হাওড়ার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের স্বপ্নের বাড়ি আটকে দিয়েছে প্রকল্পের প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত জমির অপ্রতুলতাই

Spread the love
  • 6
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    6
    Shares

রাজীব মুখার্জী, হাওড়াঃ  প্রায় একশো বছর আগে ঠাকুর বলেছিলেন “টাকা মাটি, মাটি টাকা “। সারা রাজ্যে হালফিলের জমি মাফিয়াদের দৌরাত্বে সাধারণ মানুষ তটস্থ। জমি কিনে ফেলে রাখলে বছরের পর বছর সেখানে ভুঁই ফর নেতা ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গদের থেকে ফেলে রাখা জমির দখল ফিরে পাওয়া একটা দুঃসাধ্য কাজ এই মুহূর্তে এই রাজ্যে। জমি কিনে বাড়ি তৈরি করতে গেলে এ দাদা সে দাদাদের মদতে চলা সিন্ডিকেট রাজ নিয়ে রাজ্যবাসির জেরবার হওয়ার অবস্থা। একইভাবে জেরবার খোদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্নের ঘোষিত পরিকল্পনা “নিজশ্রী প্রকল্প “। না এখানে দোষী সিন্ডিকেটরাজ নয় বা অসাধু প্রোমোটার চক্র বা জমি মাফিয়ারাও নয়। এখানে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমির অপ্রতুলতাই। মুখ্যমন্ত্রীর সাধের এই প্রকল্পকে বাস্তবায়িত করতে এখন হিমশিম খাচ্ছেন সেচ দফতর, পূর্ত দফতর ও বিশেষ করে মুখ্যমন্ত্রীর খুব কাছের স্নেহধন্য ফিরহাদ হাকিমের আবাসন দফতর। পর্যাপ্ত জমির অভাবের জমিজটে হাওড়া জেলাতে থমকে দাঁড়িয়েছে “নিজশ্রী প্রকল্প”।

“প্রধানমন্ত্রী আবাসন যোজনা ২০১৮” কে সামনে রেখে রাজ্য সরকার ক্যাবিনেট মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ঘোষণা করেছিলেন ২০ শে জুন ২০১৮ তে “নিজশ্রী প্রকল্প “। “নিজশ্রী” প্রকল্পে সরকারি জমিতে দুই ধরনের ফ্ল্যাট তৈরি করার ঘোষণা করা হয়েছিল। এক শয্যাকক্ষ বিশিষ্ট ফ্ল্যাটের আয়তন হবে ৩৭৮ বর্গফুট (কার্পেট এরিয়া) এবং দুই শয্যাকক্ষ বিশিষ্ট ফ্ল্যাটগুলি হবে ৫৫৯ বর্গফুট (কার্পেট এরিয়া) আয়তনের। এক শয্যাকক্ষ বিশিষ্ট ফ্ল্যাটের দাম স্থির করা হয়েছিল ৭ লক্ষ ২৪ হাজার টাকা এবং দুই শয্যাকক্ষের ফ্ল্যাটের দাম ধার্য করা হয়েছিল ৯ লক্ষ ২৬ হাজার টাকা, ঘোষণার সময় জানানো হয়েছিল কলকাতা পুরসভা, পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর, সমস্ত জেলাভিত্তিক বিভিন্ন পুরসভা, পঞ্চায়েত বা উন্নয়ন পর্ষদগুলির তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠার কথা পাঁচতলার এক-একটি আবাসন। তবে এই আবাসনগুলিতে লিফটের সুবিধা থাকবে না। এই প্রকল্প মূলত যাঁদের মাসিক আয় ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে, তাঁদের জন্যই এই প্রকল্পের কথা ভাবা হয়েছিল।

মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষেরা এ বার নিজের ফ্ল্যাটের মালিক হওয়ার সুযোগ পাবেন। এই প্রকল্পে দলিল দেওয়া হবে উপভোক্তার নামেই’’।এর আগে ২০১৭ সালেই সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা বস্তিতে “বাংলার বাড়ি” প্রকল্প তৈরির কথা ঘোষণা করেছিল রাজ্য সরকার। সেখানে ৫০ হাজার টাকা খরচ করলে সংশ্লিষ্ট বস্তিবাসীকে ২৫৮ বর্গফুটের ফ্ল্যাট দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সেই প্রকল্পকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী এই “নিজশ্রী প্রকল্প ” দিয়ে। এখন মুখ্যমন্ত্রীর এই সাধের প্রকল্পই হাওড়া জেলায় মাঠে মারা যেতে বসেছে শুধুমাত্র পর্যাপ্ত জমির অভাবেই।

হাওড়ার গ্রামীণ প্রশাসন সূত্রের খবর, এই প্রকল্পে একটি আবাসনের জন্য ন্যূনতম দশ কাঠা জমির প্রয়োজন হবে এবং সেখানে পাঁচতলা ভবন তৈরি হওয়ার কথা কিন্তু হাওড়া জেলায় এক লপ্তে ১০ কাঠা জমি জোগাড় করা সমস্যা হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। মাত্র মাস ছয়েক আগে “নিজশ্রী” নামে প্রকল্পটি চা‌লু করেছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই প্রকল্পে দাম পড়ার কথা কমবেশি ১৯০০ টাকা প্রতি বর্গফুটে। অসংগঠিত শ্রমিক ও চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক যাদের মাসিক আয় ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং এমন অনেক সরকারি ও বেসরকারি কর্মী এবং প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকদের জন্যই প্রকল্পটি বলে জেলা প্রশাসন সূত্রের খবর। এই প্রকল্পটি হওয়ার কথা পঞ্চায়েত এলাকায় কারন শহরে এতো জমি নেই।

এই প্রকল্পটি চালু হওয়ার পরেই জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে ১৪ টি ব্লককে জমি জোগাড় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং এই ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিতে বলা হয় সরকারি খাস জমির দিকেই কিন্তু সমস্যায় পড়েন ব্লক প্রশাসনের কর্তারা নিজেরাই। তাঁরা ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরের ল্যান্ড ব্যাঙ্কে জমি চেয়েছিলেন। দেখা যাচ্ছে এক লপ্তে ১০ কাঠা জমি কার্যত কোথাও নেই হাওড়া গ্রামীণ এলাকাতে।


স্থানীয় প্রশাসনের কর্তারা বলছেন, কিছু ব্লকে সেচ দফতরের অধীনে সরকারি জমি রয়েছে কিন্তু তা “চর” হিসাবে চিহ্নিত করা আছে তাই আইনত সেখানে আবাসন প্রকল্প গড়া সম্ভবনা নয়। আবার পূর্ত (সড়ক) দফতরের অধীনেও কিছু জমি রয়েছে কিন্তু সেই জমিও পূর্ত দফতরেরই বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ হয়ে আছে বলে ওই দফতর থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ কয়েকটি ব্লকে আবার অন্য অভিজ্ঞতা হয়েছে ব্লক প্রশাসনের কর্তাদের।

বাগনানের একটি ব্লকের আধিকারিকরা জানান, ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতর থেকে তাঁদের প্রায় ৪ একর খাস জমির কাগজপত্র দিয়েছিল কিন্তু বাস্তবে সেই জায়গায় গিয়ে দেখা যায়, “নিজ ভূমি নিজ গৃহ” প্রকল্পে তা আগেই পাট্টা দেওয়া হয়েছে ভূমিহীনদের ও গীতাঞ্জলি প্রকল্পে তাঁদের বাড়িও তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।

ব্লক আধিকারিকেরা জানাচ্ছেন, জমি ব্যবহার হয়ে গেলেও ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরে রেকর্ড পরিবর্তন হয়নি। এখনো তা সরকারি রেকর্ডে খাস জমি হিসাবেই দেখানো হচ্ছে। কয়েকটি ব্লক থেকে আবার জমি কেনার জন্যও জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে পরামর্শ চাওয়া হয়েছে কিন্তু হাওড়া জেলায় জমির দাম অনেক বেশি তাই ১০ কাঠা জমি কিনতে যে পরিমাণ টাকা লাগবে তা আবাসন দফতর দিতে রাজি নয় এমনটাই জানিয়েছেন জেলা প্রশাসনের কর্তাদের অনেকেই।

হাওড়া জেলা প্রশাসনের কর্তাদের একাংশ জানাচ্ছেন, এই জেলায় এমনিতেই খাস জমির পরিমাণ কম, তার উপরে “নিজ ভূমি নিজ গৃহ” প্রকল্পে প্রায় সব খাস জমি ভূমিহীনদের মধ্যে বিলি করে দেওয়া হয়েছে আগেই তাই যে জমি পড়ে আছে তা খন্ডে খন্ডে বিভক্ত। তাতে এই আবাসন প্রকল্পে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। জেলা প্রশাসনের ওই কর্তাদের বক্তব্য, প্রকল্পটি চালু হলেও তা হাওড়া জেলায় তা কতটা সফল হবে তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ থেকেই যাচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের এক পদস্থ কর্তা অবশ্য বলেছেন, ‘‘বাগনান ১ ও ২ নম্বর ব্লক এবং ডোমজুড়ে কিছুটা জমি পাওয়া গিয়েছে, এটা আশার কথা। বাকি ব্লকগুলিতেও তন্ন তন্ন করে জমি খোঁজা হচ্ছে।’’ তাই জেলায় প্রকল্প নিয়ে অসুবিধা হবে না বলেও তাঁর দাবি। তবে দাবি যাই হোক না কেনো বাস্তব চিত্র যা দেখা যাচ্ছে তাতে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়ের মেঘ আদৌ কাটবে কিনা সেটা কেউ জোর গলাতে বলতে পারছেন না। তবু এর মধ্যে নিজের মাথার উপরে এক চিলতে ছাদের স্বপ্ন নিয়ে বুক বেঁধে আছেন হাওড়া জেলার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষেরা।

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment