বাংলাদেশি চিকিৎসকদের নিউমোনিয়ায় যুগান্তকারী আবিষ্কার

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

মিজান রহমান, ঢাকাঃ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর জন্য অন্য যে কোনো রোগের চেয়ে বেশি দায়ী নিউমোনিয়া। বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ছয় মিলিয়ন শিশুর মৃত্যু ঘটে। যার এক মিলিয়নই মারা প্রাণঘাতী নিউমোনিয়ায়। বাংলাদেশে প্রতি বছর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১৭ হাজার ৪০০ জন শিশুর মৃত্যু ঘটে, ঘণ্টায় মারা যায় গড়ে দুইজন। এই হার মোট শিশুমৃত্যুর ১৬ শতাংশ।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. কামরুজ্জামান জানান, “গত এক বছরে এই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৩ হাজার ৯৫৫ জন শিশুর মধ্যে নিউমোনিয়ার রোগীই ছিল ৩ হাজার ৩৭৮ জন। এর মধ্যে ১৩৬ জন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু হয়। হতাশাজনক এ পরিস্থিতির মধ্যেও সচেতনতা এবং টিকাদান ও মাতৃদুগ্ধ দানের হার বাড়ানো গেলে এই রোগ আর অপ্রতিরোধ্য থাকবে না বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীরা। বিশ্বজুড়ে ১২ই নভেম্বর পালিত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক নিউমোনিয়া দিবস। দিবসটির প্রাক্কালে বাংলাদেশে নিউমোনিয়া এখন প্রতিকারযোগ্য, প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য রোগ বলে জানিয়েছেন ঢাকা শিশু হাসপাতালের রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. প্রবীর কুমার সরকার”। এরই মধ্যে নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশুদের জন্য স্বল্প খরচে কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র আইসিডিডিআরবির সিনিয়র বিজ্ঞানী ডা. জোবায়ের চিশতির নেতৃত্বে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরা।

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের সহায়তায় তৈরি এ পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হয়েছে প্লাস্টিকের পুরনো বোতল, মানসম্মত অক্সিজেন সঞ্চালন নল ইত্যাদি। এগুলোর দাম যেমন কম, তেমনি সহজলভ্য। অন্যদিকে ভাইরাসজনিত নিউমোনিয়ার টিকা আবিষ্কারেও গবেষণা চলছে ঢাকা শিশু হাসপাতালে। ডা. জোবায়ের চিশতি জানান, তার আবিষ্কৃত নতুন পদ্ধতিতে নিরবচ্ছিন্ন বায়ুপ্রবাহ ব্যবহার করে প্রচলিত চিকিৎসা উপকরণের চেয়ে কার্যকরভাবে রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস চালু রাখে।

মূলত এটি বাবল-সিপাপের সাশ্রয়ী বিকল্প কৌশল। এ পদ্ধতিতে প্রথমে একটি প্লাস্টিকের বোতলে পানি ভরে অন্যপ্রান্ত ডুবিয়ে দেওয়া হয় অন্য একটা টিউবে। শিশুরা অক্সিজেন টেনে নেয় একটি জলাধার থেকে এবং নিশ্বাস ছাড়ে একটি টিউবের মাধ্যমে, যা ডোবানো থাকে একটি পানির বোতলের মধ্যে, যার ফলে বাতাসে বুদবুদ তৈরি হয়। এই বুদবুদ থেকে সৃষ্ট চাপ ফুসফুসের বায়ুথলিগুলোকে খুলে রাখতে সাহায্য করে। এভাবেই বেঁচে যায় শিশুরা। চিকিৎসা বিজ্ঞানী ডা. যোবায়ের চিশতি বলেন, “মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের শ্বাস-প্রশ্বাস চালু রাখতে অক্সিজেন সরবরাহের জন্য বাবল-সিপাপ ব্যবহৃত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা (ডব্লিউএইচও) স্বীকৃত স্বল্প প্রবাহের অক্সিজেন প্রয়োগের পদ্ধতির চেয়ে বাংলাদেশে তৈরি বাবল-সিপাপ বেশি কার্যকর। নার্স এবং অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা এটি সহজেই ব্যবহার করতে পারেন।”

