তারামণ্ডল এখন হাওড়া ময়দানে, আরো উন্নত ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তির ব্যবস্থাপনার কারিগরিতে

Spread the love
  • 21
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    21
    Shares

রাজীব মুখার্জী, হাওড়াঃ রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা গুনতে ভালো লাগে ছোটদের। ছোটবেলার থেকেই অনেকে তাদের হারিয়ে যাওয়া কাছের মানুষদের ওই তারার মধ্যেই খুঁজে বেড়ায়। বাড়ির বড়দের থেকে তারা জেনেছে রাতের আকাশের বিভিন্ন তারার বিভিন্ন নাম। এই তারার সাথে মানুষের যেন এক নাড়ির টান। প্রায় সকলেই কম বেশি বহুবার কলকাতায় অবস্থিত বিড়লা তারা মন্ডলে গেছেন। বড়ো হয়েও এর প্রতি আকর্ষণ একটুও কমেনি বরং আজও নিজের সন্তানদেরকে সাথে নিয়ে তারামণ্ডলে গিয়ে সকলেই নিজের শৈশবের সেই মুহূর্ত ফিরে পেতে চায়।

অন্ধকার হলঘরের উপরের দিকে তাকালেই মনে হবে, রাতের আকাশ যেন নেমে এসেছে সামনে। সূদূর গ্রহ-নক্ষত্র এসে গিয়েছে একদম ধরাছোঁয়ার মধ্যে। শুকতারা, সপ্তর্ষিমণ্ডলের দেখা পেলে মনে হয়, যেন আমরাও সেই অনন্ত ছায়াপথেরই অংশ। অতীত কালে ও আজকের সময়েও তারামণ্ডল বলতেই আমরা বুঝি কলকাতার ভিক্টোরিয়ার নিকটেই গোল স্তূপাকৃতির একটি স্থাপত্য যা এই শহরের একটি অন্যতম দ্রষ্টব্যতে পরিণত হয়েছে। এই আবেগকেই উস্কে দিয়ে হাওড়া পৌরসভা একটি উদ্যোগ নিয়েছে মেয়র রথীন চক্রবর্তীর নেতৃত্বে।

হাওড়ার শরৎ সদন চত্বরের পশ্চিম প্রান্তে তৈরি হচ্ছে ১০০টি আসন সমেত এক আধুনিক ত্রিমাত্রিক তারামণ্ডল। এই নির্মীয়মাণ তারামণ্ডলের ভিতরে ঢুকলে অসাধারণ অনুভূতি হবে পরিদর্শনকারী, এমনটাই দাবি করা হচ্ছে হাওড়া পৌরসভা পক্ষ থেকে। সর্বমোট ১০০টি আসনযুক্ত এই আধুনিক তারামণ্ডলের নাম দেওয়া হয়েছে প্ল্যানেটোরিয়াম অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল রিসার্চ সেন্টার। এই তারামণ্ডল তৈরিতে খরচ হবে আনুমানিক প্রায় ১৪ কোটি টাকা। কাজ পুরোদমে চালু হয়ে গেছে এবং কাজের গতি দেখে বলা যায় হাওড়া পুরসভার উদ্যোগে তৈরি এই নতুন তারামণ্ডল হয়তো এই অক্টোবরের শেষের দিকে অথবা শীতের শুরুতেই খুলে দেওয়া হবে দর্শকদের জন্য। তিনটি ভাষাতে মূলত বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজিতে প্রতিদিন মোট ১০টি করে শোয়ের ব্যবস্থা থাকবে বলে পুরসভা সূত্রের খবর। প্রতিটি শোয়ের সময়সীমা হবে ২৫ মিনিট।

প্রসঙ্গত বিড়লা তারামণ্ডলের সম্প্রতি সংস্কার কাজ শেষ করা তাতে এখনও থ্রিডি প্রযুক্তি নেই। কিন্তু বিড়লা তারা মন্ডলের চেয়ে আয়তনের দিক থেকে তুলনায় ছোট হলেও হাওড়ার এই নয়া তারামণ্ডলটি হবে ত্রিমাত্রিক এবং এর প্রোজেক্টর আধুনিক ফোর কে প্রযুক্তিতে তৈরি। এই ধরণের উচ্চতম প্রযুক্তি, আধুনিক যন্ত্র ও কারিগরিতে তৈরি এই তারাণ্ডল পূর্ব ভারতে এই প্রথম তৈরি হচ্ছে বলে দাবি পুরসভার। শুধু বিনোদনের জন্যই এটা ব্যবহার করা হবে না, বরং এখানে মহাকাশ নিয়ে ইচ্ছুক পড়ুয়াদের পড়াশোনা এবং গবেষণার ব্যবস্থাও থাকবে বলে পুরসভা সূত্রে জানানো হয়েছে। এই তারামণ্ডলের সাথেই থাকবে অনেক মনীষীদের ছবি ও তাদের চিত্র কলা নিয়ে তৈরি আর্ট গ্যালারি।

পুরসভার পক্ষে শিক্ষা ও শরৎ সদনের দায়িত্ব প্রাপ্ত মেয়র পারিষদ দিব্যেন্দু মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘জাপান, জার্মান ও ফ্রান্সের কারিগরী সহযোগিতায় কলকাতার একটি সংস্থা এই তারামণ্ডল তৈরি করছে। কলকাতার সংস্থাটির দেশ জুড়ে এই ধরণের তারামণ্ডল তৈরির অভিজ্ঞতা রয়েছে।’’

নতুন এই তারামণ্ডল কে ত্রিমাত্রিক করার জন্য প্রজেকশন পদ্ধতিতে একটু পরিবর্তন করা হবে বলে জানাচ্ছেন এর দায়িত্বে থাকা এক পদস্থ পুর ইঞ্জিনিয়ার সমীরণ চক্রবর্তী। তিনি জানিয়েছেন, এই তারামণ্ডলে প্রোজেক্টর মেশিন হলের মাঝখানে না থেকে রাখা হবে দর্শক আসন থেকে অন্তত আট ফুট উঁচুতে। দুইটি মেশিন বসবে ১৮০ ডিগ্রি কোণ করে। যাতে থ্রিডি এফেক্ট ভাল করে বোঝা যায়। তিনি আরও বলেন, ‘‘তারামণ্ডল তৈরিতে কোনও আপোষ করা হচ্ছে না। তারামণ্ডলের মাথার উপরে যে গম্বুজের মতো করা হয়েছে, তা জল-নিরোধক করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। এখানে থাকছে প্রতিবন্ধী দর্শকদের জন্য র‌্যাম্পের ব্যবস্থাও, যাতে তাঁরা সহজেই তারামণ্ডলে ঢুকতে পারেন। তাঁদের জন্য আলাদা শৌচাগারও করে দেওয়া হচ্ছে।’’ 

এই কর্ম যজ্ঞ যখন একদিকে চলছে তখন এক অংশের মানুষের থেকে কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যে পুরসভার কাজ যেখানে শুধু মানুষকে সঠিক ভাবে পরিষেবা দেওয়া, সেখানে এতো কোটি টাকা খরচ করে একটি তারামণ্ডল তৈরির প্রয়োজন কেন? এর উত্তরে হাওড়ার মেয়র রথীন চক্রবর্তী বলেন, ‘‘আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে শুধু পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রেই পুরসভা নয় বরং পুরসভার ব্যাপ্তি আজকে এর চেয়ে অনেক বেশি, মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে, শহরের সংস্কৃতিকে ধরে রাখতেও পুরসভা সচেষ্ট, তাই এই দায়িত্ব পরিব্যাপ্ত করেছে পুরসভার কাজের সীমানাকেও। আমাদের এই হাওড়াতে অনেক কিছুই নেই, যা কলকাতায় রয়েছে। তাই হাওড়ার বাসিন্দারাও যাতে এই ধরণের শিক্ষাক্ষেত্র ও বিনোদন থেকে বঞ্চিত না হয়, সে কারণেই পুরসভা থেকে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

বিতর্ক যাই হোক না কেনো এই তারামণ্ডলের কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পরে হাওড়া শহরের মাথায় যে আরেকটি পালক জুড়বে ও বাচ্ছাদের ঘোড়ার আরেকটি আকর্ষণীয় জায়গা তৈরি হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অধুনা মেট্রোর কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গেলে হাওড়াবাসি তথা কলকাতা বাসীর কাছেও এই তারামণ্ডল আরো নাগালে মধ্যে চলে আসবে। হাওড়া ময়দানকে নতুন রূপে সাজিয়ে তোলার যে প্রয়াস মেয়রের নেতৃত্বে হাওড়া পুরসভা নিয়ে এ তার অন্যতম অংশ হিসাবে এই তারামণ্ডলের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছে হাওড়া বাসি।

সম্পর্কিত সংবাদ