30 C
Kolkata
Sunday, July 14, 2024
spot_img

ইতিহাসের ছট পুজো আজকের বহমান রীতিতে প্রবাহমান ধারা

 

রাজীব মুখার্জী, হাওড়াঃ মগধের নাম উচ্চারণ হলেই সাথে সাথে উচ্চারিত হয় চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য-এর নাম। ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম এক পরাক্রমী ও এক চক্রবর্তী সম্রাট তিনি। না এই চক্রবর্তী আজকের চক্রবর্তী নয়। তিনি ছিলেন ভারতীয় ইতিহাসের এক গৌরবময় সম্রাট ও যার নাম জুড়ে আছে মগধের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ তথা তাঁর নবরত্ন সভার শ্রেষ্ঠ রত্ন কৌটিল্য নামে প্রসিদ্ধ "চাণক্যের সুযোগ্য শিষ্য "। তিনি সম্রাট অশোকের যজ্ঞ পূর্বসুরি। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের শাসন কাল থেকে আরো বিকশিত হয় অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গের মগধে এই ছট পরব। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই ছট পুজোটা কি?

আদতে প্রাচীন মগধ দেশ অতি শুকনো দেশ ছিল। তাই যে বছর সু-বৃষ্টি হতো সেই বছরে ধান ভাল হতো। আর সেই বছর হতো "ছয় টি বরসাত"। প্রথাগত ডিসেম্বর জানুয়ারী মাসে একটু বৃষ্টি হলে সে বছর রবি শস্যের ফলন ভাল হয়। তাই এই ছট মাঈয়ের পুজোও ওই ফসলের উপর নির্ভর করতো। যে বছর খারিপ শস্যের ফলন ভাল হতো সেই বছর ছট মাঈয়ের পুজোও ভাল হতো।

সুতরাং খারিপ ফসলের জন্য কার্ত্তিক মাসে ছট পুজো আর রবি ফসল ভাল হলে চৈত্র মাসে ছট, এই ছিল প্রাচীন মগধের রীতি। এখন কলকাতায় উত্তর ভারতের লোকেরা গঙ্গার ধারে ছট মাঈয়ের পুজো করে থাকে। প্রাচীন বৈদিক মতে কিংবা আর্যদের মতে সূর্য হল পুরুষ দেবতা এবং চন্দ্র হল স্ত্রী দেবতা কিন্তু দ্রাবির অনার্যদের মতে সূর্য হল স্ত্রী দেবতা এবং চন্দ্র পুরুষ দেবতা। তাদের বিশ্বাস ছিল যে সূর্যের কৃপাতে সমুদ্রের জল বাস্প হয়ে উপরে উঠে মেঘ হয়ে বৃষ্টি হয়, তাই তাদের খারিপ ফসল অর্থাৎ বর্ষাতী ধান ভাল হয়। আবার সূর্যের কৃপাতেই শীতের সময় যে শীতের বর্ষা হয় সেটা ছটী বরসাত অর্থাৎ রবি ফসল ভাল হয়। আর এই ফসল কাটা হয় শীতের একেবারে শেষের দিকে। তাই মগধে বছরে দুবার ছটের পূজা হয়। একে একবার কার্তিকা ছট আর একবার চৈতী ছট বলে।

সভ্যতার বহমান ধারায় আর্য ও দ্রাবিড় সংস্কৃতি মিশে জন্মেছে এক মিশ্র সংস্কৃতি। ইদানিং প্রচলিত এই পুজোকে বলা হয় ছট মাঈ। এখন আর্য মতেই পুজো করা হয় সূর্যকে, জলে দাঁড়িয়ে সূর্যকে অর্ঘ্য দেওয়া হয়। নানা ধরনের জিনিস যেমন গম দিয়ে তৈরি ঠেকুয়া , চালের নাড়ু , বাতাবী নেবু, কলা, আখ ইত্যাদি। এই সব জিনিস আবার অনার্যদের জিনিস। এর থেকে বোঝা যায় বেদের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকলেও এখনটা ভারতীয় মিশ্র সংস্কৃতির অঙ্গ।

প্রাচীনকালে মগধ মানেই বেদ বিরোধী দেশ। এই মগধ সেই বেতাল পঞ্চ বিংশতি সিংহাসনের উপরে অধিষ্ঠিত চক্রবর্তী সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের দেশ। অধুনা পটনা, গয়া এ সমস্ত সবই অতীতের মগধ দেশ। অঙ্গ (বিহার ), বঙ্গ (অভিবক্ত বাংলা ) ও কলিঙ্গ (উড়িষ্যা ) সংযুক্তিতেই গোটা ভারতের রাজধানী ছিল মগধ। এই মগধ দেশেই এখন ছট পুজো করা হয় জলে দাঁড়িয়ে সূর্যের দিকে তাকিয়ে। এই ভাবেই এখন ছট পুজো করা হয়। এখন ছট পুজো না করলে নিয়ম, আচারে এদিক অদিক হলে নানান ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই ছট মাঈ অসন্তুষ্ট হয়ে গেলে নানা বিপদ হয়ে যাবে অনেক। এই ভয়েই ভক্তি সহকারে বা ভয় ভক্তি সহকারে ছট মাঈয়ের পুজো হয়ে থাকে। নিজের মনের ভয় থেকে পুজো করার পেছনে এই ভয়ের মনস্তত্বোই কাজ করছে।

