আমার জীবনকথা- ভাগ-১

Spread the love
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

 

পিতৃ-মাতৃকুলের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

রোটারিয়ান স্বপন কুমার মুখোপাধ্যায়

আমাদের মুখোপাধ্যায় পরিবারের আদি পুরুষ বলতে আমরা বুঝি আদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়। ইনি বসবাস করতেন সূতানটীর বাগবাজার অঞ্চলে। ইনি ছিলেন একজন বাকসিদ্ধ পুরুষ। বাগবাজার সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। ওনার পুত্র হরনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন একজন ভজন সিদ্ধ পুরুষ। উনি বাস করতেন হুগলি জেলার কোন্নগরে। উনি ছিলেন কালী সাধক। স্থানীয় আদিবাসিরা তাকে আদর করে বলতেন “হরপাগলা”। ওনার পুত্র গিরিশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায় সম্বন্ধে আমার কোনো জ্ঞান নেই। কিন্তু ওনার পুত্র পন্ডিত হরিনাথ মুখোপাধ্যায় আমার প্রপিতামহ। উনি বাস করতেন উত্তর কলকাতার দর্জিপাড়ায় অর্থাৎ হরি ঘোষ ষ্ট্রিটে।

ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় যখন কলকাতা সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন তখন আমার প্রপিতামহ পন্ডিত হরিনাথ ওই কলেজের অধ্যাপক এবং ‘অমরকোষ’ গ্রন্থের লেখক। হরিনাথ মুখোপাধ্যায়ের দুই পুত্র সন্তান। বড় ছেলে নরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ও ছোট ছেলে দ্বারিকানাথ মুখোপাধ্যায়। নরেন্দ্রনাথ মাতৃহারা হন যখন তাঁর বয়স মাত্র তিন মাস। ওই অবস্থায় তাঁর পিতা হরিনাথ দ্বিতীয়বার বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন। সেই সময় আমার পিতামহ নরেন্দ্রনাথের বড় মাসি হাওড়া জেলার বালির দশ আনার জমিদার বেনীমাধব বন্দ্যোপাধ্যায় স্ত্রী আমার পিতামহকে দর্জিপাড়া থেকে বালির জমিদার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তাঁকে মানুষ করেন। জমিদার বেনীবাবুই হলেন টেকচাঁদ ঠাকুরের “আলারের ঘরের দুলাল”। আমার পিতামহ নরেন্দ্রনাথ উত্তরপাড়া সরকারি বিদ্যালয় থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এন্ট্রাস’ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে সসম্মানে উত্তীর্ণ হবার পর উত্তরপাড়া প্যারিমোহন কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ.এ. পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন ও কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে সর্ববিষয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.বি.হন। প্রথম জীবনে ওই কলেজেই অধ্যাপনা শুরু করে পরবর্তীকালে Assistant Civil Surgeon-এর সরকারি পদ গ্রহন করে ঢাকায় বদলী হন। তাঁর কৃতী ছাত্রদের মধ্যে ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় অন্যতম।

নরেন্দ্রনাথের সহপাঠী ছিলেন তদানীন্তন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শল্য চিকিৎসক ললিত ব্যানার্জি যিনি ছাত্র হিসাবে বরাবর দ্বিতীয় স্থান অধিকার করতেন আর আমার পিতামহ নরেন্দ্রনাথ প্রথম স্থান অধিকার করতেন। তখনকার ব্রিটিশ রাজত্বে যে কোন ভৌগোলিক জেলার সবচেয়ে চারটি উচ্চতম সরকারি পদে ইংরেজরা থাকতেন। যেমন শাসনে District Magistrate, পুলিশে S.P., বিচারে Dist. Judge ও স্বাস্থ্যে Dist. Civil Surgeon. আমার পিতামহ প্রথম বাঙালি সিভিল সার্জেন- আমাদের পরিবারের গর্ব। ঢাকায় পরবর্তীকালে সিভিল সার্জেন পদে উন্নীত হবার পর তিনি বদলী হয়ে আসেন বাঁকুড়া জেলার দায়িত্বে। বাঁকুড়া থেকে তাঁকে বদলী করা হয় নদীয়া জেলায় এবং অবশেষে হুগলি জেলার দায়িত্ব নেবার কয়েক বছর পর তিমি অবসরপ্রাপ্ত হন। অবসরপ্রাপ্ত জীবনে চুঁচুড়ার একটি ত্রিতল বাড়ি ভাড়া করে স্বাধীনভাবে চিকিৎসা শুরু করেন ও অচিরেই হুগলি জেলার শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। আমাদের চুঁচুড়ার বড়-বাজারের বাড়িটার পূর্বে ছিল N.C.C.office, পশ্চিমে মায়ের মন্দির, দক্ষিণ-পূর্ব কোনে Duff School, উত্তরে রাস্তা, বাড়িটির তিনদিকেই রাস্তা। আমার প্রপিতামহ হরিনাথ মুখোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভজাত একটিমাত্র পুত্রসন্তান দ্বারিকানাথ মুখোপাধ্যায় কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজের উপাধ্যক্ষ ও পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন, আমাদের সকলের প্রিয় ছোড়দাদু।

ইতিমধ্যে ঢাকায় সুদীর্ঘ ১৬ বছর বাসকালে বালি থেকে তাঁর মাতৃসম মাসিকে তাঁর ইচ্ছায় টাকা পাঠাতেন এবং সেই অর্থে তিনি আমার দাদুর নামে বালি দাওনাগাজীর উল্টোদিকে ৩৮ নং গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের ওপর বিশাল বাড়ি তৈরি করেন ও তার পেছনে বিশাল জমি, পুকুর, বাগান তৈরি করে দেন। ১৯৪০ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পিতামহ আমার ঠাকুমা, মেজ বৌমা, পুত্র-কন্যা, নাতি-নাতনিদের সকলকে নিয়ে বালির বাড়িতে বসবাস করতে আসেন। তখন আমার বয়স হবে সম্ভবত ৬ বছর । আমাকে বালির রিভার্স থমসন স্কুলের প্রথম শ্রেনিতে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে ওই স্কুলের নাম “শান্তিরাম বিদ্যালয়”।

ক্রমশ….

সম্পর্কিত সংবাদ