ব্যারাকপুরে পুলিশের সহযোগিতায় বৃদ্ধ ফিরে পেলেন তার আপনজনদের

Spread the love
  • 817
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    817
    Shares

অরিন্দম রায় চৌধুরী, ব্যারাকপুরঃ

ব্যারাকপুর স্টেশন চত্বরে বিশেষ করে সন্ধ্যের পর এমনিতেই বেশ ভির-ভার থাকে। নানা স্থান থেকে বহু মানুষ ট্রেনে করে ফেরে তাদের বাড়ীর উদ্দেশ্যে। এই দৃশ্য রোজই দেখা যায় কিন্তু ব্যাতিক্রমটি দেখতে পায় শুধু মাত্র কিছু ব্যাতিক্রমি মানুষই। পেশায় পুলিশের এ. এস. আই., নাম সঞ্জীব নস্কর, ব্যারাকপুর স্টেশনে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকেন স্টেশনের বাইরেই। প্রতিদিনের ন্যায় সেদিনও তার রোজকার ডিউটিতে হাজীর হওয়ার পরই দেখতে পান একজন প্রায় ৭০ বছর বয়েসি বৃদ্ধ ঠক-ঠক করে কাঁপছে আর অঝোরে কাঁদছে। এখানেই ব্যাতিক্রম সঞ্জীব আর দশজন সাধারণ মানুষের থেকে। আসা যাওয়ার পথে অনেকেই দেখেছে এই বৃদ্ধ ভদ্রলোককে কিন্তু কারোরই আর সেই দিকে খেয়াল করার সময় নেই, সবারই তখন বাড়ি ফেরার তাড়া। কিন্তু চোখ এড়ালো না সঞ্জীবের। সোজা গিয়ে জানতে চাইলেন বৃদ্ধকে কেন কাঁদছেন। কোথায় যাবেন? কোথা থেকে এসেছেন? জানতে পারলেন বৃদ্ধ ভদ্রলোকের নাম কালিপদ মণ্ডল, বাড়ী সেই মুর্শিদাবাদ জেলার আন্দুলবেড়ীয়া। পেশায় চাষাবাদের কাজ করেন এখনও এই বয়েসে। বাড়ীতে সমর্থ ছেলে থাকলেও ছেলের অত্যাচারের স্বিকার হয়েই বাধ্য হয়ে আজ তিনি গৃহছাড়া। গৃহহীন হয়ে রাস্তায় বেড়িয়ে এসেছেন নিজের মেয়ের বাড়ীর উদ্দেশ্যে। বৃদ্ধের এইটুকু মনে আছে মেয়ে-জামাই থাকেন ব্যারাকপুরে। কিন্তু কোথায় থাকেন তাড়া তা সঠিক মনে নেই। তার উপর সেই সকাল থেকে এখনও এক ফোটাও খাদ্য পড়ে নি পেটে তাই খিদের জ্বালায় বেশ কষ্টই হচ্ছে তার।

বৃদ্ধ কালিপদ মণ্ডল




এইদিকে সেই ছোট্ট বয়েস থেকেই মানবসেবা করে বেড়ে ওঠা সঞ্জীব এখন ব্যারাকপুর পুলিশের কর্মরত। পুলিশে ঢোকার সময় তাকে নিতে হয়েছিল শপথ “পুলিশে চাকরী করার সুবাদে শুধু মানব সেবাই করে যাব”। একে তো ছোট্ট থেকেই মানবসেবা করে অভ্যস্ত সঞ্জীব তার উপর পুলিশে ঢুকে এই শপথ নিয়ে আরও যেন জনসেবা করার উন্মাদনা বেড়েই গেছে। বৃদ্ধের কাছ থেকে তার করুন কাহিনী শোনার পর প্রথমেই সঞ্জীব ছুটে গিয়ে বৃদ্ধের জন্য কিছু খাবার কিনে এনে বৃদ্ধকে ভাল ভাবে তার পুলিশ পোষ্টে বসিয়ে তৃপ্তিভরে খাওয়ালেন তারপর একটু একটু করে জানার চেষ্টা করতে থাকলেন বৃদ্ধের মেয়ে-জামাই ব্যারাকপুরে ঠিক কোথায় থাকেন। ইতিমধ্যেই বৃদ্ধ একটু শক্তি ফিরে পেয়ে আরও কাঁদতে শুরু করেন। তাকে কান্না থামাতে বলাতে বৃদ্ধ কাঁদতে কাঁদতে বলেন “বাবা তুমি আমার কেউ হও না কিন্তু তুমি আমাকে ডেকে খাওয়ালে, আর আমার ছেলে আমাকে খাওয়া তো দুরের কথা আমার বুকে লাথি মেরে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে।”



কিন্তু মেয়ে-জামাইয়ের বাড়ীর উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে আসা বৃদ্ধ, বয়েসের ভারে ঠিক মনে করতে পারছেন না তাদের সঠিক ঠিকানা। এমনকি বৃদ্ধ তার জামাইয়ের নামও ঠিক বলতে না পারায় রীতিমত বিড়ম্বনায় পড়তে হলো সঞ্জীবকে। তবে ওই যে সঞ্জীবের তখন একটাই মন্ত্র মনে ভেতরে চলছে “হাল ছেড়ো না বন্ধু, বরঞ্চ কষে ধরো হাল” আর তাঁর ফলও মিললও সঙ্গে সঙ্গে। বৃদ্ধের সঙ্গে আনা ব্যাগের পাশে পড়ে থাকা একটি চিরকুটের দিকে নজর পড়ে গেল সঞ্জীবের। পেয়েও গেলেন চিরকুটে লেখা একটি মোবাইল নম্বর। আর তারপর সেই চিরকুটে লেখা মোবাইল নম্বরে ফোন করে পাওয়া যায় বছর ৭০ বছর বয়েসের বৃদ্ধের নাতির খোঁজ।



এরপর সঞ্জীব বৃদ্ধের নাতি অর্থাৎ শুভংকর সাহাকে ঘটনাটির বিষয়ে জানালে, খবর পেয়ে তড়িঘড়ি সে ছুটে আসে তাঁর দাদুকে তাঁর সাথে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। শুভঙ্কর ব্যারাকপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজের বাণিজ্য শাখার ২য় বর্ষের ছাত্র। শুভঙ্কর দিনের বেলায় পড়াশুনা করলেও অবসর সময় বিভিন্ন স্থানে ক্যামেরার কাজ করে। এই ভাবে সে তাদের সংসারে দুটো টাকা আমদানি করে নিজের বাবাকে সাহায্য করে। সেই সময় শুভঙ্কর ক্যামেরার কাজ করছিল বারাসাতের কাছে। দাদুর খবর শুনে তড়িঘড়ি সব কাজ ফেলে ছুটে আসে ব্যারাকপুরে। দাদুকে দেখেই সে চিনতে পারে এবং অভিযোগের সুরে বলে মুর্শিদাবাদ জেলার আন্দুলবেড়িয়ায়ে বৃদ্ধের ছেলে জটাই মণ্ডলের একটি টিভির দোকান থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে সে এবং তাঁর স্ত্রী বৃদ্ধের উপর অত্যাচার করতেন। এমনকি ঘটনার দিনও বৃদ্ধের ছেলে জটাই মণ্ডল তাকে না খেতে দিয়ে ঘর থেকে বের করে দেন। আর তারপরই সে তাঁর মেয়ের বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যারাকপুরে এসে উপস্থিত হন কিন্তু বয়স হওয়ার দরুন সব মনে না রাখতে পারায় রাস্তায় উদভ্রান্তের মতো ঘুরতে থাকেন আর ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে যান ব্যারাকপুর। অবশেষে অসহায় অবস্থায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।

বৃদ্ধ কালিপদ মণ্ডলকে নাতি শুভঙ্কর সাহার হাতে তুলে দিচ্ছেন এ. এস. আই. সঞ্জীব নস্কর




এই ঘটনায় বৃদ্ধের নাতি তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং সে তাঁর মামা এবং মামির প্রতি একরাশ ঘৃণা প্রকাশ করে তাদের এই কর্মের উপযুক্ত শাস্তির দাবী করে। শুভঙ্করের বাবার নাম সুভাষ সাহা। অতি কষ্টে কোলকাতার ফুটে কচুড়ী বিক্রি করে তাদের জীবন অতিবাহিত হয়। মূলত বাবার এই কষ্ঠে ছেলে শুভংকর সাহা লাঘব করতে এখন থেকেই সে বাবার পাশে দাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ভাবে নানারকম কাজ করে পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করে চলেছে। এছাড়া আরও জানা যায়, বৃদ্ধের জামাই, মেয়ে এবং তাঁর নাতি ব্যারাকপুরে ভাড়া থাকেন। অবশেষে ব্যারাকপুর পুলিশের এ. এস. আই. সঞ্জীব নস্করের এর তৎপরতা ও সহযোগিতায় বৃদ্ধের মেয়ে পেয়ে গেলেন তার বৃদ্ধ বাবাকে। তাদের শত দুঃখের মাঝেও বৃদ্ধ বাবাকে ঠাই দিলেন নিজেদের সংসারে।

সম্পর্কিত সংবাদ