ভাইফোঁটার ইতিকথা

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

পল মৈত্র, দক্ষিন দিনাজপুরঃ সভ্যতার ইতিহাসের সাথে সংস্কৃতির এক অদৃশ্য যোগসূত্র রয়েছে। সেই ধারায় অনেক আচার-অনুষ্ঠান শতাব্দীর পর শতাব্দী পালিত হয়ে আসছে নিয়মনিষ্ঠার সঙ্গে। এমনই একটি সংস্কার ‘ভাই ফোঁটা’। যার পোশাকি নাম ‘ভাতৃদ্বিতীয়া’। প্রতি বাংলা বছরের কার্তিক মাসের শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে পালিত হয় এ অনুষ্ঠান। ভাইয়ের মঙ্গল কামনায় তার কপালে টিকা দেন বোন। তাই ‘ভাইটিকা’ বললেও ভুল হবে না। ভাই ফোঁটা নিয়ে রয়েছে অনেক গল্প-কাহিনী।

দিদা-ঠাকুরমাদের কাছ থেকে শোনা, মৃত্যুদূত যম ও যমুনা যমজ ভাইবোন। সূর্যের ঔরসে জন্ম তাদের। বড় হওয়ার পর দুজনে আলাদা হয়ে যান। থাকতেন পরস্পর থেকে অনেক দূরে। লম্বা সময়ের ব্যবধানে যমুনার খুব ইচ্ছে হলো ভাইকে দেখতে। বার্তা পাঠালেন তাকে। বোনের নিমন্ত্রণে যমরাজকে আসতেই হলো। যথাসাধ্য আপ্যায়ন করলেন যমুনা। ফেরার সময় আবারো আসার প্রতিশ্রুতি দিলেন যম। তখন খুশিতে ভাইকে আশীর্বাদ করে টিকা পরিয়ে দিলেন কপালে। সেই থেকেই নাকি ভাই ফোঁটার প্রচলন।

আবার কথিত আছে, নরকাসুর নামের এক দৈত্য বধের পর কৃষ্ণ ফিরে এসেছেন বোন সুভদ্রার কাছে। তখন তাকে কপালে ফোঁটা দিয়ে মিষ্টি খেতে দেন সুভদ্রা। অনেকের মনে করেন, ভাই ফোঁটার শুরু এর মধ্য দিয়েই। যম-যমুনা বা কৃষ্ণ-সুভদ্রা, যাদের দ্বারাই এ অনুষ্ঠানের প্রচলন হোক না কেন, আজও তা বজায় রয়েছে। ভাইবোনের মধ্যে পবিত্র সম্পর্কের বার্তাকে আরো সুদৃঢ় করে এ রীতি।

ছেলেবেলার খুনসুটির সঙ্গী। বড় হয়ে জোট বেঁধে কোনো দুষ্টুমির আকার তৈরি, ধরা পড়ে পৃষ্ঠদেশে উত্তম-মধ্যমের পাহাড়। আবার কখনো কোনো দুষ্ট বুদ্ধি সফল হলে হেসে গড়িয়ে পড়া একে অন্যের ওপর। দুপুরে ভাত ঘুমের আগে কাড়াকাড়ি করে গল্পের বই পড়ার স্মৃতিও তার সঙ্গে। আবার মতের অমিলে ঝগড়া করে কথা বন্ধ। ভাইবোনের সম্পর্কটাই এমন মজার।

শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয়াতে ভাইকে নিজের বাড়িতে নিমন্ত্রণ জানায় বোন। সন্ধ্যা বাতি দেখানোর পর শুরু হয় অনুষ্ঠান। ভাইকে বসতে দেওয়া হয় নকশিকাঁথার কাজ করা সূতির আসনে। কাঁসা বা পিতলের থালায় ধান-দূর্বা, ঘরে আমপাতায় পারা কাজল, চন্দন সাজিয়ে নিয়ে আসে বোন। সঙ্গে থাকে ঘিয়ের প্রদীপ আর শাঁখ। মিষ্টির রেকাবিও বাদ যায় না। বোন বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে কাজল নিয়ে এঁকে দেয় ভাইয়ের ভ্রু-যুগল। এরপর মধ্যমা দিয়ে চন্দনের ফোঁটায় অঙ্কিত করে কপাল। সঙ্গে ছড়া কাটে; ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যম দুয়ারে পড়ল কাঁটা। যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা,আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা

তবে ছড়াটি বিভিন্ন পরিবারে রীতিভেদে পরিবর্তিত হয়ে থাকে। চন্দন পরানো হয়ে গেলে ধান-দূর্বা দিয়ে ভাইকে আশীর্বাদ করে বোন। বাজানো হয় শাঁখ। তার পর বাড়িয়ে দেয় মিষ্টির রেকাবি সাথে উপহার দেওয়া-নেওয়ার পালাও রয়েছে। আজ সেই পবিত্র তিথি। বোনরা দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনা করে ফোঁটা দেবে ভাইকে। এ কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নয়, উৎসব। সবাই শামিল হতে পারেন এ উৎসবে।

সম্পর্কিত সংবাদ