হাওড়া জেলায় প্রতিমা নিরঞ্জনের প্রস্তুতি প্রক্রিয়া

Spread the love
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

রাজীব মুখার্জী, হাওড়াঃ য়া দেবী সর্বভূতেষু….. দুর্গা খুব সুখের ব্যাপার নয় বরং সংস্কৃত অর্থ ধরলে দূর্গা পূজার সময়টাকে “সে বড় সুখের সময় নয়” বলা যায়। সংস্কৃত থেকে অর্থ করলে দুর্গা শব্দের মানে দাঁড়ায় যাকে অতি দুঃখে বা কঠিন সময়ে পাশে পাওয়া যায় এবং যে দেবীকে পেতে কঠিন সাধনা করতে হয়। এর আরেকটি অর্থ যা কিছু সৃষ্টি তা পঞ্চ ভূতেই বিলীন হয়। প্রাক দূর্গা পূজার প্রায় তিন মাস ধরে মৃৎশিল্পীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে উঠেছিলো যে উৎকৃষ্ট শৈল্পিক রূপ মায়ের সেই প্রতিমাও আজ সেই পঞ্চ ভূতেই বিলীন হওয়ার পালা। সেই মা কে নিয়েই দেবী পক্ষ থেকে চক্ষু দান, বোধন, সন্ধি পুজোর মধ্যে দিয়ে তাঁর আবাহনে মেতেছিলো উৎসবে আপামর বাঙালি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষেরাও, আজ দেবীর ফিরে যাওয়ার প্রাক মুহূর্তে আবার একটি বছরের অপেক্ষায় বাঙালির মন ভারাক্রান্ত ও বিসর্জনের প্রস্তুতিতে রয়েছে মনের কোনে একটি বিষাদের সুর। তবু প্রাণের চেয়ে প্রিয় দেবী দূর্গা কে আবার আসার আকুল মিনতি অন্তরে নিয়ে শুরু হয়ে তাকে এই বছরের মতো বিদায় জানানোর পালা। সেই প্রয়াসের কর্ম ব্যাস্ততার ছবি সর্বত্র। পুজো উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে পুলিশ, প্রশাসন সকলের মধ্যেই এখন ব্যাস্ততা তুঙ্গে। সেই প্রস্তুতির ছবিটাই আমরা তুলে ধরছি আমাদের পাঠকদের জন্য। গত বছরের মতো এই বছরেও হাওড়া জেলাতে বিশেষ করে হাওড়া শহর এলাকার মধ্যে যে ১৩ টি প্রতিমা বিসর্জনের জন্য চিহ্নিত রয়েছে সেখানে কলকাতার ধাঁচেই গত বছরের মতোই বিসর্জনের পর দ্রুত প্রতিমার কাঠামো তুলে নিতে হাওড়ার ঘাট গুলিতে ক্রেন বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে হাওড়া পুর নিগম, এমনটাই জানাচ্ছেন মেয়র রথীন চক্রবর্তী।

হাওড়া শহর এলাকার মুখ্য ঘাট গুলো হলো- 
১) বাঁধা ঘাট
২) ফুলতলা ঘাট
৩) ছাতুবাবুর ঘাট
৪) চাউল পট্টি ঘাট
৫) রামকৃষ্ণপুর ঘাট
৬) শিবপুর ঘাট
৭) বোট্যানিক গার্ডেন ঘাট
৮) নাজিরগঞ্জ ঘাট 

মূলত শহরের এই ঘাট গুলিতেই প্রতিমা নিরঞ্জন হয়। নিগম সূত্রের খবর, বিসর্জনের দিনগুলিতে ঘাটে এ বার মোতায়েন থাকবেন ৫০ জন পুরকর্মী। মেয়র জানান “প্রতি বছর বিসর্জনের সময় জল এবং গঙ্গাপাড় পরিষ্কার রাখার জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয় পুর নিগমের পক্ষ থেকে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হবে না। বরং কী ভাবে গঙ্গা দূষণ রোধে আরও আধুনিক পদক্ষেপ করা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছি। এ নিয়ে সিটি পুলিশের সঙ্গে আরও একটি বৈঠক করেছি আমরা। এই বছরও কে. এম. ডি. এর কাছ থেকে ক্রেন নেওয়া হচ্ছে প্রতিমার কাঠামো গঙ্গা বক্ষ থেকে তুলে আনার জন্য। যাতে কলকাতার ঘাটের মতো প্রতিমা গঙ্গার ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই জল থেকে তুলে ফেলা যায়। সব থেকে বেশি প্রতিমার ভাসান হয় রামকৃষ্ণপুর ঘাটে। ক্রেন পাওয়া গেল সেটা ওই ঘাটেই বসানো হবে।”

প্রসঙ্গত কলকাতার বাদে কদমতলা সহ বেশ কয়েকটি ঘাটে বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গে জল থেকে তুলে নেওয়া হয় প্রতিমার কাঠামো। আগে হাতে করে কাঠামো তুলে আনতে অনেকটা সময় লেগে যেত। সেই সময়ের মধ্যে জলে ভিজে কাঠামো থেকে প্রতিমার মাটি-রং গলে মিশে যেত গঙ্গায়। মেয়র বলেন, “ক্রেন থাকলে গঙ্গার দূষণ রোধ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি কমানো যাবে খরচও। অন্য বছরের মতো এ বারও ফুল-সহ বিসর্জনের বর্জ্য ফেলার জন্য ঘাটে থাকবে আলাদা আলাদা পাত্র। প্রতিটি ঘাটে পুরসভার সাফাই কর্মী, হাওড়া সিটি পুলিশের কর্মীরাও থাকবেন।”

এ বিষয়ে হাওড়া সিটি পুলিশের কমিশনার তন্ময় রায় চৌধুরী বলেন, “কেউ যাতে গঙ্গায় ডুবে না যান, শহরের ঘাটগুলিতে তার জন্য কলকাতা রিভার ট্র্যাফিক পুলিশের নৌকা ও ডুবরির বন্দোবস্ত রাখা হচ্ছে। সাথে রাখা হচ্ছে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যদের। যাতে কোনো রকম দুর্ঘটনা ঘটলেই তার মোকাবিলা করা সম্ভব হয়। ” এছাড়াও ঘাটে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার পাশাপাশি থাকবে ওয়াচ-টাওয়ারও।

হাওড়া সিটি পুলিশের পক্ষ থেকে বিসর্জনের বিধি নির্ধারিত করা হয়েছে
১) পুজোর অনুমতি নেওয়া কালীন যে নির্দিষ্ট রুট পূজা কমিটি দিয়েছিলেন সেই রুটেই বিসর্জনের শোভাযাত্রা করতে হবে।
২) পুজো কমিটির শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া গাড়ি , ব্যান্ড, আলোর গেট, তাসাপার্টি, মাইক ও জেনেরেটার ভ্যান ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে নির্দিষ্ট রুট দিয়েই। শোভাযাত্রার সাথে আসা সব খালি গাড়িগুলিকেও মানতে হবে এই নিয়ম। 
৩) পুজোর ভাসানের শোভাযাত্রায় যেকোনো ডিজে ও আতসবাজি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। 
৪) গঙ্গার ঘাট পর্যন্ত প্রতিমার সঙ্গে শুধুমাত্র পুজোর উপকরণের গাড়ি, ঢাকি ও আলোর গাড়ি যেতে পারবে, বাকি গাড়ি কে ঘাট অব্দি যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।

এমনকি ফুল, বেলপাতা-সহ পুজোর আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত সামগ্রী নদী বা জলাশয়ে না ফেলার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। দুর্গাপুজোর প্রতিমা নিরঞ্জন ঘিরে আঁটোসাঁটো নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকছে গঙ্গার ঘাটগুলিতে। বিসর্জনের সময় ডি. জে. অথবা তারস্বরে মাইক বাজানোয় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে হাওড়া সিটি পুলিশ। এই বছর প্রতিমা নিরঞ্জনের জন্য চার দিন ধার্য করা হয়েছে। ১৯শে অক্টোবর থেকে আগামী ২২শে অক্টোবর অর্থাৎ সোমবার পর্যন্ত প্রতিমা নিরঞ্জনের পর্ব চলবে। বিসর্জনের দিনগুলিতে হাওড়া গ্রামীণ এলাকাতে স্থানীয় ‌বিভিন্ন ঝিল এবং বড় পুকুরেও বিসর্জন করা যাবে। প্রতিমা নিরঞ্জনের পরে স্থানীয় প্রশাসন থেকে কাঠামো তুলে আনার কোথায় বলেছেন হাওড়া গ্রামীণ পুলিশের পক্ষ থেকে। নিরাপত্তার কারণে সেখানে মোতায়েন থাকবে পুলিশ।

হাওড়া পুরো নিগম সূত্রে খবর, বাড়ি ও বারোয়ারি মিলিয়ে হাওড়া শহরে প্রায় ৭৫১টির কাছাকাছি পুজো হয়। প্রতিটি বিসর্জনের পরে কাঠামো যাতে গঙ্গায় না চলে যায়, তা রুখতে গঙ্গায় দড়ির জাল লাগানোর চিন্তাভাবনা রয়েছে হাওড়া সিটি পুলিশের। নিরঞ্জন পর্ব শেষ হলেই দ্রুত কাঠামো পাড়ে তুলে নেওয়া হবে। সারা রাতই বিসর্জন চলে। তাই ঘাটগুলিতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment