আবেগের নাম মোহনবাগান, তাই খেলার নামও মোহনবাগান

Spread the love
  • 13
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    13
    Shares

 

রাজীব মুখার্জী, হৃষিকেশ পার্ক, আমহার্ট স্ট্রিট, কলকাতাঃ  ১৮ই নভেম্বর আজ ছিল রবিবার, এমনিতেই ছুটির দিন। এই রবিবারে অনেকেই সিনেমা হলে যায় বা শপিং মল, আবার কেউ বাড়িতেই ভুরিভোজ সেরে একটু দিবানিদ্রা দুপুরের দিকটা, সারা সপ্তাহের ক্লান্তিটা একটু আরাম করে কাটিয়ে নেওয়া। আসলে বাঙ্গালী মানে রবিবারের দিনে সারাদিনের সারা সপ্তাহে ওই একটি ছুটির দিনে ভাত – মাছ, ভালো-মন্দ খেয়ে সুখের দিবানিদ্রা দেওয়াটাই বাঙালির কাছে পরম ভালোলাগার। কিন্তু সেই বাঙালির আরেকটি দিক আছে। অনেকে বলেন এটা বাঙালির মজ্জাগত। রাজনীতি আর ফুটবল। প্রথমটি আজ বাদ দিয়ে স্বীকার করে নিতেই হয় ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা আর আবেগ বাঙালির রক্তে। অফিসে, ট্রামে, বাসে, চায়ের দোকানে কোথাও বাদ নেই। ফুটবলের নাম এলেই বাঙালি যেন চরম উদ্দীপনায় জেগে ওঠে নতুন করে আর গোটা ভারতবর্ষ তথা এই পশ্চিমবাংলায় ফুটবল বলতে বাঙালি দ্বিধাবিভক্ত মোহনবাগান এবং ইস্টবেঙ্গল নাম নিয়েই। কে বড়ো সেই নিয়ে আজও চলে যাচ্ছে বাঙালির লড়াই। না আজ আর এই তর্ক যুদ্ধে যাবো না, যদিও এই বিষয়টা ফুটবল নিয়েই তবুও আপাতত মোহনবাগান ও ইষ্টবেঙ্গলের চিরাচরিত লড়াইয়ে যাবো না বা তাঁর ভেতরেও ঢুকবো না। এখন যে বিষয়টা নিয়ে বলবো সেই চিত্রটা একটু ভিন্ন স্বাদের, ভিন্ন মাত্রার। এটা আসলেই ফুটবল পাগল বাঙালির নিজের ক্লাবের প্রতি যে অদম্য পাগলামো তাঁর কথা। যে অদম্য উচ্ছ্বাস আর আবেগ তার ছবি। জীবনে আমরা অনেক কিছুই ভালোবাসি। বাঙালির ভালোবাসার ক্লাবকে নিয়ে এই উন্মাদনা, এটা একমাত্র এই রাজ্যেই দেখি। এটা খুবই বিরল আর সেই অন্যান্য উন্মাদনাকে সামনে রেখে আয়োজিত হলো আমহার্ট স্ট্রিটের হৃষিকেশ পার্কে একটি ফুটবল ফেস্ট যার নাম ” ভিভাসিআস মোহনবাগান ফেস্ট ২০১৮ “।

প্রায় অনেক দিনের প্রস্তুতি চলছে এই টুর্নামেন্ট নিয়ে। এদিন সকাল থেকে ব্যাস্ততা আরো তুঙ্গে ছিল সংগঠকদের। সকালের নির্ধারিত সময়ে শুরু হয়ে গেছিল উদ্বোধনের নির্ধারিত সূচি। এই উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন কলকাতা পৌরসভার ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সাধনা বোস, সমাজসেবী রেবা মাইতি, প্রাক্তন সাংসদ-সাংবাদিক কুণাল ঘোষ প্রমুখ বিশিষ্টরা। উদ্বোধন শেষ হওয়ার পরেই এই একদিনের নকআউট পর্যায়ের প্রতিযোগিতাকে সফল করার ব্যাস্ততা শুরু ভিভাসিআস মোহনবাগানের সংগঠকদের মধ্যে। “আমাদের অদম্য ভালোবাসা এবং প্রচেষ্টায় ভর করে সফলভাবে এই ফুটবল প্রতিযোগিতাকে শেষ পর্যন্ত সফল করাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য” জানালেন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সুদীপ্ত নস্কর।

ফুটবল সেক্রেটারি সাহিদ আলি বলেন, ” মাঠের বাইরে থেকে যারা শুধু মোহনবাগানকে ভালোবেসে অক্লান্ত পরিশ্রম করে, টীমের পিছনে ছুটে বেরিয়ে দিনের পর পর দিন ভালো খেলায় উৎসাহিত করে তাদের সবার মধ্যে একটা দিনে নিজেরাই মাঠে নেবে ফুটবল খেলে সব মোহনবাগান ফ্যানস ক্লাব গুলির মধ্যে আরও বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই আমাদের এই একদিনের ফুটবল টুর্নামেন্ট। ” টুর্ণামেন্টে যে সমস্ত দল অংশগ্রহণ করেছিল তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নামের সঙ্গে জুড়ে আছে “মোহনবাগান “।

১. আর. বি. সি. মেরিনারস,
২.বালি সবুজ মেরুন ফ্যানস ক্লাব,
৩.ভ মোহনবাগান স্ট্রম,
৪.জীবনের রং সবুজ মেরুন,
৫.স্বপনের রং সবুজ মেরুন,
৬.রক্তে আমার মোহনবাগান,
৭.স্বপ্নের উড়ান মোহনবাগান,
৮.মোহনবাগান বোল্ডার্স।

এদিন সকাল থেকে এই আট টি দলের লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। মূলত আটটি দলের মধ্যে যখন চারটি দল নক আউট পর্যায়ে উঠে আসে ততক্ষণে বেলা গড়িয়েছে। শেষের চারটি দলের লড়াইয়ের পড়ে ফাইনাল পর্বে উঠে আসে দুটি দল স্বপনের রং সবুজ মেরুন ও বালি সবুজ মেরুন ফ্যানস ক্লাব। যখন মাঠে প্রবেশ করি তখন ফাইনাল ম্যাচের প্রস্তুতি চলছে। তখন ঘড়ির কাটায় বাজে ঠিক সাড়ে ৩ টে। ফাইনালের দুই দল নিজেদের মধ্যে ওয়ার্ম আপ করছে।

এরপর ঠিক তার মিনিট দশেকের মধ্যেই শুরু হল এই টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ। নির্ধারিত জায়গাতে দুই দলকে দাঁড় করিয়ে বাঁশি বাজিয়ে খেলার সূচনা করলেন রেফারি। এক ভারি অদ্ভুত ম্যাচ চলছিল, যে দুটি দল খেলছে তাদের অন্তরে মোহনবাগান অথচ কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছেড়ে দিতে রাজি নয়। মাঠে চলছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। ক্লাবের সম্মানের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে না! খেলাটাও সেই ভাবেই হচ্ছিল উভয়পক্ষের খেলোয়াড়রাই অনেক গোলের সুযোগ পেয়েছিল কিন্তু গোল কিছুতেই হচ্ছে না। অপরদিকে দর্শকদের মধ্যে তীব্র উন্মাদনা আর উচ্ছাস দলের সমর্থকদের মধ্যে। ফুটবল টুর্নামেন্ট হচ্ছে, তাই এই রবিবারের বিকেলে মাঠে ফুটবল খেলা দেখতে এসেছিলেন এলাকার বেশ কিছু মানুষ। খেলা চলছে, সুযোগ পেয়েও পার হতে পারছে না গোলকিপারের দুর্ভেদ্য প্রাচীর কোনো দলই। তীব্র আক্রমণ ও প্রতি আক্রমণের মধ্যে যত সময় এগোচ্ছিল তত খেলার ঝাঁঝ বাড়ছিল, বাড়ছিল একটা গোল পাওয়ার বাসনা। এই ভাবেই আক্রমণ প্রতি আক্রমণে চলতে চলতেই হঠাৎ করে একটি সেম সাইড গোল খায় বালির ক্লাবটি এবং এগিয়ে যায় প্রতিপক্ষ। বিপক্ষ দলও হাল ছাড়েনি, আক্রমণের ঝাঁজ আরো তীব্র করলো। যেকোনো ভাবেই সমতা ফেরাতে হবে খেলায়।
এভাবেই শেষ হলো প্রথমার্ধ। স্থান পরিবর্তন হয় ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী।


দ্বিতীয়ার্ধ শুরু রেফারির বাঁশিতে। আবার শুরু হয় আক্রমণ প্রক্রিয়া। একটি দল এক গোলে আছে তার লক্ষ্য আরো বেশ কয়েকটি গোল করে এগিয়ে দেওয়া নিজের দলকে। যারা পিছিয়ে আছে তাদের লক্ষ্য খেলায় সমতা ফেরানো। এই উভয় লক্ষ্যের লড়াই যত তীব্র হচ্ছিলো ততই সময় এগিয়ে যাচ্ছে। আর ততো তীব্র হচ্ছিল আক্রমণ ও প্রতি আক্রমণের বহর। তবে খেলার মাঝখানে খেলতে খেলতে উভয় দলের সদস্যরাই মেজাজ হারিয়ে একবার বচসায় জড়িয়ে পড়ে। সাথে সাথে সেখানে হস্তক্ষেপ করেন রেফারি। উভয় দলের একজন করে খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখে। তবু কেউ তো কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছেড়ে দেবে না। আজ ক্লাবের সম্মানের প্রশ্ন।

এভাবেই ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে খেলা শেষের দিকে হঠাৎ একটি গোল। খেলায় আসে সাম্যতা। এখন ফলাফল ১-১। অল্প কিছুক্ষণ বাদেই রেফারি বাঁশি বাজিয়ে ঘোষণা করেন দ্বিতীয়ার্ধ শেষ। এবার এক্সট্রা টাইম। আবার শুরু হয় জয়ের লক্ষ্যে লড়াই। ইতিমধ্যে বেশ কিছু সুযোগ তারা পেয়েছিল উভয় দলই কিন্তু সদ্ব্যাবহার হলো না। এরপর অতিরিক্ত সময়ও শেষ হলো নির্ধারিত সময় বাদেই। ফলাফল তখনো ১-১। উভয় পক্ষই ভালো খেলছে, কেউ কম যাচ্ছে না কিন্তু এটা তো ফাইনাল। তাই এখানে তো নিষ্পত্তি হতেই হবে কাউকে জিততে হবে আর কাউকে হারতেই হবে। এবার রেফারি ঘোষণা করলেন হার-জিত নির্ধারিত হবে পেনাল্টি শুট আউট দিয়েই। শুরু হলো পেনাল্টি শুট আউট। প্রতিটা দলের একজন সদস্য আসছেন, গোল করছেন আর সমর্থকদের চিৎকারে মাঠ ভরে উঠছে। টানটান উত্তেজনা দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যেই। একটা গোল হলেই আত্মবিশ্বাসী হচ্ছে উভয় পক্ষই। এরই মাঝে শেষ হলো পেনাল্টি শুট আউট। দেখা গেলো এখনও অমীমাংসিত ফলাফল। কি আর করা যায়! রেফারি জানালেন খেলার ফলাফল নির্ধারিত হবে টসের মাধ্যমে। মাঠে তখন পিন ড্রপ সাইলেন্স। দুই দলের খেলোয়াড়, সমর্থকদের মুখে চিন্তা আর উদ্বেগের ছাপ।

এদিন সকাল থেকে নিজেদের দক্ষতায় মূল পর্বে উঠে, তারপর সব কিছু ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়াটা খুব অপ্রীতিকর ও অস্বস্তিকর কিন্তু উপায় নেই।অবশেষে রেফারি ডেকে নিলেন দুই দলের অধিনায়ককে। জেনে নিলেন কে হেড আর কে টেল নির্বাচন করছে। রেফারি কয়েনটিকে দেখিয়ে শূন্যে ছুঁড়ে দিলেন। সেই কয়েন উপরের দিকে উঠে ঘুরতে ঘুরতে মাটিতে পরল। মাঠে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি তখন ওই কয়েনের দিকেই। হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন জীবনের রং সবুজ মেরুনের ক্যাপ্টেন। “আমরা জিতেছি ! আমরা জিতেছি “তার গলার আওয়াজ শুনে বাকিরাও উল্লাস করে উঠলো। কয়েন শূন্যে ছোড়ার সময় সকলের চোখেই একটাই ভাষা ছিল যে কি হবে! এখন মাঠ জুড়ে উচ্ছাস পরস্পরকে আলিঙ্গন করে। এই মুহূর্তটা বড়ই মধুর। তা আর ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এদিনের মত লড়াই শেষ হলো। হারলো বালির ক্লাব।

এরপরে শুরু হল প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন। যারা আজকের অতিথি ছিলেন তাদেরকে ডেকে নেওয়া হলো মঞ্চে। ব্যাচ ও উত্তরীয় পরিয়ে তাদের সম্মান জানানো হলো। এরপরে এতক্ষণ ধরে যারা খেললো তাদেরকে ডেকে নেওয়া হলো এক এক করে। দুই দলের খেলোয়াড়দের মেডেল পরিয়ে সন্মান জানানো হলো। এরপর মঞ্চে ডেকে নেওয়া হলো যিনি সর্বোচ্চ গোল দিয়েছেন তাকে, ঘোষণা করা হল সর্বোচ্চ গোলদাতার নাম। তারপর ঘোষণা করা হলো ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ যিনি হয়েছেন তাকে। ডেকে নেওয়া হলো বিজিত দলের অধিনায়ককে, তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হলো কমলাবালা দে স্মৃতি ট্রফি। ট্রফিটি প্রদান করলেন প্রয়াত কমলাবালা দেবীর পৌত্র সন্দীপ দে। তারপর এল সেই অভিপ্রেত মুহূর্ত, যার জন্য অপেক্ষা করছিলেন সবাই। ডেকে নেওয়া হলো বিজয়ী দলের অধিনায়ককে। শান্তিনাথ চ্যাটার্জি স্মৃতি ট্রফি প্রদান করা হলো বিজয়ী দলের হাতে, ট্রফিটি দিলেন প্রয়াত শান্তিনাথ চ্যাটার্জির পৌত্র বিপ্লব পোড়েল। সাথে মঞ্চে উঠে এলেন বিজয়ী দলের বাকি সদস্যরাও। স্লোগান উঠলো তাদের ক্লাবের নামে। এভাবেই সমাপ্ত হলো আজকের এই ফুটবল টুর্নামেন্ট।

এদিনের এই ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছিলেন গুটিকয়েক তরুণ, অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এবং অত্যন্ত সুচারুভাবে। ২ ঘন্টা সেখানে কাটিয়ে
উপলব্ধি করলাম আত্মস্থ করলাম বেশ কিছু সংখ্যক অজানা, অচেনা মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তা। মঞ্চে উপবিষ্ট একজন আমন্ত্রিত অতিথি বললেন, “খেলার মাঠে শত্রুতা হয়তো করলাম, কেউ কাউকে বিনা লড়াইয়ে জমি ছেড়ে দিইনি কিন্তু এই টুর্নামেন্ট প্রমাণ করলো আমরা মোহনবাগান, আমরাই পারি সকলকে খুব সহজে আপন করে নিতে”। এদিন বেলা শেষে মাইকে চলল মোহনবাগানের নামে অনেক জয়োধ্বনি ” জয় মোহনবাগান”, “থ্রী চিয়ার্স ফর মোহনবাগান “। মাইকে একজন চেঁচিয়ে বললো আমরা কারা? বলার সাথে সাথে কোরাস কণ্ঠে ভেসে উঠলো “মোহনবাগান “। সেই মুহূর্তে নিজের অজান্তেই নিজের মনটাও বলে উঠলো “আমিও”।

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment