সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে, এটাই সত্যি! জীবনপাত করে বলছেন এক বাঙালি

Spread the love
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

 

রাজীব মুখার্জী, রাসবিহারী এভিনিউ, কলকাতাঃ  যদি আপনাদের বলি সূর্য অস্ত যায় না পৃথিবী অস্তমিত হয়, কি বলবেন ! হ্যাঁ এই ধরণের এক তর্কই এই রাজ্যের একজন মানুষের জীবনকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সূর্যই পৃথিবীর চার দিকে ঘুরছে, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে এই তর্ক কেউ করতে এলে কি বলবেন !

ধর্মতলা থেকে টালিগঞ্জ অব্দি, বিশেষত অতীতের কলকাতা ময়দানে হওয়া বইমেলাতে ল্যাম্বপোস্ট ছেয়ে যেত কালো রঙের ব্যাকগ্রাউন্ডে খুদে খুদে সাদা লেখায় “পৃথিবী নয় সূর্য পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে”। কি মনে পড়ছে আপনাদের?এই ব্যক্তি আর কেউ নন, এই মানুষটির নাম কে. সি. পাল। এই সেই মানুষটাই যিনি আপাতত নিজের বাড়ি-ঘর, পেনশন হারিয়ে বিগত দুই বছর ধরে কলকাতার রাসবিহারী মোড়ের ফুটপাতে দিনের পর দিন কাটাচ্ছেন। কথা বলছিলাম সেই কে সি পাল-এর সঙ্গে। তার পাশেই তাঁর থাকার জায়গা। থাকার জায়গা মানে ফুটপাতের রেলিঙের সঙ্গে বাঁধা, মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই। চওড়া বড়জোর দু-আড়াই ফুট, লম্বাতেও ছয় সাত ফুটের বেশি হবে না। এর ভেতরেই চলছে তাঁর রান্নাবান্না, পড়াশোনা। এইটাই কে. সি. পালের রোজকার পৃথিবী।

রাসবিহারী মোড়ে ফুটপাতের ওপর বসে বলছিলেন কার্তিকবাবু, “পৃথিবীর আহ্নিক গতি আছে, কিন্তু বার্ষিক গতি নেই। আহ্নিক গতি আছে বলেই দিন-রাত্রি হয়। আর ঋতু পরিবর্তন হয় সূর্যের বার্ষিক গতির জন্য”। হাওড়া স্টেশন চত্বর কিংবা কলকাতার বহু দেওয়ালে, ব্রিজে, ল্যাম্পপোস্টে, দেওয়ালে যাঁর নিজের হাতে তৈরি গ্রাফিক্সের বোর্ড অনেকেই দেখেছেন। নিজের হাতের লেখায় তাঁর তত্ত্বের বিবরণ, কোথাও ছবি দিয়ে ভাল করে এঁকে নিজের তত্ত্বটাই বিশদ ব্যাখ্যা করা আছে। ঝুপড়ির চার দিকে কোন প্লাস্টিক শিট কিংবা তেরপল দিয়ে বানানো দেওয়াল নেই। ছোট ছোট পিচবোর্ড বা প্লাস্টিকের টুকরো জুড়ে জুড়ে তৈরি করেছেন পর্দা। তার কোনওটায় লেখা তাঁর থিয়োরি, কোনওটায় লেখা তাঁর সৌরমণ্ডলের মডেল, কোনওটায় পথচারীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য, আবার কোনওটায় প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানীদের প্রতি তির্যক মন্তব্য করে লেখা। বলা চলে নিজের তত্ত্ব দিয়েই নিজের ঘর গড়েছেন তিনি।

সাংবাদিকতার নেশাতেই গিয়েছিলাম ওঁর হাওড়া শহরের বাড়িতে। দেখলাম একটি পাকা বাড়ি। সামনে কিছুটা জমি। সে সব ছেড়ে এই ফুটপাত কেন? উত্তর দিলেন “রোজ রোজ অশান্তি মানসিকভাবে নেওয়া যায় না। আমাকে নিয়ে আমার পরিবারের সমস্যা আছে।” হয়তো তাঁর কারন তাঁর এই একান্ত ব্যক্তিগত ‘সত্য’-র পিছনে সব কিছু ভুলে ছুটে চলাটাই। আরো বললেন “প্রতি মাসে পেনশনের কয়েক হাজার টাকাও আর হাতে পাই না এখন। জোটে মোটে পাঁচশো টাকা। ইচ্ছে করলে কোর্টে যেতে পারতাম কিন্তু সে আমি পছন্দ করি না।”


তাঁর এমন অবস্থার কথা শুনে প্রশ্ন করলাম তাহলে চলে কী করে আপনার? হাসতে হাসতে রীতিমতো অঙ্ক কষে দেখিয়ে দিলেন কার্তিকবাবু “মাসে পাঁচশো মানে, দিনে সতেরো টাকার মতো করে দাঁড়াচ্ছে। মোটামুটি খরচ ওতেই চলে যায়। দু টাকা লাগে সকালে চা খেতে, দু টাকা লাগে প্রাতঃকৃত্য করতে। নেশা বলতে এই নস্যি, এর জন্য সামান্যই খরচ হয়। বাকি টাকায় রান্নাবান্না সেরেনি। এ ছাড়াও তো বই বিক্রির টাকা থেকে লাভ থাকে”।

তিনি বলতে থাকেন “মা মারা যাওয়ার পরে গ্রামের বাড়িটাও বিক্রি করে দিই এক আত্মীয়কেই, সেখানেও আশি হাজার পাঁচশো টাকা পাওনা আছে। আড়াই বছর হয়ে গেল, কিন্তু আমি চুপ করে আছি, দেখি কবে দেয়। এখন যদি আমি ঝগড়ার মধ্যে যাই, আমার প্রচারের কাজটায় ভাটা পড়ে যাবে”।

একটা লোক একাত্তর বছর বয়সে এতটুকু অবসন্ন নন। কোনও হতাশা চোখে পরে না। ক্রোধ, লোভ , ইগো যা প্রায় সব বাঙালির মধ্যে দেখা যায় তার লেশ মাত্র নেই এই পৌড়র মধ্যে। আজও তিনি নিজের সব উজাড় করে দিচ্ছেন নিজের বিশ্বাসকে সকলের সামনে প্রতিষ্ঠিত করতে। এই জায়গায়, তাঁর অধ্যাবসায় আর লড়াই করার মানসিকতায় তাঁর লড়াইটা বোধহয় সেদিনকার গ্যালিলিয়োর চেয়ে কিছু কম নয়। তাঁর স্থির বিশ্বাস, এই লড়াইয়ে সৃষ্টির আদি থেকেই তিনি জিতে রয়েছেন, যে তাঁর তত্ত্বই ষোলো আনা অভ্রান্ত, নির্ভুল এটাই একদিন প্রতিষ্ঠিত হবে পৃথিবীর কাছে। এই বিশ্বাসটাই তাঁর পুঁজি। এই বিশ্বাসের পুঁজিতে ভর করেই তিনি বেঁচে আছেন ও তাঁর এই বেঁচে থাকার অদম্য লড়াইটা চালিয়ে যাচ্ছেন। সূর্য না পৃথিবী কে কার চার দিকে ঘুরছে, আজকে তাঁর চেয়েও বড়ো সত্যি এই সহায় সম্বলহীন ব্যক্তির নিজের বিশ্বাসের সত্যি তাকে প্রতিষ্ঠার লড়াই টাই।

সাম্প্রতিক তাঁর এই লড়াইয়ে জুড়তে চলেছে তাঁর জীবন সংগ্রাম ও বিশ্বাসের উপরে তৈরি হওয়া বায়োপিক। তাঁর লড়াই দেখা যাবে ৬০ এম. এম.-এর সোনালী পর্দাতে। তাঁর এই বিশ্বাসের গল্পই বলবে অরিজিৎ বিশ্বাসের ছবি “সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরা”। ছবিতে অবশ্য কে. সি. পাল নামটি ব্যবহার করা হয়নি, তাঁর নাম এখানে টি সি পাল।

ছবির বিষয়ে বলতে গিয়ে মেঘনাদবাবু জানান, “কে সি পালকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। তাঁর তেজ, শক্তিকে রপ্ত করার চেষ্টা করেছি যথাসম্ভব। এখন কতটা ছবিতে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি তা ছবিটি মুক্তি পেলেই বোঝা যাবে”। ছবিতে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব মেঘনাদ ভট্টাচার্য। অন্যান্য চরিত্রে রয়েছেন চিরঞ্জিত চক্রবর্তী, অঞ্জন দত্ত, শ্রীলা মজুমদার, সুচন্দ্রা ভানিয়া, পবন কনোড়িয়া সহ আরও অনেকেই।

ছবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন অঞ্জন দত্ত। তিনি জানান, “এটি বায়োপিক হলেও আদ্যোপান্ত একটি রাজনৈতিক ঘরানার ছবি। সব ছবিতে অভিনয় করার জন্য তিনি রাজি হই না কিন্তু, এই ছবির গল্পটি খুবই সংবেদনশীল। তাই কোনও কিছু না ভেবে রাজি হয়ে গিয়েছিলাম”। তিনি আরো জানালেন, “সবার হয়তো ছবিটি ভালো নাও লাগতে পারে, কিন্তু যাদের মনে হবে ছবিটি দেখা প্রয়োজন, তাঁরাই যেন ছবিটি দেখেন। তাহলেই ভালো ছবির মর্ম উপলব্ধি হবে।”

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment