গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জের, খুন করেই খুনের প্রতিশোধ

Spread the love
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

রাজীব মুখার্জী, উলুবেড়িয়া, হাওড়াঃ উলুবেড়িয়ার জাহানারা জয়পুর ঘোড়াবেড়িয়া-চিৎনানপুরের প্রাক্তন পঞ্চায়েত প্রধানের স্বামীকে খুনের অভিযোগ উঠল বর্তমান প্রধানের স্বামী বাপী মল্লিকের বিরুদ্ধে। ২৩শে অক্টোবর অর্থাৎ গত মঙ্গলবার রাতে এই ঘটনাটি ঘটে। মৃতের নাম শেখ ইমতিয়াজ। বয়স আনুমানিক ৪৫- এর কোটায়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি এক তৃণমূল নেতা ও তাঁর ভাইকে খুনের ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তার করে উলুবেড়িয়া থানার পুলিশ। কয়েকদিন আগে তিনি কোর্ট থেকে জামিন পেয়ে বাহির গঙ্গারামপুরে স্ত্রীকে নিয়ে ঘর ভাড়া করে থাকছিলেন। তাঁর স্ত্রী জাহানারা শেখের অভিযোগ, মঙ্গলবার রাত ১১টা নাগাদ তাঁরা বাড়ি ফেরার সময় রাস্তাতেই কয়েকজন দুষ্কৃতী এসে তাদেরকে ঘিরে ধরে। তার মধ্যে একজন খুব কাছ থেকে ইমতিয়াজ কে গুলি করে। গুলিটি ইমতিয়াজের পাঁজরে লাগে। সেখানেই লুটিয়ে পরে ইমতিয়াজ। এরপর স্থানীয় উলুবেড়িয়া মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

এই ঘটনার পরের দিনই পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা করেন প্রাক্তন পঞ্চায়েত প্রধান জাহানারা শেখ, তিনি অভিযোগে জানিয়েছেন, “আমাদের পঞ্চায়েতের বর্তমান প্রধান সাবিনা বেগমের স্বামী বাপি মল্লিকের নেতৃত্বেই এ দিন আক্রমণ করেছিল দুষ্কৃতীরা। এবং বাপি নিজেই গুলি করে ইমতিয়াজকে। তারপর শূন্যে গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালিয়ে যায়। আমি নিজে এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী”।

ঘটনার পরে থানায় এফ. আই. আর. হওয়ার পরেও অভিযুক্ত বাপী মল্লিক অবশ্য এখনো তার এলাকাতে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং ২৪ শে অক্টোবর বাপি খুব জোর গলায় দাবি করেছেন, ‘‘আমি তো আমার বাড়িতেই রয়েছি। ইমতিয়াজ গ্রামে ফিরেছে কিনা তাও বলতে পারব না। আমার বা আমার দলের কেউ এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত নয়। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ জাহানারা শেখ করেছেন সেটা উদ্দেশ্যোপ্রণোদিত। জানি না এই সব কে বা কারা করল!’’

অপরদিকে ঘটনার দিন রাতেই ইমতিয়াজকে হাসপাতালে আনার পরই এলাকাতে পুলিশি প্রহরার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এখনো পর্যন্ত ওই এলাকায় র‌্যাফ মোতায়েন করা আছে। এই ঘটনার বিষয়ে হাওড়া গ্রামীণ জেলা পুলিশের এক কর্তা বলেন, ‘‘আমরা তদন্ত শুরু করেছি। অভিযুক্তদের খোঁজে তল্লাশি শুরু হয়েছে।’’ যদিও তৃণমূলের জেলা ও স্থানীয় স্তরের নেতারাও এ বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছেন সংবাদ মাধ্যমের কাছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, ২০১৭ সালের ২১শে আগস্ট ঘোড়াবেড়িয়ায় তার বাড়ির সামনেই কুপিয়ে এবং গুলি করে খুন করা হয়েছিল স্থানীয় তৃণমূল নেতা শেখ সাজাহান ও তাঁর ভাই শেখ লালচাঁদকে। প্রসঙ্গত সেই ঘটনায় ইমতিয়াজ, তাঁর দুই ছেলে সহ ১৮ জনকে গ্রেফতার করেছিল উলুবেড়িয়া থানা। দিন ১৫ আগে সেই মামলাতেই জামিন পেয়েছিলেন নিহত ইমতিয়াজ কিন্তু ঘোড়াবেড়িয়া গ্রামের বাড়িতে আর ফেরেননি তিনি নিরাপত্তার অভাবে তাই সে তার স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া বাড়িতেই থাকছিলেন। বুধবার রাত পর্যন্ত জয়পুরের ঘোড়াবেড়িয়া-চিৎনান পঞ্চায়েতের তৃণমূল নেতা ইমতিয়াজ শেখ খুনের ঘটনায় অভিযুক্তদের কাউকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেনি। স্থানীয় লোকেরা বলছেন তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরে ইমতিয়াজ খুন হন বলে অভিযোগ। স্থানীয় তৃণমূল নেতা শেখ সাজাহান ও তাঁর ভাই শেখ লালচাঁদের খুনের প্রতিশোধ নিতেই এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলছেন স্থানীয় মানুষেরা। এমনকি ২৪শে অক্টোবর সন্ধ্যেবেলা ময়নাতদন্তের শেষে গ্রামের বাড়িতে দেহ আনতে গিয়ে গ্রামবাসীদের একাংশ বাধা দেয় নিহতের পরিবারের লোকেদেরকে। এই নিয়ে উত্তেজনা ছড়ানোয় শেষ পর্যন্ত পুলিশ দেহটি উলুবেড়িয়ায় সর্বসাধারণের ব্যবহার্য কবরখানায় কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করে। 

পুলিশ ইমতিয়াজের পরিবারকে জানায়, দেহ তাঁরা যেন ঘোড়াবেড়িয়ায় না নিয়ে যান। এতে ক্ষুব্ধ ইমতিয়াজের ভাই শেখ শাহ আলম বলেন, ‘‘একেই পুলিশ খুনিদের ধরতে পারল না, তার উপরে জন্মস্থানে দাদা কবর পেলেন না। পুলিশ প্রহরায় দাদার দেহ গ্রামে নিয়ে যাওয়া যেত। শাসকদলের চাপের কাছে পুলিশ নতিস্বীকার করল।’’

গ্রামীণ জেলা পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, অশান্তি এড়াতেই দেহ কবর দেওয়ার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়েই যে এই খুনের ঘটনা, তা স্বীকার করেন জেলা পুলিশ কর্তাদের একাংশও। তাঁদের বক্তব্য, প্রাথমিক তদন্তে খুনের কিছু উদ্দেশ্য পাওয়া গিয়েছে। তা মূলত রাজনৈতিক।

এক্ষেত্রে জেলা (গ্রামীণ) পুলিশ সুপার গৌরব শর্মা বলেন, ‘‘তদন্তে সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দোষীদের অবশ্যই গ্রেপ্তার করা হবে।’’ তবে, গ্রামীণ জেলা তৃণমূল সভাপতি পুলক রায়ের দাবি, ‘‘এইসব অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে রাজনীতির কোনও যোগ নেই। এই ঘটনা গ্রাম্য বিবাদের জন্যই হয়েছে। ’’

গ্রামবাসীদের একাংশ এবং তৃণমূলের সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সাল পর্যন্ত ইমতিয়াজ ছিলেন ঘোড়াবেড়িয়া-চিৎনান পঞ্চায়েতের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা। তখন তিনি কংগ্রেসে ছিলেন। তাঁর স্ত্রী জাহানারা ওই বছর নির্বাচনে জিতে প্রধান হন। পরের বছর ইমতিয়াজ তৃণমূলে যোগ দেন। এরপরেই তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর বিরোধ বাধে। 2013 সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে তাঁর স্ত্রী জিতলেও প্রধান হন বাপি মল্লিকের স্ত্রী সাবিনা। এর মধ্যে এলাকায় বালা এবং বিলু নামে দুই দুষ্কৃতীর উত্থান হয়েছে। সম্পর্কে তারা দুই ভাই। তারা তৃণমূলের মদতেই তোলাবাজি করে বলে অভিযোগ। পুলিশি অভিযানে তারা এলাকাছাড়া এই মুহূর্তে। বালা ও বিলু চলে যাওয়ায় এলাকায় রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কে করবেন তা নিয়ে ইমতিয়াজ, বাপি মল্লিক এবং শেখ শাজাহানের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়।

প্রসঙ্গত গ্রামবাসীদেরই অভিযোগ, ইমতিয়াজের নেতৃত্বেই শেখ শাজাহান এবং লালচাঁদকে খুন করা হয়েছে। বালা ও বিলুও ওই জোড়া খুনের ঘটনায় যুক্ত থাকতে পারে। তাই জামিন পেয়েও ইমতিয়াজ বাহির গঙ্গারামপুরে ঘরভাড়া করে স্ত্রী এবং তিন ছেলেকে নিয়ে থাকতেন। তাঁর স্ত্রী জাহানারার অভিযোগ, ‘‘স্বামী দীর্ঘদিন এলাকা ছাড়া থাকায় বাপি একা চুটিয়ে রাজত্ব করছিল। স্বামী জামিন পাওয়ায় বাপি এলাকায় তার প্রভাব কমার আশঙ্কা করছিল। সেই ভয়েই ও ওকে খুন করেছে। ’’ গ্রামবাসী এবং তৃণমূল কর্মীদের একাংশও জাহানারার বক্তব্যে সায় দেন।

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment