সাঁতরাগাছি স্টেশনে তড়িঘড়ি ঘোষণার শিকার যাত্রীরা, হারালো দুটি তরতাজা প্রাণ

Spread the love
  • 48
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    48
    Shares

 

রাজীব মুখার্জী, মণি শঙ্কর বিশ্বাস, সাঁতরাগাছি, হাওড়াঃ তড়িঘড়ি ঘোষণার স্বীকার হলেন তরতাজা দুটি প্রাণ। ২৩শে অক্টোবর, মঙ্গলবার সন্ধ্যাবেলায় নিত্যদিনের মতোই ভিড় ছিল সাঁতরাগাছি স্টেশন জুড়ে। একে তো বাড়ি ফেরার তাড়া, কারণ কাল যে লক্ষ্মী পুজা। বাজার করে সাথে নিয়ে ফিরছিলেন অনেকের মধ্যে এক নিহত এক জন্য ব্যক্তি। প্রতক্ষ্যদর্শী স্থানীয় চায়ের দোকানের মালিক তরুণ বাবু জানান “সময় টা আনুমানিক ৫.৪৫ মিনিট হবে। রেলের মাইকে ঘোষণা করা হয়ে নাগেরকয়াল-শালিমার এক্সপ্রেস ৫ নম্বর প্লাটফর্মে আসছে, সাথে সাথেই ঘোষণা আপ ব্যান্ডেল লোকাল ১ নম্বর প্লাটফর্মে আসছে, আবার ঘোষণা ৩ নম্বর প্লাটফর্ম দিয়ে থ্রু ট্রেন যাবে। পরপর তিনটে ঘোষণা তে মানুষের হুড়োহুড়ি। ফুটব্রিজ থেকে চিৎকার চেঁচা মিচির আওয়াজ শুনে উপরে তাকালাম। দেখলাম দাদা জনস্রোত নামছে। তখনো বুঝিনি যে দাদা এই রকম একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটবে। খদ্দেরের থেকে চায়ের পয়সা নিতে গিয়ে শুনলাম উপর থেকে বাঁচানোর আর্ত চিৎকার। অনেকেই দৌড়ে উপরে গেলাম। দেখি দুটো দেহ পরে আছে ফুট ব্রিজের উপরে। যখন জানলাম দুজনই মৃত তখন বুঝলাম মানুষ কত স্বার্থপর শুধু নিজেরটাই বোঝে। দেখলাম ঐ দেহ দুটির উপর দিয়েই দৌড়ে চলেছে অসংখ মানুষ।”

সাঁতরাগাছি স্টেশনে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে ২ জনের। আহত হয়েছেন কমপক্ষে বেসরকারি মতে ৩৫ জনের উপরে। আহতদের হাওড়া হসপিটালে ভর্তি করা হয়েছে। মৃত দেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছে মল্লিক ফটকের মর্গে সনাক্তকরণের জন্য। সাঁতরাগাছি জি. আর. পি. সূত্রের খবর, আহতদের মধ্যে রয়েছে বেশ কয়েকজন শিশুও। প্রথমে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় সাঁতরাগাছি রেল হাসপাতালে। তারপর সেখান থেকে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় হাওড়া জেলা হাসপাতালে। জানা গিয়েছে, ৩৫ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন, ১২ জন। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসার পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। এদের মধ্যে রয়েছেন ৫ জন মহিলা। আহতদের মধ্যে এক জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গিয়েছে রেল হাসপাতাল সূত্রে। স্টেশনে তীব্র ভিড় থাকায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন বেশ কয়েকজন। চিকিৎসার জন্য দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁদের কেও। ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে রেল পুলিশ, জিআরপি এবং জগাছা থানার পুলিশ।

এদিকে দূর্গা পূজার কার্নিভাল থেকে ফেরার পথে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাথে ছিলেন হাওড়া জেলার দায়িত্বে থাকা ফিরহাদ হাকিম, সুরজিৎ কর পুরকায়স্থ এবং ডিজি বীরেন্দ্র। ঘটনাস্থল থেকেই মুখ্যমন্ত্রী মৃতদের পরিবারের জন্য ৫ লক্ষ এবং গুরতর আহতদের জন্য ১ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছেন। অপরদিকে রেলের তরফেও ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হয়েছে। মৃত ব্যক্তিদের ৫ লাখ টাকা, গুরুতর আহতদের ১ লাখ আর সামান্য আহতদের ৫০ হাজার করে।

“আমি নিজেও রেলমন্ত্রী ছিলাম তাই বলছি, রেলকে আরও দায়িত্ববান হয়ে কাজ করতে হবে”- মুখ্যমন্ত্রী

এই ঘটনা প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, রাজ্য সরকারের তরফে এই ঘটনার একটি তদন্ত করা হবে। খতিয়ে দেখা হবে ঠিক কী কারনে এই দুর্ঘটনা ঘটল এইদিন। এ দিন ট্রেনের ঘোষণা বিভ্রাট প্রসঙ্গে খানিকটা উষ্মাও প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী নিজেও। বলেন, “প্ল্যাটফর্ম চেঞ্জ করলে যাত্রীদের সবসময় একটা নূন্যতম সময় দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তাঁরা সঠিক ভাবে প্ল্যাটফর্ম চেঞ্জ করতে পারেন। তার বদলে এভাবে তাড়াহুড়ো করে কেন ঘোষণা করল সেটা রেলই বলতে পারবে। যিনি এই ঘোষণার দায়িত্ব পালন করছিলেন তাঁকে আরো সতর্ক হওয়া উচিৎ ছিল। তাহলে এই দুর্ঘটনা এড়ানো যেত।”  মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “দু’জন মারা গিয়েছেন। এটা খবই দুর্ভাগ্যজনক। কোথাও একটা কো-অর্ডিনেশন গ্যাপ তৈরি হচ্ছে। রেলকে আরও দায়িত্ববান হতে হবে।” তিনি বলেন, “পরপর বেশ কয়েক জায়গায় এমন ঘটনা ঘটল। লক্ষ লক্ষ মানুষ রোজ ট্রেনে যাতায়াত করেন। আমি নিজেও রেলমন্ত্রী ছিলাম। কাজ করে এসেছি। রেল আমারও পরিবারের মতোই। তাই বলছি, রেলকে আরও দায়িত্ববান হয়ে কাজ করতে হবে।”

আহতদের দেখতে হাসপাতালে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী

প্রসঙ্গত এই দুর্ঘটনা সম্পর্কে জানাজানি হওয়ার পর থেকে অনেক যাত্রীর বাড়ীর লোকজন তাদের আত্মীয় পরিজনের খোঁজ নিতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন ইতিমধ্যেই। তাই এদিনের এই দুর্ঘটনার জন্য দক্ষিণ পূর্ব রেলের তরফে অবশ্য আহতদের খোঁজে নেওয়ার জন্য দুটি আপৎকালীন নম্বর দেওয়া হয়েছে। নম্বর দুটি হলো খড়্গপুরের জন্য 032221072 ও সাঁতরাগাছির জন্য 033-26295561। অপরদিকে নবান্নেও একটি হেল্প লাইন খোলা হয়েছে এই মুহুর্ত থেকে 033-2641-3393। আহতদের দেখতে হাসপাতালে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

সম্পর্কিত সংবাদ