হাই কোর্টের আদেশে গঙ্গা বক্ষ থেকে আবার ডাঙ্গাতেই জগৎজননী মা

Spread the love
  • 19
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    19
    Shares

 

রাজীব মুখার্জী ও মণিশঙ্কর বিশ্বাস, রামকৃষ্ণ পুর ঘাট, হাওড়াঃ ৬ই অক্টোবর এসে পৌঁছেছে আদালতের নির্দেশের প্রতিলিপি। আর এতেই মাথায় হাত পুজোর উদ্যোক্তাদের। হাতে আর মাত্র 4 টি দিন। গত ৩ মাস ধরে কলকাতায় জুড়ে ও শহরতলিতে হোর্ডিং, ব্যানারে ছেয়ে গেছে “2100 বছর পিছিয়ে”, “ডাঙায় নয়, মাঝগঙ্গায়” ,”হাঁটাপথে নয়,জাহাজে”, “একশো, দু’শো, পাঁচশো নয় “। এ যেন এক অভিনব উপায়ে পুজোর থিমকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন রামকৃষ্ণ স্বামীজি স্মৃতিসঙ্ঘের আয়োজকরা।

কিন্তু আপাতত ছেদ পড়লো এই উদ্যোগে। হাই কোর্টে এই পুজো সংক্রান্ত যে মামলাটি করা হয়েছিল তার রায়দান পর্বে গতকাল হাই কোর্ট আপত্তি জানায় যে গঙ্গা বক্ষে অনুমতি দেওয়া যাবে না পুজোর মণ্ডপ বানানোর। তাই এবার মাঝ গঙ্গায় ভাসমান জাহাজের উপরে অভিনব দুর্গোৎসবের আয়োজন সরিয়ে নেওয়ার পালা। হাই কোর্টের রায়ে স্বভাবতই হতোদ্যম পুজোর আয়োজকেরা। এই পুজোর সভাপতি সত্যব্রত সামন্তের মুখে সেই নৈরাশ্যের ছাপ পাওয়া গেলো, এমনকি তার গলাতেও শোনা গেল নৈরাশ্যের সুর। পুজো মণ্ডপ গঙ্গাবক্ষ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার রায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এটা নিয়ে কিছু বলতে চাই না আমরা। আমরা চেষ্টা করেছিলাম নতুন কিছু তুলে ধরতে দর্শকদের কাছে। কোর্ট নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা সেটা মেনে নিয়েছি।”

প্রসঙ্গত হাওড়া স্টেশনের কাছে রামকৃষ্ণপুর ঘাট থেকে একশো ফুট দূরে মাঝ গঙ্গায় থাকার কথা ছিল বিশালাকার সেই জাহাজ। আর সেই মতো তৈরি হচ্ছিল জাহাজের খোল থেকে কাঠামো তৈরির কাজ। হাওড়ার গ্র্যান্ড ফোরশোর রোডে গঙ্গার পার থেকেই দশনার্থীরা পনেরো ফুট উচ্চতার প্রতিমা দর্শন করতে পারতেন যদি পরিকল্পনা মাফিক হতো সব কিছুই। তাদের পুজোর ভাবনা, সঙ্ঘের সভাপতি সত্যব্রত সামন্ত বলেন ‘‘ভারতীয় সংস্কৃতির মূল কথাটি হল বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য। আজকের থিমের যুগে আমরা আমাদের পুরানো ইতিহাসে ফিরে যেতে চেয়েছি। আমাদের লক্ষ্য ছিল, সব থেকে পুরনো প্রতিমার রূপ দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা।’’


ইতিহাসের সন্ধান পেতে অবশ্য কম পরিশ্রম করতে হয়নি। ন্যাশনাল লাইব্রেরি, জাতীয় গ্রন্থাগার, বই মেলা ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষকদের সাথে কথা বলা থেকে শুরু করে নিজেদের পড়াশোনা করা বিষয়টির উপরে। বিগত প্রায় এক বছর ধরে এই প্রচেষ্টা চলছে উদ্যোক্তাদের। এই প্রসঙ্গে হাওড়া পুরসভার ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নারায়ণ মজুমদার বলেন, “আমরা পৌঁছতে চেয়েছিলাম একদম উৎসে যেতে যেখান থেকে প্রথম দূর্গা মূর্তি পুজো শুরু হয়, সেই প্রতিমার আদলেই আমরা গড়তে চেয়েছিলাম মায়ের মূর্তি। আমাদের গবেষণাতে উঠে এলো যে প্রায় ২১০০ বছর আগে কুষাণ যুগের একটি মূর্তি রয়েছে দক্ষিণ ভারতের সংগ্রহশালাতে।” আর সেই মূর্তির আদলে গড়া দুর্গা প্রতিমার জাহাজে বসার কথা ছিল। ইলোরার গুহাচিত্রের অনুকরণে আঁকা ছবিতে সাজানোর পরিকল্পনা ছিল জাহাজের উপরের মণ্ডপ। চারপাশে থাকতো চন্দননগরের আলোর রোশনাই।

এই মুহূর্তে নতুন জায়গায়ে বেছে নেওয়া হয়েছে মণ্ডপ নির্মাণের স্থান। সেখানেই বসবে মায়ের আদি রূপের মৃন্ময়ী মূর্তি। মাঝগঙ্গায় দুর্গোৎসবের আয়োজনের মূল পৃষ্ঠপোষক মন্ত্রী অরূপ রায়। গত এগারো মাস ধরে রাতকে দিন করে যাঁরা এ বারের পুজোয় চমক দেওয়ার পরিকল্পনায় ছিলেন, তাঁরা হলেন হাওড়া পুরসভার ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নারায়ণ মজুমদার ও রাজ্য সমবায় সংগঠনের অধিকর্তা সত্যব্রত সামন্ত। সত্যব্রতবাবুর কথায়, ‘‘এখন চারপাশে থিমের হিড়িক। ইলোরার ভাস্কর্যে মায়ের ছবি আমাদের সকলকে কাছে টানে। গত বছরের পুজোর পর থেকেই মা দুর্গার ইতিহাসের সন্ধানে কলকাতা বইমেলা, জাতীয় গ্রন্থাগার, কলকাতার ভারতীয় জাদুঘর ছাড়াও রাজস্থানের জয়পুর জাদুঘরের সাহায্য নিয়েছি।’’

তবে হাওড়ার পুজো উদ্যোক্তাদের এই অভিনব উপস্থাপনাকে সাধুবাদ জানিয়ে ভারতীয় জাদুঘরের ডেপুটি কিউরেটর নীতা সেনগুপ্ত বলেন, ‘‘প্রায় ২১০০ বছর আগে কুষাণ যুগে প্রথম মা দুর্গার প্রতিমা দেখা গিয়েছিল। হাওড়ার পুজো উদ্যোক্তারা দুর্গার ইতিহাসের অতীত সন্ধানে আমাদের কাছে বারবার এসেছেন। আমরাও আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি তাদের এই উদ্যোগের পাশে দাঁড়াতে। ওঁদের এই উদ্যোগ ইতিহাসপ্রেমীদের সাহায্য করবে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।’’

তবে এবার দু’পাশে রবীন্দ্র সেতু ও দ্বিতীয় হুগলি সেতু। ঠিক মাঝখানে হাওড়ার রামকৃষ্ণপুর ঘাটের সামনেই ভাসমান জাহাজের উপরে আর থাকবে না 15 ফুট উচ্চতার প্রতিমা। উদ্যোক্তারা জানালেন, জাহাজের চারপাশ থেকে চন্দননগরের শিল্পীদের আলোর মায়াজাল রবীন্দ্র সেতু, দ্বিতীয় হুগলি সেতু থেকে শুরু করে কলকাতার দিকে মিলেনিয়াম পার্ক পর্যন্ত বিস্তৃত থাকার কথা ছিল তা সব স্থগিদ করা হয়েছে। সংগঠনের সভাপতির কথায়, ‘‘থ্রি ডি আলোকসজ্জার জন্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা নেওয়া হয়েছিল। অন্ধকারে হাওড়া ব্রিজ থেকে বিদ্যাসাগর সেতু পর্যন্ত গঙ্গায় আলোর মায়াজাল তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল।’’ 

হাওড়ার ঘুসুড়ির জাহাজ কারখানায় গিয়ে দেখা গেল, জাহাজের উপরে লোহার মণ্ডপ তৈরির কাজ প্রায় শেষ এখনো পরে আছে সেখানেই ওই অবস্থাতেই। জাহাজের চালক সনাতন ঘোষের কথায়, ‘‘মাঝ গঙ্গায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা মাথায় রেখে চার ইঞ্চি ব্যাসের চার মিলিমিটার পুরু পাইপ ঢালাই করে বসানো হয়েছিল।’’ ফাইবারের প্রতিমা তৈরির কাজ করেছেন শিল্পী সুধীর মাইতি।

প্রসঙ্গত এই পূজা তৃতীয়াতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গঙ্গাবক্ষে পুজোর উদ্বোধন করার কথা ছিল। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন করে কোমর বেঁধে নেমেছেন উদ্যোক্তারা। গঙ্গা বক্ষ ছাড়া আর সমস্ত পরিকল্পনা আগের মতোই রাখা হয়েছে। আর এই ক্ষেত্রে হাওড়া পুলিশ সূত্রের খবর, এই পুজোর প্রতিমা দর্শন করাতে গ্র্যান্ড ফোরশোর রোড বন্ধ থাকবে। শর্ত সাপেক্ষে গাড়ির প্রবেশাধিকার মিলবে। সে ক্ষেত্রে পুজোর ক’দিন হাওড়া শহরে যানজটের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

হাওড়া পুলিশের এক আধিকারিকের আশঙ্কা, ‘‘মাঝগঙ্গায় প্রতিমা দর্শনের হোর্ডিং যে ভাবে নজর কেড়েছে, তাতে গঙ্গা বক্ষ না হলেও অতিরিক্ত ভিড়ের সম্ভবনা থেকেই যাচ্ছে যা বছর দুই আগে দেশপ্রিয় পার্কে যেমন ভিড় হয়েছিল, ততটা যেন না হয়!’’ পুলিশ সূত্রের খবর, পুজোয় এমনিতেই রাস্তায় গা়ড়ির চাপ বেশি থাকে। তবে তা সামলানোর নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হবে পুলিশের তরফে। হাওড়া পুলিশ কমিশনারেটের ডিসি (ট্র্যাফিক) জাফর আজমল কিদোয়াই বলেন, ‘‘প্রতিমা দর্শনের জন্য ট্র্যাফিক ব্যবস্থা এখনও ঠিক হয়নি। এ বিষয়ে পুলিশ কমিশনার একটি বৈঠক করবেন। তার পরেই গোটা বিষয়টি বিস্তারিত ভাবে বলা সম্ভব হবে।’’ 

তবে সব অভিবত্বের থেকে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও অন্যান্য আরও কিছু দিকই বিচার বিবেচনা করে কলকাতায় হাই কোর্ট গঙ্গাবক্ষে পুজোতে রাজী হল না তা বলাই বাহুল্য।

সম্পর্কিত সংবাদ