লাভের সংস্থা হঠাৎ লোকসানের মুখে

লাভের সংস্থা হঠাৎ লোকসানের মুখে

 

রাজীব মুখার্জী, হাওড়াঃ ছোটবেলায় লঞ্চে চড়ে হাওড়া স্টেশন যাওয়ার অভিজ্ঞতা সকলেরই আছে। অনেক নস্ট্রালজিয়া জড়িয়ে আপামর বাঙালির তথা কলকাতা ও হাওড়ার বাসিন্দাদের। এই বার সেই হুগলি নদী জলপথ পরিবহণ সংস্থার পরিচালন বোর্ডের বিরুদ্ধেই উঠছে পুকুর চুরির অভিযোগ। নিয়োগ করা হয়েছে নতুন প্রশাসক। বেশ কিছু অভিযোগের তীর উঠে এসেছে সংস্থার কর্মীদের থেকেও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মী জানান “অনেক দিন ধরেই সংস্থার বহু যন্ত্রাংশ বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। সচল যন্ত্রাংশ অব্দি বাতিল ঘোষণা করে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে অবাধে। বিক্রির জন্য কোনো রকম টেন্ডার ডাকা হয় না। যন্ত্রাংশ ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার সময়েও টেন্ডার ডাকা হচ্ছে না। পরিচিত সাপ্লায়ার দের থেকে বিনা দর পত্রে জিনিস কেনা চলছে যা পুরোপুরি আইন বিরুদ্ধ।” দফতরের শেষ হওয়া অডিট রিপোর্টেও বলা হয়েছে প্রতি বছর লঞ্চের জন্য ব্যাবহৃত তেল কেনা হয়েছে গড়ে চার কোটি টাকার অথচ তার জন্য কোনও টেন্ডার ডাকা হয়নি।

প্রশ্ন উঠছে যে কেনো বিনা টেন্ডারে কেনা হলো তেল? উত্তর নেই কারোর কাছেই। সবাই মুখে কুলুপ এঁটেছেন। হুগলি নদী জলপথ পরিবহণ সংস্থার পরিচালন বোর্ডের বিরুদ্ধে এমনই সব ভূরি ভূরি আর্থিক দুর্নীতি ও অনৈতিক কাজকর্মের অভিযোগ উঠে এসেছে তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে। ওই রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে ২০১৫-২০১৬ অর্থবর্ষে যেখানে এই সমবায়ের নিট লাভ হয়েছিল ৫৩ লক্ষ টাকা, পরের অর্থবর্ষের অডিট রিপোর্টে সেই লাভ হওয়া তো দূরে থাকুক, সংস্থার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৩১ লক্ষ টাকা। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে কি এমন ঘটলো যে লাভের ছোলা একটি সংস্থা এভাবে লোকসানের মুখে পরে যাচ্ছে।

এই সংস্থার কর্মরত কর্মীদের অভিযোগ, এই ক্ষতির পিছনে রয়েছে পরিচালন বোর্ডের একাংশের লাগামহীন দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়ম। কয়েক মাস আগে ওই সমবায় সংস্থার কর্মীদের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে তদন্ত কমিশন গঠনের নির্দেশ দেন রাজ্যের সমবায়মন্ত্রী অরূপ রায়। তদন্ত কমিশনের দায়িত্বে থাকা সমবায় দফতরের তিন পদস্থ অফিসার দিন-রাত পরিশ্রম করে পরিচালন বোর্ডের একাংশের অনৈতিক কাজকর্মের পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রমাণ জোগাড় করেছেন। তার পরেই বোর্ড ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করেন তাঁরা মন্ত্রীর কাছে।

এমনকি গত বৃহস্পতিবার রাতে বর্তমান বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ৫ই অক্টোবর রাজ্য সরকারের নিয়োগ করা প্রশাসক দায়িত্ব নিয়েছেন হুগলি নদী পরিবহন সংস্থার।

হুগলি নদী জলপথ পরিবহণ সংস্থা জানান, তাদের সংস্থার ১৮টি ঘাটে লঞ্চ পরিষেবা চলে। এছাড়া নিজস্ব জেটি আছে ৫ টি। তার মধ্যে রাজ্য সরকারের উদ্যোগে কোটি কোটি টাকা খরচ করে এর আগে গঙ্গার উপরে থাকা অধিকাংশ জেটির খোলনলচে পাল্টে ফেলা হয়।

এখানের কর্মীদের আরো অভিযোগ, এই পাঁচটি জেটির মধ্যে বাউড়িয়া ও বজবজ জেটির কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। আর বাকি বাতিল বলে কোথায় সেই জেটিগুলি বিক্রি করা হয়েছে, তারও কোনও হিসেব নেই দফতরের কাছে। স্থানীয় কর্মীদের দাবি জানাচ্ছেন , ওই জেটিগুলি কোথায় কিভাবে বিক্রি করা হয়েছে , তা অবিলম্বে জানার জন্য সদ্য নিযুক্ত প্রশাসক “ফিজিক্যাল অডিট” করুন।

হুগলি নদী জলপথ পরিবহন সংস্থার স্টাফ অ্যান্ড ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘যাঁদের দুর্নীতির জন্য সংস্থার এত টাকার ক্ষতি হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ করা প্রয়োজনীয়। আমরা চাই, যে পরিমাণ টাকার দুর্নীতি ও নয়ছয় হয়েছে, সেই টাকা তাঁদের কাছ থেকেই উদ্ধার করে সংস্থাকে বাঁচানো হোক।”

ওই সমবায় সূত্রে জানা গিয়েছে, কর্মীদের থেকে তদন্তকারী অফিসারদের যে বিষয়গুলি জানানো হয়েছে,
বছরে লক্ষ লক্ষ টাকার যন্ত্রাংশ-সহ অফিস রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বালি-সিমেন্টও কেনা হয়েছে বাছাই করা দুই জন সদস্যের কাছ থেকেই অথচ সমবায় আইনে কোনও সদস্যের থেকে কিছু কেনা যায় না। এটা আইন বিরুদ্ধ।

সমবায় আইনে না থাকা সত্ত্বেও গত দুই বছর ধরে পরিচালন বোর্ডের সদস্যেরা পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত মাসিক ভাতা নিয়েছেন। সংস্থার সম্পত্তি নয়ছয় করেছেন। সংস্থার যে হলিডে হোম পুরীতে আছে সেটা হাতে নেওয়ার ছয় মাস পরেই তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কোনও কারণ ছাড়াই। বিল ছাড়াই সংস্থারই এক সদস্যের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকার যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে গত দুই বছরে। এতো কিছু ঘটে যাওয়ার পরেও কোনো অভিযোগই অভিযোগ মানতে নারাজ হুগলি নদী পরিবহন সংস্থার চেয়ারম্যান তথা সাঁকরাইল কেন্দ্রের বর্তমান তৃণমূল বিধায়ক শীতল সর্দার। তাকে এই দুর্নীতি ও আর্থিক তছরুপ নিয়ে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন, ‘‘কিছুই হয় নি। একটা সমস্যা হয়েছে। মিটে যাবে। আমি খুব শীঘ্রই ওখানে গিয়ে কথা বলব।”

সংস্থার এই দুর্দশাতে স্বাভাবিক ভাবেই ক্ষোভ ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন সংস্থার কয়েক শো কর্মী। তাদের দুশ্চিন্তার কারন সংস্থাকে ঘুরে দাঁড় করানোর চেষ্টার মধ্যে তাদের কাজের জায়গাতে যেন কোপ না নেমে আসে এই পুজোর মুখে। তারাও চাইছেন আগাগোড়া যেভাবে তারা পরিশ্রম করে এই সংস্থাকে লাভের মুখ দেখিয়ে এসেছেন। সেই পরিশ্রম করে আবার তাদের সংস্থাকে ঘুরে দাঁড় করাতে তারা প্রত্যয়ী।

You May Share This
  • 8
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    8
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.