“আমার স্বপ্ন, এই পদ্ধতির ব্যবহার গ্রামে-গঞ্জের হাসপাতালগুলোতে পৌঁছে দেওয়া। এটি যদি সারাদেশের হাসপাতালগুলোতে ব্যবহার করা হয়, তাহলে আগামী ৩/৪ বছরে শিশুমৃত্যুর হার ১৭ হাজার থেকে ৫/৬ হাজারে নিয়ে আসা সম্ভব। আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের মাধ্যমে এটি সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে সরকারের সঙ্গে কথা বলেছি। আগামী দুই বছরের মধ্যে এটি সারাদেশে ব্যবহৃত হবে।”

তিনি বলেন, “আমাদের নিজস্ব হাসপাতালে এটি গত পাঁচ বছর ধরে সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ পর্যন্ত আমরা এক হাজারেরও বেশি শিশুকে এই চিকিৎসা দিতে পেরেছি এবং সফল হয়েছি।”

ডা. প্রবীর কুমার সরকার জানান, “বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারিভাবে নিউমোনিয়ার টিকা দেওয়া হচ্ছে। এ দুটি টিকার নাম হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জি টাইপ বি (হিব) ও নিউমোকক্কাল কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি)। এই টিকা ব্যবহারে ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত নিউমোনিয়ার সংক্রমণ কমানো সম্ভব। এটিও প্রমাণিত সত্য যে, এই টিকা শুরুর পর থেকে ব্যাকটেরিয়াজনিত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার হার আশ্চর্যজনকভাবে কমে গেছে। তবে ভাইরাসজনিত সংক্রমণের টিকা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তবে শিশু হাসপাতালেই এই টিকা আবিষ্কারে গবেষণা চলছে। সচেতনতায় কমবে নিউমোনিয়াঃ বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মের প্রথম ছয় মাস বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ালে ১৫ থেকে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত নিউমোনিয়ার প্রকোপ কমে যায়। তবে অনেক প্রচারণা সত্ত্বেও বাংলাদেশে মাত্র ৪৩ শতাংশ শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো হয়। উপযুক্ত সময়ে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ নিউমোনিয়া প্রতিকারে সবচেয়ে কার্যকরী।

যদিও ১৪টি দেশে পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশুদের মাত্র ২৭ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক পেয়ে থাকে। এর মূল কারণ হল অসচেতনতা ও জ্ঞানের অভাব। উন্নয়নশীল দেশে কেবলমাত্র ৫৪ শতাংশ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। বাংলাদেশে এই সংখ্যা মাত্র ৩৭ শতাংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, ধোঁয়ামুক্ত চুলার ব্যবহার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে।

ডা. মো. কামরুজ্জামান জানান, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু ও তাদের অভিভাবকদের গড়ে ৫ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। শুধুমাত্র অ্যান্টিবায়োটিকের জন্য রোগীপ্রতি গড়ে খরচ হয় ১ হাজার ৯০০ টাকা। ডা. প্রবীর কুমার সরকার জানান, নিউমোনিয়া প্রতিরোধের সবচেয়ে সহজ ও কার্যকরী সমাধান হচ্ছে সময়মতো ভ্যাকসিন নেওয়া।

এছাড়াও সুস্থ শিশুকে নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশুর কাছে যেতে না দেওয়া, হাঁচি-কাঁশি আক্রান্ত লোকের কাছে বাচ্চাদের যেতে না দেওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অর্থাৎ বাইরে থেকে এসে এবং টয়লেট ব্যবহার ও খাবার আগে ও পরে হাত-মুখ সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলা।

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment