চোখের ক্যামেরাতে বন্দি দারিদ্রতা তবু অতীতের স্মৃতিতে আজও অমলিন

Spread the love
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

 

রাজীব মুখার্জী, রহড়াঃ টালিগঞ্জ পাড়াতে আজ তিনি বিস্মৃতির অতলেই চলে গিয়েছেন। অতীতের এক সময়ের নাম করা সিনেমাটোগ্রাফের বৈদ্যনাথ বসাক। যার নামের সাথে জুড়ে আছে বাঙালির চিরকালের রোমান্টিক নায়ক উত্তমকুমারের সাথে ৭২টি ছবিতে সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করার এক গৌরবজ্বল ইতিহাস।

সদ্য শেষ হওয়া কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের উদ্বোধনের দিনে উত্তমকুমারের বহু ছবির নায়িকা সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের দেখা হয় ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের প্রাক্তন তারকা রঞ্জিত মুখোপাধ্যায়। তখনই তাঁকে সাবিত্রী বলেন, “পারলে বৈদ্যনাথ বসাকের জন্য কিছু একটা করুন। উত্তমকুমারের সবচেয়ে বেশি ছবির সিনেমাটোগ্রাফার ছিলেন উনিই। আজ উনি বড় কষ্টে রয়েছেন।”

ইতিমধ্যেই নবীন পরিচালক রাজ বন্দ্যোপাধ্যায় তৈরি করেছেন তাঁর নতুন ছবি “পাড়” আর সেই ছবিতে তিনি অশীতিপর বৈদ্যনাথ বসাককে সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। রাজের কথায়, “ওই কাজটি করার সময়েই ওঁর কাজ থেকে শুনেছি, উত্তমকুমারের ৭২ টি ছবিতে সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেছেন তিনি।” তাঁর পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে, বছর দশেক আগে তিনিই ছিলেন নেপালের রাজপরিবারের আলোকচিত্রী। নেপালের অস্থির পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কথা ভেবেই কলকাতায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন বৈদ্যনাথ। রাজা মহেন্দ্র তাঁর রাজত্বকালে তাঁকে বলেছিলেন, “আপনি রয়্যাল গেস্ট হাউসে থাকুন। আমার জন্য, আপনার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে রাজপরিবারের নিরাপত্তারক্ষীরা ২৪ ঘণ্টা।”

ভারতীয় সিনেমার সোনালী দিনে রাজকাপুর ও উত্তমকুমারের বহু সিনেমার ক‍্যামেরাম‍্যানের কাজ করা বৈদ‍্যনাথ বসাক আজ অসহায় ও অন্যান্য ভিক্ষুকদের সাথেই রোজ খাওয়াদাওয়া সারেন এক পঙতিতে বসেই। এই চিত্র ধরা পড়ে রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের অন্নপূর্ণা পুজোতে প্রতিদিন দুপুরে খাওয়ানো হয় পঞ্চাশের বেশি মানুষকে। এখানে অনেকেই রোজ আসেন যারা মূলত ভিক্ষুক, ভবঘুরে ও সহায় সম্বলহীন মানুষ। তাঁদের সঙ্গে পঙ্‌ক্তিভোজনে রোজই সামিল হন এই মানুষটিও। একমুঠো অন্নের আশায়।রোজ সাথে করে নিয়ে আসেন খাওয়ার থালা, খাওয়া হয়ে গেলে নিজের থালা নিজেই ধুয়ে আবার ভরে নেন কাঁধের ঝোলায়। খাওয়ার পর কিছুক্ষন বিশ্রাম করেন আশ্রমের কোনও একটি গাছের ছায়ায়। বেলা পড়লে নিজের দুর্বল শরীর নিয়ে হেঁটে ফেরেন দুই কিলোমিটার দূরে পশ্চিম পানশিলার খালপাড়ের একচিলতে ঘরে। এটা তাঁর প্রতিদিনের রোজনামচা জানাচ্ছেন মন্দিরের লোকেরাই। দুপুরে খাওয়ার জন্য যাতায়াত মিলিয়ে রোজ হাঁটেন অন্তত ৪ কিলোমিটার পথ। যাঁদের সঙ্গে রোজ খান, তাঁরাও তাকে চেনেন না, তাঁদের কাছেও তাঁর পরিচয় ওঁদেরই মতো এক মানুষ। পড়শিদের কাছেও তাঁর বিশেষ কোনও পরিচয় নেই।এটাই বৈদ্যনাথ বসাক।

এখন তাঁর বয়স আশি ছাড়িয়েছে, তাঁর শরীরে সেই বয়সের ছাপ স্পষ্ট। উত্তমকুমারের বহু ছবির ক্যামেরাম্যান বৈদ্যনাথ এখন নিজেই ধূসর নেগেটিভ। অতীতের সেই পাঁচের দশক। “বুট পালিশ” ছবি প্রযোজনা করছেন তখন রাজ কাপুর। সেই ছবিতেই ক্যামেরাম্যান ছিলেন তরুণ বৈদ্যনাথ। পরের বছরই রাজকাপুর নিজেই পরিচালনা করবেন “শ্রী 420″। তাঁকে সেই ছবিতে ক্যামেরায় থাকার জন্য রাজ কাপুর আমন্ত্রণ জানালেও তাতে সম্মতি জানাননি বৈদ্যনাথ। তিনি চেয়েছিলেন বাংলা সিনেমাতেই কাজ করবেন তাই তিনি বম্বে ছেড়ে ততদিনে তিনি ফিরে এসেছেন কলকাতায়।

এখানে তিনি চুক্তি করেছেন অগ্রদূত পরিচালিত উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত “অগ্নিপরীক্ষা”-র জন্য। সিনেমাটোগ্রাফিতে বিভূতি লাহা এবং বিজয় ঘোষের সহকারী হিসাবে ক্যামেরার কাজ শুরু করলেন বৈদ্যনাথ বসাক। এরপরে তিনি যুক্ত হন অগ্রদূতের সঙ্গে। এখন বয়সের ভারে ঠিকমতো কানেও শুনতে পান না। ঝাপসা হয়ে গিয়েছে দৃষ্টিশক্তিও। মাঝেমধ্যেই বেইমানি করে চোখের স্মৃতিশক্তিও। তবুও খানিক ভেবে যখন মনে করতে পারেন অতীতের পুরোনো কথা, একদম শিশুর মতো হেসে ওঠেন বৈদ্যনাথ বাবু। তাঁর কথায়, “সবার উপরে, লালু ভুলু, সাগরিকা, সোনার খাঁচা, সূর্যসাক্ষী, অগ্নিপরীক্ষা, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, ছদ্মবেশী, নায়িকা সংবাদ, বাদশা, অপরাহ্নের আলোর মতো বহু ছবিতেই কাজ করেছি। ক্যামেরায় ও সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে। শুধু বাংলাই নয়, ক্যামেরায় কাজ করেছি বুট পালিশ, হরিয়ালি অউর রাস্তা, কিতনে পাস কিতনে দূর-র মতো হিন্দি ছবিতেও।”

নোনা ধরা দেওয়াল আর মলিন বিবর্ণ আসবাবপত্রে অর্থের অভাবের ছাপ স্পষ্ট। বছর পনেরো আগে তাঁর স্ত্রী সরস্বতী প্রয়াত হয়েছেন। এখন তাঁর ছেলের সঙ্গেই থাকেন। ছেলে সঞ্জয় বসাক এক ডেকরেটর্সের দোকানের সামান্য আয়ের কর্মচারী। স্ত্রী, পুত্রকে নিয়ে তাঁরও অভাবের সংসার। তার মধ্যেই একফালি জায়গা বৈদ্যনাথের রাতের মাথা গোঁজার ঠাঁই। রাতে সামান্য যেটুকু খান, তা বাড়িতেই। নিজেই বলেন, “তখন পিকচার কনট্রাক্টে কাজ হত। টাকাপয়সাও যে খুব বেশি পাওয়া যেত তা নয়। তবে, বাকিদের থেকে আমি খানিক বেশিই পেতাম। যা করেছি, যত টুকু করেছি নিজের সংসারের জন্যই করেছি।”

এতো দারিদ্র, আর্থিক অনটন, সহায় সম্বলহীন অবস্থাতেও কারও বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ নেই। চশমার আড়ালে স্থির তাকিয়ে থাকে দুটি চোখ, যেন নিজের জীবনকেই নিজের চোখ দিয়ে ক্যামেরাবন্দি করছেন। বছরের পর বছর ক্যামেরার লেন্সের পেছনে জেগে থাকা সেই দু’টি চোখ যে চোখের শৈল্পিক নৈপুণ্য মহানায়ককে আপামর বাঙালির চোখে ও মননে অসামান্যতায় তুলে ধরেছেন।

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment