28 C
Kolkata
Thursday, July 18, 2024
spot_img

নিজের বাড়িতে ফিরতে একমাত্র ভরসা গামবুট

রাজীব মুখার্জী, সারদা পল্লী, ডানকুনি, হুগলিঃ অন্ধকার গলির দিকে তাকালেই চোখে পড়ছে পুকুর! আমার পাশে দাঁড়ানো সুবীর বললো "দাদা চলুন " আমি তবু দাঁড়িয়ে ওখানেই আর মনে মনে ভাবছি যাবো টা কোথায়? সামনে তো পুকুর !সুবীর কে জিজ্ঞেস করলাম যাবো কি করে সামনে তো পুকুর ! সে বললো নানা দাদা ওটা পুকুর নয় ওটা গোড়ালি ডোবা কালো জল। গভীর নয়, ওটাই যাওয়ার রাস্তা। তাকিয়ে দেখছি জায়গাটা ভালো ভাবে। পথের পাশেই ঘন কচুবন। রাস্তার ধারে বিদ্যুতের খুঁটি আছে সে শুধু নামেই। আলো জ্বলছে না। চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। সুবীরের হাতে জ্বলছে টর্চ আর আমার হাতে সম্বল মোবাইলের আলো। প্রায় আধা ঘন্টা হলো ওখানেই দাঁড়িয়ে। হঠাৎ এক পড়শির বাড়িতে ঢুকে দুজোড়া গামবুট নিয়ে এলো সুবীর। পায়ের জুতোজোড়া খুলে বগলদাবা করে হাঁটা লাগালাম দুজনে।

প্রথমে গামবুট দেখে ওকে জিজ্ঞেস করলাম গামবুট কেন? ও বললো সাপের ছোবল থেকে বাঁচতেই ভরসা গামবুট।

সুবীরের কথায়, ‘‘গত বছর দাদা সাপের ছোবল খেয়েছিলাম। তার পরেই অন্যদের মতো আমিও গামবুট কিনেছি। এ ভাবেই যাতায়াত করতে অভ্যস্তও হয়ে গিয়েছি।"’ ছপ ছপ আওয়াজ করে যাওয়ার পথে ওখানকার বাসিন্দারা যুবক, প্রৌঢ়া, মহিলা প্রত্যেকেই বলছিলেন, ‘‘চারপাশে সাপখোপের আস্তানা। কী করে বেঁচে আছি সে আমরাই জানি দাদা!’’

অবাক হবেন না এটা কোনও গণ্ডগ্রাম নয়। এই অবস্থা কলকাতা ঘেঁষা হুগলির ডানকুনির ২০ নম্বর ওয়ার্ডের সারদা পল্লির। বাসিন্দারা জানান, আগে জল দাঁড়ালে কিছুক্ষন বাদে নেমেও যেত। কয়েক বছর আগে এখানে রেলের কারখানা হওয়ার পর থেকে নিকাশি ব্যবস্থাটা একেবারে ভেঙে পড়েছে। গোটা বর্ষায় সারদা পল্লি জুড়ে জল জমে। এই এলাকার একাংশ থেকে সেই জল শীতকালের আগে নামে না। এলাকাবাসীদের ক্ষোভ, ‘‘আমরা পুরসভার কর দিই। প্রতি নির্বাচনে শাসক দলকে ভোট দিই। কাউন্সিলর থেকে পুরপ্রধান, বিধায়ক সবাই সমস্যার সুরাহার আশ্বাস দিয়ে গেছেন শুধু কিন্তু কেউ কোনো কাজ করেননি।’’

এলাকার বাসিন্দা গৃহবধূ সুমিতা জানা বলেন, ‘‘আমার স্বামীকে সাপে ছোব‌ল খেয়েছিলো দু মাস আগে। আমার ছেলে হোটেলে ব্যান্ডের দলে গিটার বাজায়। ফিরতে রাত হলে দুশ্চিন্তায় কাটাই। রাতে প্রাণ হাতে ফেরে এই জমা জলের ভেতরে দিয়ে। অনেকের শরীরে চর্মরোগ হয়েছে এই পচা জলে যাতায়াত করে। একেবারে নরক যন্ত্রণা ভোগ করছি আমরা। ’’ সম্প্রতি জবা দাস নামে ওই এলাকার এক মহিলা সাপে ছোবলে মারা যায়। অনেকেই জানান, সারাক্ষণ সাপের আতঙ্ক তাড়া করে বেড়ায়। প্রায়ই বাড়িতে সাপ ঢুকে পড়ে। গৃহবধূ সীমা নায়েক বলেন, ‘‘বাচ্চাদের কে ঘরের বাইরে খেলতে দিতে ভয় লাগে। এই দূর্গা পুজোয় সবাই আনন্দ করে, ঘুরতে যায়। আমরা বাচ্চাদের নিয়ে ঘরেই থাকি. জল ঠেলে ঠাকুর দেখতে বেরনো যায় আপনি বলুন !’’ সম্প্রতি এক গর্ভবতীকে ভোর রাতে পাঁজাকোলা করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। এক প্রৌঢ়ার কথায়, ‘‘পৌরসভা এসে ডেঙ্গি সচেতনতার কথা শোনায়, শুনতে ভীষন হাস্যকর লাগে দাদা। এই এলাকা মশার আঁতুড়ঘর। আপনি যে ঘরে যাবেন একজন না একজন রুগী পাবেন। এখানে জ্বর লেগেই আছে।’’ 

আমরা এই সমস্যার কথা পুর কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলাম। তারাও মানছেন সমস্যার কথা। তাঁদের বক্তব্য, অপরিকল্পিত ভাবে বাড়ি এবং নিকাশি হওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জায়গাটি উদ্বাস্তু কলোনি ছিল। যে যেরকম পেরেছে বাড়ি তৈরী করেছে।

এ বিষয়ে এলাকার তৃণমূল কাউন্সিলর হাসরত আলি বলেন, ‘‘বিদ্যুতের মিস্ত্রির পক্ষে ঝুঁকি নিয়ে এলাকায় জলে মই পেতে কাজ করা সম্ভব হয় না। তবে জল প্রায় নেমে গিয়েছে এখন। শীঘ্রই আলো জ্বলবে সমস্যা মিটে যাবে। বললেন বিশ্বাস করবেন না বৃষ্টিতে আমার বাড়িতেও জল ঢোকে। নিকাশি ব্যবস্থা নিয়ে আমি পৌরসভা কে জানিয়েছি, এই সমস্যা মেটাতে পুরসভায় আলোচনা চলছে। আশা করি খুব দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে। ’’

পুরপ্রধান হাসিনা শবনম বলেন, ‘‘বেশ কয়েক বছর আগে অব্দি ওখানে মাঠ ছিল। এখন অনেক বাড়ি হয়ে যাওয়ায় জল নামছে না। পাম্প লাগিয়ে খালে বা বড় পুকুরে জল ফেলার উপায়ও নেই এখানে। রেলের কারখানা তৈরির সময় যে নর্দমা বানানো হয়েছিল, তাতেও কোনো লাভ হয়নি। তার পরিবর্তে আমরা ঠিক করেছি খোলা নর্দমা বানাবো। দুই এক দিনের মধ্যে পুরসভার তরফে এলাকা পর্যবেক্ষণ করতে আসবে। সমস্যার দ্রুত সমাধান করা হবে।’’

বিধায়ক স্বাতী খন্দকারের বক্তব্য, ‘‘এই সমস্যার কথা আমাকে জানানোর পরেই আমি সমস্যা সমাধানে পুরসভা থেকে সেচমন্ত্রী সকলের সঙ্গে কথা বলেছি। এই সমস্যা মেটাতে বড় নর্দমা তৈরি করতে হবে। শীঘ্রই কাজ শুরু হয়ে যাবে।’’ তার মতোই এখানকার এলাকাবাসীও তাই চান দ্রুত সমস্যার সমাধান হোক। আতঙ্কের আর ভয়ের থেকে বেরিয়ে তারাও একটু সুস্থ জীবন যাপন করবে এটুকুই তাদের চাহিদা।

Related Articles

Stay Connected

17,141FansLike
3,912FollowersFollow
21,000SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles