কোন্দলের চাপে শিকেয় রক্ষনাবেক্ষন, পরিবেশ চুলোয় যাক কিন্তু দায় অন্যের ঘরেই দেবো

Spread the love
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

 

রাজীব মুখার্জী, হাওড়াঃ  এই রাজ্যে শীতকালে পরিযায়ী পাখির আগমনস্থল হিসাবে দুনিয়া জোড়া খ্যাতি সাঁতরাগাছি ঝিলের। অনেক ছোট শিশু তাদের বাবা কিংবা মায়ের হাত ধরে দেখতে আসে এই পাখিদের। বহুবছর ধরেই এই চিত্র দেখে আসছেন এলাকার বাসিন্দা থেকে ব্রিজের উপর দিয়ে যাওয়া বাসের কন্ডাকটর অব্দি। তবে এবছর স্থানীয় বাসিন্দা সোমা মন্ডলের গলাতেও শোনা গেলো সেই আক্ষেপেরই সুর। তিনি বললেন, “আমার বিয়ে হওয়ার পর থেকে দেখে আসছি, প্রতি বছর এই সময়টায় অনেক পাখির আগমন হতো। এই বছরে এখনও অব্দি একটাও চোখে পড়লো না। “

দ্বিতীয় ব্রিজ পেরিয়ে টোল পার করে সাঁতরাগাছি ব্রিজের উপর উঠলেই ডান আর বাম দিকে তাকালেই চোখে পরে এই সাঁতরাগাছি ঝিল। ৩২ একর জমির উপরে বিস্তৃত এই সাঁতরাগাছি ঝিল। এই বছরে চোখে পড়ছে অর্ধেক ঝিল ভোরে উঠেছে কচুরিপানা, পড়ে আছে সদ্য বিসর্জনের কাঠামো। এই ঝিলের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার, সেই প্রশ্নেই কার্যত কোন্দল শুরু হয়ে গিয়েছে দুই পক্ষের মধ্যে। যার জেরে অযত্ন আর অবহেলায় ৩২ একরের ঝিলটি হয়ে দাঁড়িয়েছে স্রেফ রেল ও এলাকার বাসিন্দাদের আবর্জনা ফেলার জায়গা। গোটা ঝিল ভরে গেছে প্রায় আড়াই ফুট উচ্চতার কচুরিপানায়।

গত বছর হাওড়া পুরসভা তা পরিষ্কার করলেও এই বছর কোনও উদ্যোগ নেই এখনও অব্দি। আবর্জনা আর কচুরিপানায় ভরা ওই ঝিলে এ বছর পরিযায়ী পাখিরা আগের মতো আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে পাখির প্রেমীদের মধ্যেই, প্রতি বছরই এই সময়টাতেই দেখা যায়, হাজার হাজার মাইল পাড়ি দেওয়া ওই পাখিরা কালীপুজোর ঠিক পর থেকেই ঝিলে আসতে শুরু করে। সেই সংখ্যাটা কিন্তু এ বছর অনেক কম। সাঁতরাগাছি ঝিল মূলত দক্ষিণ-পূর্ব রেলের সীমানাতেই পড়ে। এই সাঁতরাগাছি ঝিল ও তার আশপাশের এলাকা হাওড়া পুরসভার ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওই ঝিলে পুর এলাকার সমস্ত বর্জ্য যেমন পড়ে, তেমনই সাঁতরাগাছি রেল ইয়ার্ডের একটা অংশের বর্জ্যও নর্দমা দিয়ে ঝিলের জলে পড়ে। এখানেই জেলা বন দফতরের দায়িত্বে তৈরি হয়েছিল একটি পাখিরালয়, এই ঝিলটিকে ঘিরে কিন্তু বছর তিনেক আগে জাতীয় পরিবেশ আদালত নির্দেশ দিয়েছিল, যেহেতু ওই ঝিলে পুরসভার বর্জ্য বেশি পড়ে, তাই প্রতি বছর কচুরিপানা পরিষ্কার এবং পাখিদের বসার জন্য ছোট ছোট পানার দ্বীপ তৈরি করার দায়িত্ব থাকবে হাওড়া পুরসভারই। সেই নির্দেশের পরেই বন দফতর ঝিল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেওয়া বন্ধ করে দেয়।


এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের স্পষ্ট অভিযোগ, পরিযায়ী পাখিদের পছন্দের জায়গা বা আদর্শ বাসস্থান সাঁতরাগাছির ঝিলটি দীর্ঘদিন ধরেই রেলের দূষিত বর্জ্য ও পুরসভার নর্দমার বর্জ্যে ভরে গিয়েছে। জাতীয় পরিবেশ আদালতের নির্দেশের পরেও পরিস্থিতির কোনো বদল হয়নি। ঝিলটির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে যখনই প্রশ্ন ওঠে, তখনই নিজেদের দূষণের ভাগীদার এই দুই সংস্থা একে অপরের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে দিয়ে চুপ চাপ বসে থাকে। যার ফলে পরিযায়ী পাখিদের অন্যতম বড় আস্তানাটির রক্ষণাবেক্ষণ কে করবে, প্রতি বছর তা নিয়েই নানা দফতরের মধ্যে চাপান-উতোর চলতে থাকে। আর অযত্নে, অবহেলায় পড়ে থাকে রাজ্যের এই দর্শনীয় পাখিরালয়টি।

ঝিলটির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে ইতিমধ্যেই পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্তের করা মামলার প্রেক্ষিতে জাতীয় পরিবেশ আদালত রায় দিয়ে জানিয়েছে, ওই জলাশয়ের দক্ষিণ দিকে পুরসভা ও রেলের খরচে একটি “সুয়্যারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট” তৈরি করতে হবে। দু’টি সংস্থার সমস্ত বর্জ্য ওই প্লান্টে শোধন হওয়ার পরে তবেই ঝিলে ফেলা যাবে। জাতীয় পরিবেশ আদালতের সেই নির্দেশ এখনও পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। তাই দূষণও যে অব্যাহত, ওই ঝিলের চারপাশ ঘুরলেই তা দেখা যাবে। যত্রতত্র আবর্জনার পাহাড়। ঝিলের পাড়ে গড়ে উঠেছে বেআইনি হোটেল, মন্দির। এলাকার সমস্ত বর্জ্য অবাধে ফেলা হচ্ছে ঝিলের জলে। বিশাল ঝিলটির ১০ শতাংশ বাদে সবটাই ঢেকে রয়েছে কচুরিপানার জঙ্গলে।

স্থানীয় বাসিন্দা দেবব্রত বাবু জানান, “এখানকার বাসিন্দাদের বারবার বলেও কোনও লাভ হয়নি। রেল ও পুরসভা যদি সজাগ হত, তা হলেও এত বড় ক্ষতি হত না। প্রতি বছর এ সময়ে পরিযায়ী পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে আসে। এ বছর প্রায় আসেইনি”।

হাওড়া পুরসভার কমিশনার বিজিন কৃষ্ণ জানান, “গত বছর ঝিল পরিষ্কার করতে গিয়ে আমরা সমস্ত কচুরিপানা তুলে ফেলায় সমস্যা হয়েছিল। কচুরিপানার ছোট ছোট দ্বীপ তৈরির করার জন্য আমাদের কোনও বিশেষজ্ঞ নেই। তাই এ বছর কেউ যদি আগ্রহী হয়ে এগিয়ে আসেন, আমরা তাঁকে লোকবল জোগান দেব। এর বেশি কিছু করা সম্ভব নয়।”

হাওড়া জেলার মুখ্য বন আধিকারিক নিরঞ্জিতা মিত্র বলেন, “জাতীয় পরিবেশ আদালতের নির্দেশ মেনে গত তিন বছর ধরে আমরা কচুরিপানা পরিষ্কার করছি না। আদালত হাওড়া পুরসভাকে নির্দেশ দিয়েছে। যা করার পুরসভাই করবে।” 
দূষণ কমাতে গত বছর সাঁতরাগাছি ঝিল পরিষ্কারের নির্দেশ দিয়েছিল পরিবেশ আদালত। আর আদালতের নির্দেশে পরিষ্কার করতে গিয়ে সব কচুরিপানা ঝিল থেকে তুলে ফেলেছিল হাওড়া পুর নিগম। আর পরিযায়ীর দল বসার জায়গা, খাবার না-পেয়ে ঝিল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এ বার একেবারে উল্টপুরাণ! পানার বাড়বাড়ন্তে এমন হাল ঝিলের, যে ফিরে যাচ্ছে পাখিরা।

পক্ষীপ্রেমীদের দাবি, নভেম্বরের গোড়া থেকেই কিছু পাখি আসতে শুরু করে সাঁতরাগাছি ঝিলে। কিন্তু এ বার এসেও কচুরিপানা ভরা ঝিলের কোথাও বসতে না-পেয়ে ফিরে যাচ্ছে তারা। একই দাবি এলাকার বাসিন্দাদেরও। কলকাতা থেকে আসা শান্তনু বাবু আক্ষেপের সুরে বলেন, “নভেম্বরের শুরুতেই ঝিলে পাখিরা আসতে শুরু করে। তাই ক্যামেরা নিয়ে এসেছিলাম পাখির ছবি তুলতে কিন্তু ঝিলের অবস্থা দেখে মন খারাপ হয়ে গেল, কিছু কমন চিল দেখা যাচ্ছে ঝিলে উড়তে কিন্তু তারাও বসার জায়গা না পেয়ে ঝিলের উপর ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখনই যদি ঝিল পরিষ্কার করা না-হয়, তা হলে এরাও ফিরে যাবে। “

সাঁতরাগাছি ঝিলে ২০টি প্রজাতিরও বেশি স্থানীয় ও পরিযায়ী পাখি দেখা যায়। এদের মধ্যে আছে ছোট সরাল, জলমুরগি, গিরিয়া হাঁস, জলপিপি, ডাহুক, ছোট-মাঝারি-বড় পানকৌড়ি, লাল কাঁক, গো-বক, কোঁচ-বক, সাধারণ বালুবাটান, সুইনহো কাদাখোঁচা, সাদা খঞ্জন, সাদাবুক মাছরাঙা, বামুনিয়া হাঁস ইত্যাদি।

পক্ষী পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন “প্রকৃতি সংসদে” র সর্বশেষ পাখি সুমারির রিপোর্ট বলছে, ২০১৬ সালে এই ঝিলে ১৮টি প্রজাতির ৫৪৭৪ টি পাখির দেখা মিলেছিল। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ১৮ টি প্রজাতির ৩১২৩ টি পাখি ছিল। সেখানে ২০১৮ তে জানুয়ারিতে পাখি ছিল মেরে কেটে হাজারখানেক। ঝিলের মাঝখানে পাখিদের বিশ্রামের জন্যে কিছু দ্বীপ তৈরি করা হয়েছিল অতীতে কিন্তু গত বছর ঝিল পরিষ্কারের সময় সেগুলি নষ্ট করে ফেলা হয়। এ বারও নেই কোনও দ্বীপ। ফলে পাখি এলেও রোদ পোহানো, বিশ্রামের কোনো জায়গা নেই। এছাড়া জাতীয় পরিবেশ আদালত নির্দেশ দিলেও ঝিলের পাড় থেকে এখনও জবরদখল সরানো হয়নি এখনও বরং একটি পাড়ে তৈরি হয়েছে বহুতল। এলাকার বাসিন্দাদের একাংশ বলেছেন, আবর্জনায় ঝিলের অনেকটা ভরাটও হয়েছে।

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment