কুম্ভকর্ণ পৌরসভা, লক্ষণের শক্তিশেল, সীতার মুক্তি

Spread the love
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

 

রাজীব মুখার্জী, সাঁতরাগাছি, হাওড়াঃ এই রাজ্যে শীতকালে পরিযায়ী পাখির আগমনস্থল হিসাবে দুনিয়া জোড়া খ্যাতি সাঁতরাগাছি ঝিলের। ৩২ একর জমির উপরে বিস্তৃত এই সাঁতরাগাছি ঝিল। এই বছরে চোখে পড়ছে অর্ধেক ঝিল ভোরে উঠেছে কচুরিপানা, পড়ে আছে সদ্য বিসর্জনের কাঠামো। এই ঝিলের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার, সেই প্রশ্নেই কার্যত কোন্দল শুরু হয়ে গিয়েছে দুই পক্ষের মধ্যে। যার জেরে অযত্ন আর অবহেলায় ৩২ একরের ঝিলটি হয়ে দাঁড়িয়েছে স্রেফ রেল ও এলাকার বাসিন্দাদের আবর্জনা ফেলার জায়গা।

গোটা ঝিল ভরে গেছে প্রায় আড়াই ফুট উচ্চতার কচুরিপানায়। গত বছর হাওড়া পুরসভা তা পরিষ্কার করলেও এই বছর কোনও উদ্যোগ নেই এখনও অব্দি। আবর্জনা আর কচুরিপানায় ভরা ওই ঝিলে এ বছর পরিযায়ী পাখিরা আগের মতো আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে পাখির প্রেমীদের মধ্যেই। এর আগেই জাতীয় পরিবেশ আদালত নির্দেশ দিয়েছিল, সাঁতরাগাছি পাখিরালয়ের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে হাওড়া পুরসভাকে কিন্তু বাস্তবে দেখা গিয়েছিল, গোটা ঝিল পানায় ভরে গেলেও তা পরিষ্কারের কাজে উদাসীন থেকে সেই নির্দেশ কার্যত অমান্য করে গেছে।

এক্ষেত্রে পুরসভার তরফের যুক্তি, কোনও ব্যক্তি বা সংস্থা স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে এগিয়ে যদি আসে, তাহলে তাঁদের তারা লোকবল ও যন্ত্র দিয়ে সাহায্য করবে। এর বেশি দায়িত্ব পুরসভা নিতে পারবে না। সুতরাং প্রশ্ন উঠছে যে পুরসভা কিভাবে পরিবেশ আদালতের নির্দেশ কে উপেক্ষা করতে পারে !তাঁদের সাথে সম্মিলিত হয় হাওড়া পুলিশ কমিশনারেট। ২৪শে নভেম্বর হাওড়া হাওড়া সিটি পুলিশের পক্ষ থেকে ওই সাঁতরাগাছি ঝিলের ধারেই ছোট দোল ক্লাবের প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হলো “সাঁতরাগাছি ওয়াটার বডি প্রজেক্ট ” -এর অন্তর্গত “সাফাই ও সবুজ” অনুষ্ঠান।

মূলত হাওড়া পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে এই অনুষ্ঠান আজ সকাল ১০ টায় অনুষ্ঠিত হলো সাঁতরাগাছি ঝিলকে পরিষ্কার রাখার সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে। এই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের হাতে ছিল এই ঝিল কে সুস্থ ও সুন্দর রাখার আবেদনকারী প্ল্যাকার্ড। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ কমিশনার তন্ময় রায় চৌধুরী সহ পুলিশের উচ্চ পদস্ত আধিকারিকেরা। উপস্থিত ছিলেন পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত, অভিনেতা ও গায়ক সাহেব চ্যাটার্জী সহ অন্যান্য বিশিষ্ট জনেরা। সাঁতরাগাছি ঝিল কে পরিযায়ী পাখিদের থাকার উপযোগী রাখা, ঝিলে ময়লা, আবর্জনা ফেলে এই ঝিল কে দূষিত না করা, ইকো সিস্টেমে ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে এই ঝিলের গুরুত্ব মূলত এই কথা গুলোই উঠে আসে বক্তাদের বক্তব্যের মাধ্যমে। সাধারণ মানুষদের সচেতন করে তোলাই এই অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য।

ইতিমধ্যে আশার কথা, পুর প্রশাসন দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার পড়ে শেষ পর্যন্ত ঝিল পরিষ্কারে এগিয়ে আসেন একাধিক বেসরকারি সংস্থা, কলেজপড়ুয়া ও সাধারণ মানুষ। এই সংস্থাগুলির সদস্যদের আশা, দু’সপ্তাহের মধ্যে সব কচুরিপানা পরিষ্কার হয়ে যাবে এবং তৈরি হয়ে যাবে পরিযায়ী পাখিদের বসার জন্য পানা দিয়ে তৈরি ছোট ছোট দ্বীপও। পক্ষীপ্রেমীদেরও আশা, এর পরে আগামী মাসে পরিযায়ী পাখি আসার ক্ষেত্রে আর সমস্যা হবে না। কিন্তু আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও পুরসভা পানা পরিষ্কার করল না কেন?

হাওড়া পুরসভার কমিশনার বিজিন কৃষ্ণ বলেন, “গতবার পুরসভার সাফাইকর্মীরা ঝিল পরিষ্কার করতে গিয়ে সব কচুরিপানা তুলে ফেলায় পাখিদের বসার জায়গা ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছিল। এ বার তাই আমরা আর কোনও ঝুঁকি নিইনি। কারণ, পাখিদের বসার ওই ছোট দ্বীপ তৈরি করার মতো দক্ষ কর্মী পুরসভার নেই।”

প্রসঙ্গত ঝিলের দুরবস্থার কথা সামনে আসার পরেই পুরসভা, রাজ্য বন্যপ্রাণ দফতর ও বন দফতরের সঙ্গে কথা বলে পানা সাফাইয়ে উদ্যোগী হয়েছিল একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা-সহ কলকাতার একটি বেসরকারি কলেজ ও সেখানকার পড়ুয়ারা। ওই সংস্থার সম্পাদক অর্জন বসু রায় জানান, তাঁরা সংশ্লিষ্ট সব দফতরের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করেন, বুধবার থেকেই কাজ শুরু হবে। চলবে ৩রা ডিসেম্বর পর্যন্ত।

অর্জনবাবুর কথায়, “কলকাতার একটি কলেজের আর্থিক সাহায্য ও সাধারণ মানুষের থেকে অর্থ নিয়ে এই কাজ হচ্ছে। হাওড়া পুরসভার তরফে ঝিলের পাড় থেকে পানা পরিষ্কারের জন্য সাফাইকর্মী ও পে লোডার দেওয়া হয়েছে। পুরকর্মীরা পাড়ে কাজ করছেন। আর ঝিলে নেমে পানা পরিষ্কার করছেন আমাদের কর্মীরা।”এ দিন সাঁতরাগাছি ঝিলে গিয়ে দেখা যায়, ঝিলের দক্ষিণ দিক থেকে পানা পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়েছে। তৈরি হচ্ছে পাখি বসার দ্বীপও।

ঝিলের পাড়ে কচুরিপানা তোলার পরে পুরকর্মীরা পে লোডারে করে সেগুলি নিয়ে যাচ্ছেন। উপস্থিত রয়েছেন কলেজের পড়ুয়া ও পক্ষীপ্রেমী সংগঠনের সদস্যেরা।এই কাজে অর্থ সাহায্য করেছে যে বেসরকারি কলেজ, তাঁদের কর্তৃপক্ষের তরফে দরজদীপ সিংহ ওয়ালিয়া বলেন, “পানা পরিষ্কার করতে রোজ ২০ হাজার টাকা খরচ হবে। প্রতিদিন কাজ করবেন ২৫-৩০ জন শ্রমিক। প্রায় ৩ লক্ষ টাকা লাগবে।” আজকের হাওড়া পুলিশ কমিশনারেটের এই অনুষ্ঠান প্রকৃতি প্রেমী, পাখি প্রেমীদেরকে আরো ভরসা জোগালো যে শুধু তাঁরাই নয় তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছে হাওড়া পুলিশ কমিশনারেটও, যাদের মূল লক্ষ্য “বীরত্ব ,অভিভাবকতত্ব, প্রতিশ্রুতির অঙ্গীকার “।

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment