জগতের ধাত্রী শক্তিই পরিচিত জগদ্ধাত্রী রূপে

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

রাজীব মুখার্জী, হাওড়াঃ জগদ্ধাত্রী দুর্গা হিন্দু মতে শক্তির দেবী। ইনি দেবী দুর্গারই অপর রূপ। ভারতীয় উপনিষদে এর নাম উমা হৈমবতী। বিভিন্ন তন্ত্র ও পুরাণ গ্রন্থেও এর উল্লেখ রয়েছে। যদিও জগদ্ধাত্রী আরাধনা বিশেষত বঙ্গদেশেই প্রচলিত প্রায় ছয়শো বছর ধরে। এই পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার চন্দননগর ও নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী উৎসব বিশ্ববন্দিত। প্রতি বছরের কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে দেবী জগদ্ধাত্রীর বাৎসরিক পূজা অনুষ্ঠিত হয় এই বঙ্গে। হিন্দু বাঙালির ধর্মীয় মানসে রাজসিক দেবী দুর্গা ও তামসিক কালীর পরেই স্থান সত্ত্বগুণের দেবী জগদ্ধাত্রীর আরাধনা চলে। হাওড়া জেলার গ্রাম আন্দুলের চৌধুরী পাড়ার সর্বজনীনের জগদ্ধাত্রী পূজো হাওড়া জেলার মাসিলা গ্রামের জগদ্ধাত্রী পুজো। জগদ্ধাত্রী দেবী মূলত ত্রিনয়না, চতুর্ভূজা ও সিংহবাহিনী। তাঁর হাতে শঙ্খ, চক্র, ধনুক ও বাণ। গলায় নাগযজ্ঞোপবীত। বাহন সিংহ, তাঁর নিচেই করীন্দ্রাসুর অর্থাৎ হস্তীরূপী অসুরের পৃষ্ঠে দণ্ডায়মান। দেবীর গাত্রবর্ণ উদিয়মান সূর্যের ন্যায় রক্তিম।

নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজত্বকাল থেকেই বঙ্গদেশে জগদ্ধাত্রী পূজোর জনপ্রিয়তা পায়। বরিশালে প্রাপ্ত খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকের জগদ্ধাত্রী মূর্তি, খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকে শূলপাণি রচিত গ্রন্থে জগদ্ধাত্রী পূজোর উল্লেখ ও কৃষ্ণচন্দ্রের রাজত্বকালের পূর্বে নদিয়ার বিভিন্ন মন্দির-ভাস্কর্যে দেবী জগদ্ধাত্রীর উপস্থিতি থেকে প্রমাণিত হয়, বঙ্গদেশে জগদ্ধাত্রী আরাধনা কোনও অর্বাচীন প্রথা নয়। জগদ্ধাত্রী পূজোর নিয়মটি একটু স্বতন্ত্র। দুইটি প্রথায় এই পূজো হয়ে থাকে। কেউ কেউ সপ্তমী থেকে নবমী অবধি দুর্গাপূজোর ধাঁচে জগদ্ধাত্রী পূজো করে থাকেন। আবার কেউ কেউ নবমীর দিনই তিন বার পূজোর আয়োজন করে সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী পূজো সম্পন্ন করেন। এই পূজোর অনেক প্রথাই দুর্গাপূজোর অনুরূপ। তাই অনেকেই একে আসল দুর্গা পুজো বলেন।

পুরান মতে দেবাসুর সংগ্রামে দেবগণ অসুরদের পরাস্ত করলেন কিন্তু তাঁরা বিস্মৃত হলেন যে নিজ শক্তিতে নয়, বরং ব্রহ্মের বলে বলীয়ান হয়েই তাঁদের এই বিজয়। ফলত তাঁরা হয়ে উঠলেন অহংকার ও মত্ত। তখন ব্রহ্ম যক্ষের বেশ ধারণ করে তাঁদের সম্মুখে উপস্থিত হলেন। তিনি একটি তৃণখণ্ড দেবতাদের সম্মুখে পরীক্ষার নিমিত্ত রাখলেন। অগ্নি ও বায়ু তাঁদের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেও সেই তৃণখণ্ডটিকে দগ্ধ বা বিধৌত করতে পারলেন না। তখন দেবগণ ইন্দ্রকে যক্ষের পরিচয় জানবার নিমিত্ত প্রেরণ করলেন। ইন্দ্র অহংকার-প্রমত্ত হয়ে যক্ষের কাছে আসেননি, এসেছিলেন জিজ্ঞাসু হয়ে। তাই ব্রহ্মরূপী যক্ষ তাঁর সম্মুখ হতে তিরোহিত হলেন বরং তাঁর সম্মুখের আকাশে দিব্য স্ত্রীমূর্তিতে আবির্ভূত হলেন হৈমবতী উমা। উমা ব্রহ্মের স্বরূপ ব্যাখ্যা করে ইন্দ্রের জ্ঞানপিপাসা নিবৃত্ত করলেন। উপনিষদে উমার রূপবর্ণনা নেই কেবলমাত্র তাঁকে হৈমবতী অর্থাৎ স্বর্ণালঙ্কারভূষিতা বলা হয়েছে। তবে এই হৈমবতী উমাই যে দেবী জগদ্ধাত্রী সে প্রত্যয় জন্মে কাত্যায়ণী তন্ত্রের ৭৬ নম্বর অধ্যায়ে উল্লিখিত একটি কাহিনি থেকে।

এই কাহিনি অনুসারে : একদা ইন্দ্র, অগ্নি, বায়ু ও চন্দ্র– এই চার দেবতা অহংকার-প্রমত্ত হয়ে নিজেদের ঈশ্বর মনে করতে শুরু করলেন। তাঁরা বিস্মৃত হলেন যে দেবতা হলেও তাঁদের স্বতন্ত্র কোনও শক্তি নেই –মহাশক্তির শক্তিতেই তাঁরা বলীয়ান। দেবগণের এই ভ্রান্তি অপনয়নের জন্য দেবী জগদ্ধাত্রী কোটি সূর্যের তেজ ও কোটি চন্দ্রের প্রভাযুক্ত এক দিব্য মূর্তিতে তাঁদের সম্মুখে উপস্থিত হলেন। এর পরের কাহিনি কেন উপনিষদে বর্ণিত তৃণখণ্ডের কাহিনির অনুরূপ। দেবী প্রত্যেকের সম্মুখে একটি করে তৃণখণ্ড রাখলেন কিন্তু চার দেবতার কেউই তাকে স্থানচ্যুত বা ভষ্মীভূত করতে অসমর্থ হলেন। দেবগণ নিজেদের ভুল উপলব্ধি করলেন। তখন দেবী তাঁর তেজোরাশি স্তিমিত করে এই অনিন্দ্য মূর্তি ধারণ করলেন। এই মূর্তি ত্রিনয়না, চতুর্ভূজা, রক্তাম্বরা, সালংকারা, নাগযজ্ঞোপবীতধারিনী ও দেব-ঋষিগণ কর্তৃক অভিবন্দিতা এক মঙ্গলময়ী মহাদেবীর মূর্তি। সমগ্র জগৎকে পরিব্যাপ্ত করে দেবী দেবগণকে এই মূর্তি দেখালেন, দেবগণও তাঁর স্তবে প্রবুদ্ধ হলেন।

জগদ্ধাত্রীর ধ্যানমন্ত্রে দেবীর যে রূপকল্পনা করা হয়েছে তা নিম্নরূপ:

সিংহস্কন্ধসমারূঢ়াং নানালঙ্কারভূষিতাম্
চতুর্ভূজাং মহাদেবীং নাগযজ্ঞোপবীতিনীম্
শঙ্খশার্ঙ্গসমাযুক্তবামপাণিদ্বয়ান্বিতাম্
চক্রঞ্চ পঞ্চবাণাংশ্চ দধতীং দক্ষিণে করে
রক্তবস্ত্রাপরিধানাং বালার্কসদৃশীতনুম্
নারদাদ্যৈর্মুনিগণৈঃ সেবিতাং ভবসুন্দরীম্
ত্রিবলীবলয়োপেতনাভিনালমৃণালিনীম্
রত্নদ্বীপে মহাদ্বীপে সিংহাসনসমন্বিতে
প্রফুল্লকমলারূঢ়াং ধ্যায়েত্তাং ভবগেহিনীম্

জগদ্ধাত্রী দেবীর মূর্তিতত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্বামী নির্মলানন্দ বলেছেন, “অর্ক বা সূর্যই বিশ্বের পোষণকর্তা। পৃথিব্যাদি আবর্তনশীল গ্রহ-উপগ্রহদিগকে সূর্যই নিজের দিকে আকর্ষণ করে রেখেছেন। দেবী জগদ্ধাত্রীর মধ্যেও ধারণী ও পোষণী শক্তির পরিচয় বিদ্যমান। তাই তাঁকে বলা হয়েছে বালার্কসদৃশীতনু। একই কারণে জগৎপালক বিষ্ণুর শঙ্খ-চক্র-শার্ঙ্গধনু-আদি আয়ুধ দেবীর শ্রীকরে। দেবীর রক্তবস্ত্র ও রক্তবর্ণের মধ্যে, দেবীর সিংহাসনস্থ রক্তকমলে সেই রজোগুণেরই ছড়াছড়ি। রজোদীপ্ত বলেই জগদ্ধাত্রী মহাশক্তিময়ী। তাঁর অস্ত্রশস্ত্র, তাঁর বাহন –সকলই তাঁর শক্তিমত্তার ভাবটি আমাদের অন্তরে উদ্দীপ্ত করে দেয়। তবে দেবীর এই বীর্য সংহারের নয়, পরন্তু সমগ্র বিশ্বকে মহাসর্বনাশ থেকে রক্ষাপূর্বক তাকে আত্মসত্তায় –ঋতে ও সত্যে সুস্থির করে রাখবার জন্য। নাগ বা সর্প যোগের পরিচায়ক। উপবীত ব্রাহ্মণ্যশক্তির প্রতীক।

দেবী জগদ্ধাত্রী ব্রহ্মময়ী, তিনি পরমা যোগিনী। মহাযোগবলেই ব্রহ্মময়ী ধরে আছেন এই নিখিল বিশ্বসংসারকে। এই জগদ্ধারণই জগদ্ধাত্রীর পরম তপস্যা – তাঁর নিত্য লীলা, তাঁর নিত্য খেলা। জননীরূপে তিনিই বিশ্বপ্রসূতি, আবার ধাত্রীরূপে তিনিই বিশ্বধাত্রী। আমাদের খুব প্রিয় মহিষাসুর মর্দিনী আকাশবাণীতে প্রচারিত হওয়ার সুরুতে ……” সিনহস্থা শশিশেখরা… চতুর ভুজাই..” এই স্তব মন্ত্র শুনলে দেখা যাবে যে এটিও দুর্গার জগদ্ধাত্রী রুপেরই বর্ণনা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, জগদ্ধাত্রী দেবী করীন্দ্রাসুর অর্থাৎ মহাহস্তীরূপী অসুরকে বধ করেছিলেন। এই কারণে দেবী জগদ্ধাত্রী করীন্দ্রাসুরনিসূদিনী নামে পরিচিত।

রামকৃষ্ণ পরমহংসের ভাষায়, “মন করীকে যে বশ করতে পারে তারই হৃদয়ে জগদ্ধাত্রী উদয় হন। সিংহবাহিনীর সিংহ তাই হাতীকে জব্দ করে রেখেছে”। স্বামী নির্মলানন্দের মতে, “যে-কোনো সাধনায় মনকে সংযত করে বশে আনা সাধনার অপরিহার্য অঙ্গ। আমাদের মন মত্ত করী, মন-করীকে বশ করতে পারলে সাধনায় সিদ্ধিলাভ অবশ্যম্ভাবী। মত্ত মন-করীকে বশ করে সাধক-হৃদয়ে জগদ্ধাত্রীর প্রতিষ্ঠায়ই জগদ্ধাত্রী-সাধনার সার্থকতা, পূজার পরিসমাপ্তি”। করীন্দ্রাসুর এর বর্ণনা ওই নামে না থাকলেও চণ্ডীতে উল্লেখ আছে মহিষাসুর এক মহাহস্তি রুপে দেবীকে আক্রমণ করে এবং দেবী তার মুণ্ডচ্ছেদ করেন। তখন সে এক পুরুষ রুপে অবতীর্ণ হয়ে দেবীকে যুদ্ধে আহবান করলে ……… মা তাকে তিরে বিদ্ধ করেন। সেই তির ধনুক দেবির এই মূর্তিতে বর্তমান।

দেবী জগদ্ধাত্রীর পূজো অনুষ্ঠিত হয় দুর্গাপূজোর ঠিক একমাস পর কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে। কাত্যায়নীতন্ত্র–এ কার্তিকী শুক্লা নবমীতে দেবী জগদ্ধাত্রীর আবির্ভূত হওয়ার কথা আছে।

দুর্গাকল্পে আছে: 

কার্তিকে শুক্লপক্ষেঽহনি ভৌমবারে জগৎপ্রসূঃ
সর্বদেবহিতার্থায় দুর্বৃত্তশমনায় চ
আবিরাসীৎ জগচ্ছান্ত্যৈ যুগাদৌ পরমেশ্বরী

কালবিবেক গ্রন্থে পূজার বিধান প্রসঙ্গে শূলপাণি লিখছেন: 

কার্তিকোঽমলপক্ষস্য ত্রেতাদৌ নবমেঽহনি
পূজয়েত্তাং জগদ্ধাত্রীং সিংহপৃষ্ঠে নিষেদূষীম্

জগদ্ধাত্রী পূজো একটি তান্ত্রিক মতের পূজো। তাই সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী – এই তিন দিন জগদ্ধাত্রীর পূজো হয়ে থাকে। তবে অনেকে নবমীর দিন তিন বার পূজো করে সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী পূজো সম্পন্ন করেন। কোথাও কোথাও প্রথম বা দ্বিতীয় পূজোর পর কুমারী পুজোরও আয়োজন করা হয়। দুর্গাপূজোর ন্যায় জগদ্ধাত্রী পূজোতেও বিসর্জনকৃত্য বিজয়াকৃত্য নামে পরিচিত। এমনকি পুষ্পাঞ্জলি ও প্রণাম মন্ত্রসহ পূজোর অনেক মন্ত্রও দুর্গাপূজোর অনুরূপ করা হয়। এই সময়ে কমলা রঙের জগদ্ধাত্রী প্রতিমা বর্তমানে এই বঙ্গে দুর্লভ।

আবার কালীপ্রসন্ন সিংহ তাঁর হুতোম প্যাঁচার নকশায় লিখছেন, সেই সময়ের বাবু কলকাতা দুর্গার মতো জগদ্ধাত্রী মূর্তিতেও স্থান দিয়েছে লক্ষ্মী-সরস্বতীকে-“বারোইয়ারি প্রতিমাখানি প্রায় বিশ হাত উঁচু– ঘোড়ায় চড়া হাইল্যান্ডের গোরা, বিবি, পরী ও নানাবিধ চিড়িয়া, শোলার ফল ও পদ্ম দিয়ে সাজানো; মধ্যে মা ভগবতী জগদ্ধাত্রী-মূর্তি– সিঙ্গির গায়ে রূপুলি গিলটি ও হাতী সবুজ মখমল দিয়ে মোড়া। ঠাকরুণের বিবিয়ানা মুখ, রং ও গড়ন আদল ইহুদী ও আরমানী কেতা, ব্রহ্মা বিষ্ণু, মহেশ্বর ও ইন্দ্র দাঁড়িয়ে জোড়হাত করে স্তব কচ্চেন”।

সেই যে শুরু হল দুর্গার বিকল্প রূপে জগদ্ধাত্রীর আরাধনা, কালে কালে তা-ই জনপ্রিয় হয়ে উঠলো এই বঙ্গে। যার স্রষ্টা নিঃসন্দেহেই নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। কেন না, দুর্গাপূজো করতে অসমর্থ হয়ে বিকল্পে জগদ্ধাত্রী আরাধনা বঙ্গে প্রথম প্রচলন করছেন তিনিই। কাহিনি বলছে, তখন বঙ্গের তখতে আসীন নবাব আলিবর্দি খাঁ। তাঁর রাজত্বকালে রাজার কাছ থেকে বারো লক্ষ টাকা নজরানা দাবি করা হয়। কৃষ্ণচন্দ্র তা দিতে অস্বীকার করলে তাঁকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় মুর্শিদাবাদে। ছাড়া পেয়ে রাজা যখন নদীপথে কৃষ্ণনগরে ফিরছেন, শুনতে পেলেন বিসর্জনের বাজনা। ভারাক্রান্ত হল তাঁর মন- এ বছর আর দুর্গাপুজো করা হয়ে উঠল না। জনশ্রুতি, সেই রাতেই রাজাকে স্বপ্নে দর্শন দেন জগদ্ধাত্রী। তাঁর পূজোর নির্দেশ দেন যা দুর্গাপূজোরই সমতুল্য। সেই ১৭৬৬ সাল থেকে কৃষ্ণনগরে দুর্গাপুজোর বিকল্পর হিসেবে প্রচলিত হল জগদ্ধাত্রীর পূজো। চন্দননগরেও সেই দৃষ্টান্ত অনুসরণ। কৃষ্ণচন্দ্রের পূজোয় অনুপ্রাণিত হয়ে ফরাসিদের দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরি শুরু করলেন তৎকালীন ফরাসডাঙা বা অধুনা চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পূজো। যা পরে বিকল্প এক উৎসবের আকার নিয়েছে।

আবার, এক দেবীর পূজোয় অসমর্থ হয়ে জগদ্ধাত্রী আরাধনার প্রচলন দেখা যায় সারদামণির বংশেও। শোনা যায়, সারদামণির মা শ্যামাসুন্দরী দেবী প্রতি বছর প্রতিবেশি নব মুখুজ্যের বাড়ির কালীপুজোয় চাল পাঠাতেন। একবার ঝগড়ার জন্য মুখুজ্যেরা সেই চাল নিতে অস্বীকার করেন। শ্যামাসুন্দরীকে সেই রাতেই স্বপ্নে দর্শন দেন জগদ্ধাত্রী। ওই চালে তাঁর পূজোর নির্দেশ দেন। সেই থেকে জয়রামবাটীতে সারদামণির বংশে জগদ্ধাত্রী পূজো বিখ্যাত।

তবে এই বিকল্প পূজোর সূত্রে আরও কিছু সময় পিছিয়ে গিয়ে একবার জগদ্ধাত্রী আরাধনার দিকে দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে। সেই ইতিহাসও বলছে, জগদ্ধাত্রী পূজো প্রথমে কট্টর ভাবেই প্রচলিত ছিল ব্রাহ্মণদের মধ্যে। এই দেবী সত্ত্বগুণের প্রতীক যা ব্রাহ্মণদের একটি বৈশিষ্ট্য বলে গণ্য করা হয়। দেবীর গলায় থাকে নাগযজ্ঞোপবীত যা স্পষ্টভাবেই ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের পরিচায়ক। আবার, মন্ত্রে এই দেবীকে সাক্ষাৎ ব্রাহ্মণ বলেও অভিহিত করা হয়েছে। এখান থেকেই তৈরি হয়েছে বিকল্প এবং শ্রেণিবিভাগ। সত্ত্বগুণধারিণী জগদ্ধাত্রীর পূজো করবেন ব্রাহ্ণরা, রজোগুণধারিণী দুর্গার পূজো ক্ষত্রিয়রা এবং তমোগুণধারিণী কালীর পূজো অন্যরা। পরে ব্রাহ্মণদের এই জগদ্ধাত্রী আরাধনার সূত্রটি গ্রহণ করলেন বণিকশ্রেণি। দুর্গাপূজোয় তাঁদের অধিকার নেই, কালীপূজো তন্ত্রসম্মত বলে সবার সামর্থ্য নয়, অতএব রইলেন কেবল এই জগদ্ধাত্রী দুর্গাই। সেই ইতিহাস বহন করেই এখনও দুর্গাপূজোর উৎসবের বিকল্প হিসেবেই জগদ্ধাত্রীর পূজোর উৎসব দেখছি আমরা। সেই জন্যই এই পুজো সর্বজনীন হল না। রয়ে গেল কিছু কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলের উৎসব হয়েই।

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment