুত্র মন্টুদা ও খোকাকে নিয়ে দেওঘরে “অবিনাশ কুটীর” নামে এক বিশাল বাড়িতে কয়েক মাস ছিলেন। পিতৃদেব যাননি। তাঁর ভাইদের মধ্যে শুধু আমার ছোটকাকু ছিলেন। স্মৃতি মন্থন করলে মনে হয় আজকের অনুকুল ঠাকুরের আশ্রমের কাছাকাছি কোথাও হবে। ফিরে আসার পর দেখেছিলাম ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ। হাজার হাজার লোক আমাদের বাড়ির সামনে জি.টি. রোড ধরে চলেছে-সঙ্গে মালপত্র ও গোরু। এরা হয়তো বিহারী। আমার পিতামহ ৩০ টাকা দিয়ে একটা ভাগলপুরী গাই কিনেছিলেন-দু’বেলা প্রচুর দুধ দিত। চরম ক্ষুধার্ত মানুষরা আমাদের বাড়িতে এসে ভাতের ফ্যান চাইত। আমার খুব কষ্ট হত।

আমার পিতৃদেব অক্ষয়কুমারের বিশাল চেহারা ছিল। যথা ৬ ফুটের উপর লম্বা, বুকের ছাতি ৫৬”, ও দেহের ওজন তিন মন। কিন্তু অতিরিক্ত ব্লাডপ্রেসারের সঙ্গে প্রচন্ড সুগার। অর্থাৎ ডায়াবেটিস আক্রান্ত হয়ে রোগা হয়ে যাচ্ছিলেন। ডাক্তাররা পরামর্শ দিলেন বালি থেকে হাওড়া কোর্টে নিত্য যাতায়াত না করে আদালতের কাছাকাছি কোথাও বসবাস করলে বাড়ি থেকে পদব্রজে যাতায়াত করা যাবে। সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসাও চলবে। ১৯৪২ সালে আমার ন’কাকুর অর্থাৎ ডা. রবীন্দ্রনাথের বিবাহের পর ১৯৪৪ সালে ছোট পিসিমার বিবাহ হয়। তারপর ১৯৪৪ সালের ১৮ই জুলাই পিতৃদেব, মাতৃদেবী, আমার ৪ বোন ও আমাকে নিয়ে হাওড়া ময়দানের কাছে ২৩৩ নং পঞ্চাননতলা রোডে এক ত্রিতল ভাড়াবাড়িতে চলে গেলেন। তখন আমি চতুর্থ শ্রেনির ছাত্র। বালির স্কুলের হাফ ইয়ারলি পরীক্ষার পর। আমাদের নতুন জীবন নতুন পরিবেশে শুরু হল। তখন আমার বয়স প্রায় দশবছর পূর্ণ হতে চলেছে। তখন আমার ছোটবোন পুতুল (বন্দনা) মাত্র তিন বছরের শিশু। বিশ্বযুদ্ধ তখনও চলছে।

ক্রমশ…..

You May Share This
  • 15
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    15
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *