রঙিন পিকে রেঙেছে শহর, পলাশের রঙও আজ ফিকে

Spread the love
  • 11
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    11
    Shares

 

রাজীব মুখার্জী, হাওড়াঃ আজ নয় সাধারণত হোলি বা দোল বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়েই হয়ে থাকে কিন্তু এই রঙিন পিচকারি সারা বছর ধরেই শহর রাঙিয়ে চলেছে। ভাবছেন এ আবার কোন দোলের কথা বলছি! না উৎসবের রাজ্যে এই রঙিন উৎসব একটু আলাদা। এর সাথে জড়িয়ে নেই কোনো তথাকথিত ঐতিহ্য। আমাদের শহরের যেকোনো প্রান্তে এর উপস্থিতি চোখে পড়ে। ব্যস্ত রাস্তা, বাড়ির দেওয়ালে, অফিস, আদালত, রেল, ট্রেন স্টেশন সর্বত্র। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন কিসের কথা বলছি। অধুনা বহুল বিখ্যাত গুটখার পিক। সদ্য পিকের হাত থেকে রেহাই মেলেনি দক্ষিণেশ্বর স্কাইওয়াকেরও, উদ্বোধনের ঠিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই নবনির্মিত দক্ষিণেশ্বর স্কাইওয়াক ‘রঙিন’ হয়ে ওঠে  পিকে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই ছবি ভাইরাল হতে সময় নেয়নি। এই গুটখার পিক তাঁর নজর কারা উপস্থিতি সেখানেও রেখেছে। তাই দেরিতে হলেও এইবারে এই যত্রতত্র থুতু, পান, গুটখার পিক ফেলা রুখতে নড়ে চড়ে বসেছে রাজ্য সরকার। তাই রাজ্যের মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে রাজ্য সরকারের তরফে। থুতু-পান-গুটখার পিক বন্ধের দাওয়াই বাতলাতে মঙ্গলবার নবান্নে জরুরি বৈঠকেও বসেন মুখ্যমন্ত্রী। এদিনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য প্রশাসনের উচ্চ পদস্থ কর্তারাও। এই বৈঠকেই কলকাতা সহ অন্যান্য জেলায় দৃশ্য দূষণ রুখতে মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গড়ে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই।

আজকের সময়ে দাঁড়ালে এটাই মনে হয় যে যত্রতত্র থুতু, পিক ফেলা যেন আমাদের “জন্মগত অধিকার”! খানিকটা যেন দেশের সংবিধান প্রদত্ত অধিকার। তাই রাস্তা থেকে স্টেশন, মেট্রো থেকে সিনেমা হল সর্বত্রই লাল পিকের “গৌরবোজ্জ্বল উপস্থিতি” লক্ষ্য করা যায়। এগুলো দেখতে দেখতে সাধারণ মানুষের গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল। একই ছবি ধরা পড়ে হাওড়া ও শিয়ালদা স্টেশনেও। প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন, যাচ্ছেন। স্টেশনের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার আর্জি সর্বত্র।

সারাবছর বিজ্ঞাপনে লাখ লাখ টাকা খরচ করে কিংবা শরীর সম্বন্ধিত ফলাফলের ছবিতেও কাজ হয়নি। বিজ্ঞাপন থেকে গেছে বিজ্ঞাপনেই। হাওড়া স্টেশন চত্বরে গুটখা, পানের পিক ফেলার বদঅভ্যাস বদলায়নি একফোঁটাও। পিক ফেলার ছবিটা আলাদা নয় কলকাতা শহরের লাইফ লাইন মেট্রোতেও। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষাধিক মানুষ যাতায়াত করেন মেট্রোয়। সেই মেট্রোও কলুষিত পান, গুটখার পিকে। ভুক্তভোগী মেট্রোর কর্মচারীরাও। স্টেশনের ভিতরে লাগানো সিসিটিভি, রেল পুলিশের নজরদারি ডাহা ফেল। মেট্রোর এসক্যালেটর কিংবা সিঁড়ির পাশেই পান বা গুটখার পিক পড়ে থাকার ছবি ধরা পড়ে ক্যামেরায়। এই “অপরিচ্ছন্ন” শহরের সেই ছবি সামনে আসার পরই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। যেখানে সেখানে থুতু, পিক ফেলা বন্ধ করতে তৎপর হয় প্রশাসন।

পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম জানান, এই বিষয়ে নবান্নে আলাদা বৈঠক করবেন মুখ্যমন্ত্রী। এরপরই এই দিন বিকালে নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে বৈঠক হয় বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশ দেন, “বাংলাকে ক্লিন অ্যান্ড গ্রিন করে গড়ে তুলতে আগামিদিনে রাজ্যজুড়ে আরও বড় ক্যাম্পেন গড়ে তুলতে হবে “।

 

রাজ্য প্রশাসনের সাথে নড়েচড়ে বসেছে দক্ষিণ পূর্ব রেলও। মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক সঞ্জয় ঘোষ জানিয়েছেন হাওড়া স্টেশন চত্বরে আর. পি. এফ. এর থেকে অভিযান চলবে। আমরা চাই পরিষ্কার পরিছন্ন হাওড়া স্টেশন। তাই রবিবার সকাল থেকে হাওড়া স্টেশনে আর.পি.এফ. থেকে নিজেরাই বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে অভিযান শুরু করেন। এদিন আরপিএফরা বেশ কয়েকজনকে হাতেনাতে ধরে এবং তাঁদেরকে স্পট ফাইনও করা হয়েছে। ১০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা অব্দি ফাইন করা হয়েছে। ফাইন না দিতে পারায় গ্রেফতার অব্দি করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, যাদের হাতেনাতে ধরা হয়েছিল তারা হাওড়া স্টেশন চত্বর নোংরা করছিল। এদের মধ্যে কেউ পান খেয়ে পানের পিক আবার কেউ গুটখা খেয়ে সেই থুতু ফেলে গোটা হাওড়া স্টেশন চত্বরকে নোংরা করছিল। এর আগে বহুবার হোর্ডিং-এর মাধ্যমে সচেতন করা হলেও নাগরিকরা সচেতন হয়নি।

আরপিএফ সূত্রে খবর, এই রকম অভিযান রোজ চলবে এখন হাওড়া স্টেশন জুড়েই। রবিবার সকাল থেকে আরপিএফের “অ্যান্টি করাপশন সেল” -এর বিশেষ টিমের অফিসাররাই প্রথমে হাওড়া স্টেশনের নিউ কমপ্লেক্স অভিযান চালায়। পরে অবশ্য নিউ কমপ্লেক্স ছাড়াও অন্যান্য জায়গায় অভিযান চালানো হয়। মূলত মানুষকে সচেতন করার জন্যই আরপিএফের এই বিশেষ অভিযান বলে জানা যাচ্ছে।

রাজ্য প্রশাসন সূত্রের খবর, “ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অব ইন্ডিয়া” (এফ.এস.এস.এ.আই.)-র “ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস রেগুলেশন ২০১১” (প্রহিবিশন অ্যান্ড রেস্ট্রিকশনস অন সেলস)-এর ধারা অনুযায়ী, তামাক বা নিকোটিন মিশ্রিত যে কোনও খাদ্যের বিক্রি নিষিদ্ধ। বর্তমান আইন অনুযায়ী, গুটখা বা পানমশলাকে খাদ্যদ্রব্য হিসেবেই ধরা হয়। তাই পানমশলার সঙ্গে চিবিয়ে খাওয়ার তামাক মেশানো হলে তা উৎপাদন, মজুত বা বিক্রি কোনওটাই করা যায় না।

প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের পর থেকেই গুটখা নিষিদ্ধ করার নির্দেশিকা প্রতি বছর জারি করে চলেছে রাজ্য সরকার। কলকাতা পুরসভার খাদ্য-সুরক্ষা ইনস্পেক্টরদের একাংশের বক্তব্য, তামাকজাত দ্রব্য বিক্রেতারা এখন চিবিয়ে খাওয়ার তামাক ও গুটখা আলাদা ভাবে বিক্রি করেন। ক্রেতারা তা কিনে নিজেদের মতো করে মিশিয়ে নেন। ফলে আইনত গুটখার বিক্রি আটকানো খাদ্য-সুরক্ষা ইনস্পেক্টরদের দায়িত্ব হলেও যে মুহূর্তে তাতে আলাদা ভাবে তামাক মিশছে, তা ‘দ্য সিগারেট অ্যান্ড আদার টোব্যাকো প্রোডাক্টস অ্যাক্ট, ২০০৩ (ক.ট.পা.)-এর অধীনে চলে যাচ্ছে।

পুরসভার এক পদস্থ খাদ্য-সুরক্ষা ইনস্পেক্টর বলেন, “গুটখার বিক্রি বন্ধ করা অবশ্যই আমাদেরই দায়িত্ব। সেই অনুযায়ী আমরা শহরের ভেন্ডরদেরকে সচেতনও করছি কিন্তু তাতে তামাক মেশানো হলে সেটা তো দেখার কথা পুলিশেরও।” পুলিশকর্তারা অবশ্য এ নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাইছেন না। এই যুক্তি অবশ্য খারিজ করে দিচ্ছেন তামাকজাত দ্রব্য-বিরোধী আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, এখানে ধোঁয়াশার কোনও কারণই নেই। আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, গুটখা বিক্রি রোধে খাদ্য-সুরক্ষা ইনস্পেক্টরদেরই দায়িত্ব নিতে হবে।

যদিও গুটখা বিক্রির কৌশলে প্রতিনিয়ত বদল এসেছে বলে স্বীকার করে নিচ্ছেন তাঁরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, গুটখা বিক্রি নিষিদ্ধ হওয়ার পরে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রেতারা প্রথমে ‘টুইন-প্যাক’ বিক্রি শুরু করেছিলেন। একটি প্যাকেটে পানমশলা, অন্য প্যাকেটে তামাক আলাদা ভাবে বিক্রি হত কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট ফের নির্দেশ দিয়ে বলে, এই “টুইন প্যাক” বিক্রি চলবে না। তখন আবার নতুন কৌশল বার করেন বিক্রেতারা। একদম আলাদাভাবে তাঁরা পানমশলা ও চিবিয়ে খাওয়ার তামাক বিক্রি শুরু করেন। ক্রেতারাও আলাদাভাবে তা কিনে মিশিয়ে নেন। এখন দোকানে গিয়ে কেউ “গুটখা চাই” বললেই বিক্রেতারা বুঝে যান, আসলে কোন দুটো জিনিস চাওয়া হচ্ছে।

‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ’ (এনআইসিপিআর)-এর সিনিয়র কনসালট্যান্ট অমিত যাদব বলেন, “এখানে সংশয় বা বিভ্রান্তির কোনও জায়গাই নেই, কারণ, দু’টি আইনের পরস্পরের স্বার্থের সংঘাতের ক্ষেত্রে বৃহত্তর জনস্বার্থের জন্য যেটা ভাল বা গুরুত্বপূর্ণ, সেটাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে সব জায়গায়। ফলে গুটখা বিক্রি বন্ধ পুরোপুরিই খাদ্য-সুরক্ষা ইনস্পেক্টরদের দায়িত্ব। আইনের প্রয়োগই এখানে সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

তবে সরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ। এই সমস্ত যুক্তি তর্ক চলুক না কেনো গুটখা আছে গুটখাতেই, মানুষও গুটখার বসেই আপাতত। তবে, মানসিকতায় বদল না আসলে শুধু সরকারি উদ্যোগ কতটা হাল ফেরাতে পারবে? সেই প্রশ্নটা উঠছেই। প্রশ্ন উঠছে এই নিয়েও যে ক্ষতিকর জেনেও সরকার কেনো লাইসেন্স দিচ্ছে এই সামগ্রী তৈরি করার। প্রশ্ন এটাও শুধু ফাইন করে কি আদৌ এই সমস্যার সমাধান সম্ভব? আপাতত এই সব উত্তর সময় বলবে।

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment