মহালয়ার বিশেষ প্রতিবেদনঃ মা হওয়া কি এতই সোজা?

Spread the love
  • 126
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    126
    Shares

রাজীব মুখার্জী ও মণিশঙ্কর বিশ্বাস, মল্লিক ফটক, হাওড়াঃ সারা বছর ধরে রাস্তায় হামেসাই দেখা যায় নানা হোর্ডিং, ব্যানার। কিন্তু পুজোর সময় সেটা আরও সংখ্যায় বৃদ্ধি পায়। মোড়ে মোড়ে দেখা যায় বিভিন্ন ধরনের হোর্ডিং বা ব্যানার। ৮ই অক্টোবর বেঙ্গলটুডের সাংবাদিকরা যখন খবর সংগ্রহের তাগিদে রাস্তায়, তখন হঠাৎ-ই চোখে পড়ে একটি দোকানের হোর্ডিং, যা দেখে বলা যেতেই পারে নতুনত্ব ও ব্যতিক্রমী সম্পূর্ণতায় ভরা। “ঘোষাল অ্যান্ড ডটার”, নামে একটি মিষ্টির দোকান। এতদিন রাস্তায় হামেশাই সকলের চোখে পড়েছে নিশ্চয় “অমুক অ্যান্ড সন্স” কিংবা “তমুক অ্যান্ড সন্স”, কিন্তু নাম কিংবা পদবির সাথে “ডটার” লেখা যে দেখা যায় না তা প্রায় হলপ করে বলা যেতে পারে। স্বাভাবিকই কৌতুহলবসত সাতপাঁচ না ভেবেই সোজা ঢুকে পরা হল দোকানের ভেতরে। দোকানের কর্মচারীর থেকে দোকানের বিষয় জানতে চাইলে, সে বলে,”এই দোকানের মালকিন যিনি, ম্যাডামের নম্বর দিচ্ছি কথা বলেন নিন কারণ উনি তো এখন দোকানে নেই।” যথারীতি যেমন কথা তেমনই কাজ, ম্যাডামের সাথেই ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “একটু থাকুন আসছি আমি দোকানে।”


বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর উনি দোকানে আসেন, নমস্কার জানিয়ে বললেন “আমি সুতপা ঘোষাল, আমার সাথেই কথা হয়েছিল ফোনে।” কথার শুরুতেই জিজ্ঞেস করা হয় তাকে “ঘোষাল এন্ড ডটার” কথাটার বিষয়। এমনকি এটা কতদিনের পুরানো দোকান? তাও জানতে চাওয়া হয়ে সুতপা দেবীর কাছ থেকে, উত্তরে তিনি বললেন, “আগে একটু মিষ্টি খান তারপর বাকি কথা।” একে তো সারাটা দিন ধরে এই গরমে রাস্তায় থাকতে হয়ে সাংবাদিকদের তার উপর সেই সময় খিদেও পেয়েছিল তাই অগত্যা। দোকানের মিষ্টি খাওয়ার পরে পেটের খিদে মিটলেও মনের খিদে যে তখনও জ্বলন্ত, তাই সময় খরচ না করেই আবারও দোকানের বিষয় জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “মাত্র মাস দুয়েক হলো দোকানটি চালু হয়েছে।” কিন্তু দোকান ঘরটা বেশ পুরানো। দোকানে ঢুকলেই বেশ বোঝা যায় একটা সাবেকিয়ানা রয়েছে ঘরটিতে। এবার সুতপা দেবীর নিজের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দোকানে টাঙানো ওনার বাবার ছবির দিকে দেখিয়ে বললেন, “বাবা কখনো চান নি আমি ব্যবসা করি। চিরকাল আমাকে পড়াশুনা ও শিল্প কলাতে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছেন। আমি রবীন্দ্রভারতী থেকে নাটকে ডক্টরেট করেছি। তারপর দূরদর্শনেও যোগদান করি। বিভিন্ন নাটকের অনুষ্ঠান ও বাচিক শিল্পী হিসাবেও কাজ করেছি দূরদর্শনের সাথে। এছাড়া এখনও বিভিন্ন জায়গাতেও অনুষ্ঠান করি সারা বছর ধরেই। এই বছরটা একটু অন্যভাবে কাটছে। না হলে দোকানে পেতেন না হয়তো, কোনো অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিতে ব্যাস্ত থাকতাম এখন।”

সুতপা দেবীর কথায় কৌতূহল যেন আরও বেড়ে গেল। তাকে জিজ্ঞেস করা হয় “ডক্টরেট করে হঠাৎ এই মিষ্টির দোকান খুললেন কেনো?”, এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি একটু যেন থেমে গেলেন, পরক্ষনেই পাশে বসা তার কন্যা সন্তান কে দেখিয়ে বলেন, “আমার মেয়ের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার কথা ভেবে”। আর এখানেই দেখা গেল তার চোখের তারায় এক অপার মাতৃ স্নেহ। মাতৃপক্ষের সূচনাতেই এ এক বিশাল প্রাপ্তি যেন। আরও বললেন, “৫ বছর ধরে পরিকল্পনা করেছি। বিভিন্ন লোকেদের সাথেও কথা বলেছি। অনেক মিষ্টির দোকানের মালিকের সাথে গিয়ে দেখা করেছি। নিজে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছোট একটা ম্যানেজমেন্টের ট্রেনিং নিয়েছি। রাজ্য সরকারের থেকেও একটা ট্রেনিং কোর্স করেছি। তারপর এই মিষ্টির দোকান খোলা। এ যেন দেবী দুর্গার আবির্ভাব মুহূর্তের সেই দৃশ্য সকলের কাছ থেকে শক্তি নিয়ে নিজেকে শক্তিমান করে তোলা। কারণ একটাই, বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপটে নিজেকে স্বনির্ভর করে তুলে সমাজের নানান বাধা-বিঘ্নের বিরুদ্ধে এক অসম যুদ্ধের আহ্বান।

কিন্তু খাবারের তো অনেক ধরনের রূপ আছে, মিষ্টির দোকানটাই কেনো?, কোন বিশেষ টান?” এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “না পুরোটাই ব্যাবসায়িক দৃষ্টিতেই। এর মধ্যে কোন আবেগের জায়গা নেই কোথাও। এখন মেয়েকে বড়ো করে তুলেছি। ও ফিজিক্স নিয়ে এম. এস. সি. পড়ছে ও তার পাশাপাশি একটি স্কুলে চাকরি করছে। এখন একটু নিশ্চিন্ত। কিন্তু ওর ভবিষ্যৎও তো সুরক্ষিত করা আমারই দায়িত্ব। মায়ের কাছে সন্তান তো সন্তানই হয়ে, সে ছেলেই হোক বা মেয়েই।”

দোকানের বিষয় “ম্যাডাম”এর কাছ থেকে আরও জানতে পারা যায়, এই মিষ্টির দোকানের মিষ্টি তৈরির জায়গাটা নিজেদের বাড়ির ছাদেই, পুরো ছাদ জুড়ে চলছে মিষ্টি তৈরির কর্মযজ্ঞ। প্রায় ৭-৮ জন কর্মচারী এখন এই দোকানে কাজ করেন। এরাই মিষ্টি বানান, দোকানে বসেন। সব টাই এদেরই হাতে। এ বিষয় তিনি বলেন, “আমি যতই দেখি না কেনো, সময় দিই না কেনো, এদের হাতের জাদুতেই ভালো সাড়া পাচ্ছি দোকানে। লোকেরা মিষ্টি খেয়ে বেশ তারিফ করছেন। আর জানেন তো বাঙালি মিষ্টি খেতে ভালোবাসে, এই মিষ্টির প্রতি বাঙালির একটা অদ্ভুত টান আছে। সেই টানকে তাই আমিও আমার পুঁজি করে এই মিষ্টিকেই সামনে রেখে এগিয়ে যেতে চাই। ইচ্ছা আছে পুজো শেষ হলে আরও নতুন কিছু মিষ্টির আইটেম নিয়ে আসবো। বিশেষ করে এই বাংলায় আগে বেশ কিছু মিষ্টি হতো যা আজ হারিয়ে গেছে। আমি সেই মিষ্টিই আবার নতুন ভাবে, নতুন রূপে দোকানে নিয়ে আসবো আমাদের মিষ্টি প্রিয় বাঙালিদের জন্য। একটু দৌড় ঝাঁপ হবে জানি, তবে আমরা এই দুই বন্ধু (নিজের মেয়েকে দেখিয়ে) মিলে সামলে নেবো ঠিকই।” এতক্ষণ চুপ করে সুতপা দেবীর মেয়ে মোমোইরো মুখার্জী, মায়ের কথা শুনছিল, এবার মায়ের এই কথায় মেয়ে হেসে উঠলো। সত্যি মা ও মেয়ে যেন বন্ধুই। বেশ ভালই বোঝা যাচ্ছিল মাতৃত্বের খোলস থেকে দিন-দিন তার মা এখন তার সার্থক বন্ধু হয়ে উঠেছে যা বলাই বাহুল্য।

অপরদিকে দেখা গেল কর্মচারীরাও খুব খুশি। এক কর্মচারী আর থাকতে না পেরে বলেই ফেললেন, “ম্যাডাম খুব ভালো, আমাদের প্রতি তার খুব নজর, একদম মায়ের মতো।” দেখা গেল প্রতিটা কর্মচারীর গায়ে “ঘোষাল এন্ড ডটার”-এর ব্র্যান্ড গেঞ্জি জানান দিচ্ছে এক বাঙালি মেয়ের লড়াইয়ের কথা, চরাই-উৎরাইয়ের পথ পেরিয়ে স্বগরিমায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার কথা ও তার মাতৃত্বের কর্তব্য কে সফল ভাবে জিতে আসার আপোষহীন সংগ্রামের কাহিনী।

যখন তার কাছে জীবনের কোন অপূর্ণ ইচ্ছের কথা জানতে চাওয়া হয়, তিনি বললেন “আমি শুরু করেছি যে কর্মযজ্ঞ, আমার পরে আমার মেয়ে সেই পথ ধরে জীবনে স্থিরতা পাক এটুকুই চাই। রেখে যাবো এই দোকান, আর এই দোকানই তার আগামী দিনের ভবিষৎ সুরক্ষিত করবে।” জানতে চাওয়া হল, “আগামী প্রজন্ম, সে আপনার মেয়েই হোক বা অন্য কেউ, তাদের জন্য কিছু বলতে চান?” তিনি বলেন, “আমি সেলেব্রিটি নই। আমি বিশেষ কেউ নই। আমি সাধারণ একজন নারী মাত্র, তবু আমি আমার কথায় বলতে পারি যে, এটা বর্তমান সময়ের দাবি মেয়েদের সামনের সারিতে এগিয়ে আসতে হবে। মেয়েদের আর্থিক স্বাধীনতা, নিজেদের যোগ্যতা প্রমান করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো এটাই এই সময়ের দাবি। আমি এই শিক্ষাই আমার মেয়েকে দিয়েছি যাতে ও এই সমাজের সমস্ত বাধা কে উপেক্ষা করে নিজের মতো বাঁচতে পারে। নিজের জীবনের মালিক হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে কারো উপরে নির্ভিরশীল না হয়ে। আজকের মহালয়ার দিনে এটাই আমার বার্তা।”

তাই এই মাতৃ পক্ষের সূচনার দিনে আমরা চাই সমাজের আরও শত শত সুতপা ঘোষালের মতো নারীরা জেগে উঠুক ও নিজের পায়ে দাঁড়াক আর এটাই বেঙ্গলটুডের একান্ত কাম্য। কারণ যে সমাজে নারীপুরুষ একসাথে সমান্তরাল ভাবে এগোতে পারে সেই সমাজই আগামীতে অপরাজেয় হতে পারবে। আর তাহলেই সেই দিন আজকের এই দিনটির সঠিক মুল্যায়ন করা সম্ভব।

সম্পর্কিত সংবাদ