রঙিন মাছে রঙিন স্বপ্ন পূরণের কাহিনী ও লক্ষী লাভ

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

রাজীব মুখার্জী, হাওড়াঃ ছোট্ট রিয়ার ভীষন সাধ সে একুরিয়ামে রাখবে রং বেরঙের মাছ। রোজ স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে পাড়ার মোড়ে দোকানটা চোখে পরে তার। চোখটা আটকে যায়। বাড়ি ফিরেই বায়না। বাড়ির লোকের থেকে রোজ বকা খায় এই নিয়ে। আজ হঠাৎ করে নাচের স্কুল থেকে ফেরার সময় তার বাবা তাকে নিয়ে ঢোকে ওই দোকানটিতেই। মুহূর্তে তার মুখে ফুটে ওঠে এক অনাবিল আনন্দ। তার চোখের সামনে একুরিয়ামে সাজানো মাছ গুলোকে সে অবাক হয়ে দেখে। কাঁচে হাত দিয়ে বাইরে থেকেই যেন সে ছুঁতে চায় মাছগুলোকে। ৬ টি মাছ আর একুরিয়াম নিয়ে বাড়ি ফিরছে আজ। মুখে বিশ্ব জয়ের আনন্দ। মাছেদের নাম অব্দি দেওয়া হয়ে গেছে এতক্ষনে তার। বছর ৬-এর সেই ছোট্ট মেয়েটিও আজ অনেক বড়ো দায়িত্ব নিয়ে নিলো। স্কুলে যাওয়ার আগে রোজ তাদের খাওয়ার দিয়ে যাওয়া, জল পাল্টানোর দিন তারিখ মনে রাখা। তার জীবনে এক অবর্ণনীয় খুশি এনে দিয়েছে এই রঙিন মাছ গুলো। ছোট্ট মেয়েটার চোখের তারায় ভেসে ওঠে সেই সুখ।

শুধু রিয়া কেনো রঙিন মাছের প্রতি আকর্ষণ কম বেশি সব মানুষেরই আছে। আর এই আকর্ষণ দিন প্রতিদিন বাড়িয়েছে বাজারে এর চাহিদা, এই চাহিদা বাড়িয়ে তুলেছে এই ব্যবসার সাথে নতুন মানুষের যুক্ত হওয়ার সুযোগ। সর্বোপরি লক্ষী লাভের সুযোগ। এই রঙিন মাছের চাষ নতুন করে কর্মসংস্থানের এক নতুন দিশা দেখিয়েছে রাজ্য জুড়েই। সেই একই চিত্র ধরা পরে হাওড়া শহরতলির বালি, ডোমজুড় ও দাশনগরের মতো জায়গাতেও। রাজ্য মৎস দফতরের পরিসংখ্যান বলছে গত দুই বছরে হাওড়া জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের মৎস্যচাষিদের মধ্যেও রঙিন মাছ চাষের প্রবণতা অনেক বেড়েছে আগের তুলনায়। আগে হাওড়ার রঙিন মাছ কেবল দেশের অন্যান্য রাজ্যে পাঠানো হত।

এখন মৎস্য দফতর সূত্রে জানা যাচ্ছে, বর্তমানে সেই সমস্ত রঙিন মাছ থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়ার মতো বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের “নীল বিপ্লব” প্রকল্পের আওতায় রঙিন মাছ চাষের জন্য সরকারের তরফ থেকে এই রাজ্যের মৎস্যচাষিদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বছর দুয়েক ধরেই।

রাজ্য মৎস্য দফতরের আধিকারিকেরা জানাচ্ছেন, সরকারি সাহায্য চালু হওয়ায় গ্রামের বেকার ছেলেদের মধ্যেও রঙিন মাছ চাষে উৎসাহ অনেক বেড়েছে। মৎস দফতরের থেকে বিগত দুই বছরে হাওড়ার গ্রামীণ এলাকার প্রতিটি ব্লকে ব্লকে রঙিন মাছ চাষের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রশিক্ষণ শেষে তাদের ব্যবসা শুরুর জন্য আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। এই খানেই বদলেছে সামগ্রিক চিত্রটি। হাওড়ার গ্রামীণ এলাকায় গত এক বছরে সব থেকে বেশি রঙিন মাছ চাষ শুরু করেছেন উলুবেড়িয়া এক নম্বর ব্লকের মাছ চাষিরা।

ওই ব্লকের বিডিও কার্তিক রায় জানান, “গত এক বছরে আমার ব্লকে প্রায় এক হাজার চাষি রঙিন মাছ চাষ শুরু করেছেন. এই মাছ চাষে লাভ দেখেই সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ আরো বাড়ছে।” বালির বাসিন্দা অম্লান পাখিরা আজ প্রায় কুড়ি বছর ধরে বিভিন্ন প্রজাতির রঙিন মাছের চাষ করছেন নিজের বাড়িতে চৌবাচ্চা তৈরি করে। তিনি জানাচ্ছেন আমাদের, “গত দুই থেকে তিন বছরে আমার এখান থেকেই মাছের চারা নিয়ে যাচ্ছেন হাওড়ার প্রত্যন্ত গ্রামের চাষিরা। গোটা হাওড়া জেলা জুড়েই এই মাছের চাষ বেড়েছে। যখন শুরু করেছিলাম ২০ বছর আগে, তখন জনা কয়েক লোক ছিল এই ব্যবসায়, আর আজ সংখ্যাটা অনেক বেড়েছে, এটা দেখেও ভালো লাগছে। এখান থেকে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশে আমাদের চাষ করা মাছ রফতানি হয়।”

উলুবেড়়িয়া দুই নম্বর ব্লকের বাসিন্দা সাবির মোল্লা ও তাঁর ছেলে সিরাজুল ও পেশায় মাছচাষি। তাঁরাও হাওড়ার বালি, দাশনগর ও ডোমজুড় থেকে রঙিন মাছের চারা এনে নিজেদের বাড়িতেই চাষ করেন। সাবির মোল্লা বলছেন, “বিগত এক বছর ধরে রঙিন মাছের চাষ করছি বাড়িতেই। ৮০ হাজার টাকায় প্রায় ৪ লক্ষ রঙিন মাছের চারা কিনে চার মাস পরে তা প্রায় ১২ লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়েছে। চাষের সব খরচ বাদ দিয়েও হাতে রয়েছে ৫ লক্ষ টাকা।”

মানুষ আবেগের গোলাম। সেই ছোট্ট রিয়ার আবেগ, রিয়ার মতো আরো অনেক মানুষের আবেগ, কোথাও ঘরে একুরিয়াম রাখলে সংসারে শুভ হও এই রকম অনেক কারন আজ এই মাছের চাহিদাকে বাড়িয়ে যাচ্ছে। যার ফলশ্রুতি বাড়ছে নতুন কর্মসংস্থানের পথ। বেকার যুবকদের নিজের পায়ে দাঁড়াবার রাস্তা খুলছে। যা আগামীদিনেও আরো অনেক পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবে।

সম্পর্কিত সংবাদ