ঠিক নবরাত্রী ও কালীপুজোর পরেই আরেকটি অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ পুজো হল এই ছট। নেপালি, মৈথিলী ও ভোজপুরি ভাষা অনুযায়ী ছট কথাটির অর্থ হলো ষষ্ঠ। প্রতি বছর হিন্দু ক্যালেন্ডার অনুযায়ী কার্তিক মাসের ছয় তারিখ থেকে শুরু হয় ছট পুজো। সমগ্র উত্তর ভারতের একটি বিখ্যাত পুজো এটি। উত্তর প্রদেশের কিছু অংশ ছাড়াও, বিহার, ঝাড়খন্ড ও নেপালের মিথিলা অঞ্চলে এই পুজোর প্রচলন আছে এখনো। এই ছট পুজোতে পরিবারের সব সদস্য, আত্মীয়, বন্ধু, ও অন্যান্য পরিজনদের মঙ্গল কামনায় পুণ্যার্থীরা এই পুজো করেন। প্রায় চারদিন ব্যাপী চলতে থাকে এই পুজো। পুজোয় বেশ কঠোর নিয়মের সঙ্গে এটি পালন করা হয়। এদিন পুজোর সময়ে কোনোরকম খাদ্য এবং জলস্পর্শ থেকে বিরত থাকেন উপোসীরা। এই সময় শুধুই সূর্যদেব ও তার স্ত্রী ঊষার আরাধনা করা হয় এবং উপবাসের সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গার পবিত্র জলে স্নানের প্রথাও রয়েছে এই ছট পুজোতে।

এছাড়া মহিলারা স্নান সেরে কমলা রঙের সিঁদুর ব্যবহার করে থাকেন। প্রশ্ন হলো কিভাবে শুরু হল এই পুজোর উৎপত্তি? তবে ছট পুজোর উৎপত্তি নিয়ে স্পষ্ট ভাবে বা খুব বিশদে জানা যায়নি ইতিহাসের পাতায়। একদল ঐতিহাসিক মনে করেন এর ইতিহাস লুকিয়ে আছে রামায়ণ ও মহাভারতের পাতায়। রামায়ণে কথিত আছে, রামচন্দ্র ছিলেন সূর্যদেবের বংশধর। তিনি চৌদ্দ বৎসর বনবাসে কাটিয়ে অযোধ্যায় ফেরেন। ফিরে এসে তিনি এবং সীতা দুজনেই সূর্য দেবের তপস্যায় উপবাস রাখেন। পরদিন ভোরে সেই উপবাস ভঙ্গ করেন। সেই উপবাসই পরবর্তীতে ছট পুজোর রূপ নেয়। আবার আরেক মতে মহাভারতের বিশিষ্ট চরিত্র কর্ণ ছিলেন সূর্যদেব ও কুন্তীর পুত্র। কথিত আছে কর্ণ একবুক জলে দাঁড়িয়ে সূর্য দেবের আরাধনা করতেন এবং প্রার্থনার শেষে তিনি গরীবদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করতেন। কালক্রমে এভাবেই ছট পুজোর প্রচলন হয়।

এই দেশের কিছু বিজ্ঞানীরা আবার এটাও মনে করেন এই পুজো বেশ বিজ্ঞানসম্মত। দেহ থেকে ক্ষতিকর টক্সিন এর বহিস্কার করতে বেশ সাহায্য করে এই পুজোর প্রথা। সূর্যের সামনে উন্মুক্ত অবস্থায় জলে দাড়িয়ে থাকাকালীন দেহে সৌর তড়িৎ প্রবাহিত হয়। এটি মানব দেহের কর্ম ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
আবার একদল বৈজ্ঞানিক মনে করেন দেহ থেকে ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া ও ভাইরাস তাড়াতেও এটি সক্ষম।

আসন্ন শীতের জন্য দেহকে তৈরী করে দেয় এই প্রথা। কিছু পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে ছট পুজা সব চেয়ে পরিবেশ বান্ধব।
ছট পুজো কিভাবে হয়? জেনে রাখুন এই পুজোর বিধি।

প্রথম দিন: এই দিন পুণ্যার্থীরা স্নানের আগে পর্যন্ত কোনো খাদ্য গ্রহণ করেন না। স্নানের পর সবাই মিলে বসে একসঙ্গে ছোলার ডাল,পায়েস, লাউয়ের তরকারি প্রভৃতি রান্না করে। একটা গোটা কলার কাঁদি উৎসর্গ করা হয় সূর্যদেবকে।

দ্বিতীয় দিন: এই দিন খরনা পুজোর আগে অবধি উপবাস করা হয়। গুড়ের পায়েস ও পুরি দেবতাকে নিবেদন করা হয়। এরপর উপোসীরা নিয়মভঙ্গ করেন।

তৃতীয় দিন: তৃতীয় দিনই হল সব চেয়ে কঠোরতম দিন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেয়েরাই এই দিনটি পালন করে থাকেন। এই দিন খাদ্য ও জল ছাড়া উপবাস করতে হয়। সূর্য দেবের স্ত্রী ছঠি মাইয়া (ঊষা) কে উৎসর্গ করা হয় এই দিনটি। লোকসংগীতের সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গা, কোশী, কার্নালী, এই নদীগুলিতে চলতে থাকে পুণ্যস্নান। সূর্যাস্তের আগে পর্যন্ত স্নান চলতে থাকে। 

চতুর্থ দিন: এই দিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যদেবের কাছে প্রার্থনা সেরে অবশেষে এই ব্রতের সমাপ্তি হয়।

Related Articles

Stay Connected

17,141FansLike
3,912FollowersFollow
21,000SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles