মানুষের আর এক নাম পুলিশ তাই মানবিক

মানুষের আর এক নাম পুলিশ তাই মানবিক

 

রাজীব মুখার্জী, আলমবাজার, বরানগর:

হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়
এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী-গদ্যময়
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।।

বিচিত্র মানুষ, বিচিত্র তাদের পেশা, কত মানুষ কতরকমের পেশায় যুক্ত, কেউ এলিট, কেউ হোয়াইট কলার, কেউবা আবার নিম্ন বিত্ত। এরা সবাই কিন্তু বিভিন্ন পেশায় যুক্ত। কেউ বা নিজের জীবন উৎসর্গ করছে দেশের জন্য। কেউ জনমানষের কাছে জনমহিনী। কেউ ব্যাবসায় পসার জমিয়েছেন এই বঙ্গ ভূমে, আবার কেউ সারাটা জীবন ছাপোষা কেরানীর কাজ করে চলেছেন। কেউ বা শরীর কে দিয়ে নিজের ও পরিবারের খুদা মেটাচ্ছে। কিন্তু আজ এমন এক বিচিত্র পেশা যা সচরাচর দেখা যায় না তার সাক্ষী থাকলো বরানগরের পথ চলতি মানুষ। যে পেশায় মানুষ নিজের জীবন অব্দি হাতের মুঠোয় রাখে।

বেলা ১২ টা নাগাদ যখন সূর্যি মামা মাঝ গগনে প্রায় তখন বেলঘড়িয়ার দূর্গা নগর থেকে ফেরার পথে বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে ঢালের কাছে ডানলপ ট্রাফিক গার্ডের বিশেষ ড্রাইভ যা ছিল চোখে পড়ার মত, রাস্তায় বিনা হেলমেট ও বিনা কাগজের গাড়ি চেকিং। যথারীতি পুলিশের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতোই ছিল। বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে আলমবাজারে এসে যেখানে এসে শেষ হয়েছে ঠিক তার আগে ঢালের মুখে একটি স্কুটি রাস্তার বাঁ দিকে দাঁড়িয়ে, চালক বসে আছে গাড়িতেই। দূর থেকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে চালক ও তার স্কুটি টিকে। ওভারব্রিজের রাস্তার ধার ঘেঁষে গার্ড ওয়াল সংলগ্ন ঘাসের উপরে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে গাড়িটি দেখেই মনে হচ্ছে কোনো সমস্যা হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই কৌতূহল বসত যখন জানতে চাওয়া হয়ে, “কোন সমস্যা কিনা?” স্কুটির চালকের তরফ থেকে তৎক্ষণাৎ উত্তর এলো, “তেল শেষ।” তা তেল শেষ যখন তাহলে এখানে কেন দাড়িয়ে? তার চেয়ে রাস্তার ঢাল বেয়ে ধীরে ধীরে ওভারব্রিজের নিচের দিকে এলেই তো পেট্রোল পাম্প পাওয়া যাবে। কিন্তু কোন জবাব না পাওয়ায়ে অবশেষে নিজেরাই রাস্তার শেষ প্রান্তে আলামবাজার সিগনালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুই জন সিভিক ভলেন্টিয়ারকে ব্যাপারটা জানানো পর ওরা গিয়ে স্কুটি টাকে ঠেলে নিয়ে এলো ওখানে থেকে মোড়ের মাথা অব্দি। দেখা গেল কর্মরত আরেক পুলিশ কর্মী স্কুটির চালক ছেলেটিকে দেখে চিনতে পেরেই এগিয়ে এলো। তিনি ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলেন, “আবার তুই? কি হয়েছে? তুই আবার এখানে কি করছিস আজকে?” কথাবার্তায় বেশ বোঝা যায় যে ছেলেটি ঐ পুলিশ কর্মীর পূর্ব পরিচিত। স্বভাবতই সাংবাদিকের কৌতূহলী মন ও চোখ এড়ানো গেল না। ইতি মধ্যে আরো দু-চারজন বাইক আরোহী ওখানে এসে দাঁড়ালেন। স্বভাবতই কিছুক্ষণের মধ্যে কিছুটা পথ চলতি মানুষের ভীর হয়ে গেল ছেলেটাকে ঘিরে। সবার কথায় বার্তা শুনে বেশ ভালই বোঝা গেল স্কুটির আরোহী কে এলাকার সকলেই চেনেন। এক বাইক আরোহীকে শুভময় বাবুকে ব্যাপারটা জানতে চাওয়া হলে, তিনি যা বললেন সেটা শুনে সবাই বেশ অবাকই হবেন। পথচারী ভদ্রলোক অসীম পাল তিনিও পূর্ণ সায় দিলেন শুভময় বাবু কে। শুভময় বাবু বলেন, “এই ছেলেটা রোজ বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে থেকে মুম্বাই রোড অব্দি বিভিন্ন জায়গাতে এভাবে স্কুটি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অসহায়ের মতো। কখনো গাড়িতে তেল নেই, কখনো গাড়ি খারাপ হয়ে গেছে, কখনো গাড়ি নিজেই পাল্টি করে রাস্তায় এক্সিডেন্ট হওয়ার ভান করে সহানুভূতি আদায় করে দুশো, পাঁচশো রোজগার করে। আজ থেকে ঠিক দুদিন আগে দাদা আমি আমার বাইক থেকে ২ লিটার তেল ওকে দিয়েছি, এমন ভাবে কাঁদছিলো গাড়িতে তেল নেই যাবে কি করে, জানেন দাদা মায়া হলো দেখে। পরে জানলাম এটা ও রোজকার খেলা! এটাই ওর পেশা।” কথাগুলো খুব উত্তেজিত ভাবে এক নিঃশ্বাসে বলেন গেলেন শুভময় বাবু। ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ কর্মী যিনি এর আগে ওকে চিনতেন তিনি বললেন “দাদা জানেন না এ খুব চালাক। আমি নিজে সেদিন ওর নাটকে ভুলে রাস্তায় লরি দাঁড় করিয়ে ওর গাড়ি লরিতে তুলে ড্রাইভার কে বলেছিলাম ওকে রানিহাটিতে নামিয়ে দিতে। আর নিজে দুশো টাকা ওকে দিয়েছিলাম। সেদিনকে জানতাম না যে ওটা ওর নাটক ছিল।”

বেশ কিছুক্ষন পুলিশ কর্মীদের কাছে ধমক খাওয়ার পর যখন গাড়ির কাগজ দেখতে চাওয়া হলে দেখা যায় ছেলেটার কাছে গাড়ীর কোন বৈধ কাগজপত্র নেই। এমনকি গাড়ির কোনো নম্বর প্লেট অব্দি নেই। কর্মরত পুলিশ কর্মীদের কাছে ততক্ষণে ছেলেটি বলতে শুরু করে দিয়েছে “দাদা ছেড়ে দিন আর আসবো না এইদিকে. আজকের মতো ছেড়ে দিন ।” ছেলেটির নাম জানতে চাওয়া হলে সে তার বলে রাকেশ কুমার বর্মা। বাড়ি হাওড়া উনসানি। বাড়িতে এক বোন আছে, মা আছে আর দুটো ভাই আছে। সে নিজেও শারীরিকভাবে পঙ্গু। শরীরের প্রায় ৭০ শতাংশ অংশ কাজ করে না যার মধ্যে বিশেষ করে দুটি পা। দেখা গেল কথাটা সত্যি এবং স্কুটি টাও 3 চাকার। কাগজ, নম্বর প্লেট কেনো কিছুই নেই। জিজ্ঞেস করতে সে বললো তার হ্যান্ডিক্যাপ কার্ড না হলে রেজিস্ট্রেশন নিচ্ছে না। যদিও কথাটা সত্যি নয় তা বোঝাই গেল। হ্যান্ডিক্যাপ কার্ড আবেদন করেছে কিন্তু কার্ড হাতে পায় নি আজও। গাড়ীর বৈধ কাগজপত্র না থাকায় গাড়িটাকে পুলিশ বাজেয়াপ্ত করবে শুনে হাত জোর করে বলতে লাগলো, “আমি স্বীকার করছি আমি এগুলো করি কিন্তু স্বভাবে নয় দাদা, অভাবে এই সব করছি। এগুলো করা ছাড়া কোনো উপায় নেই আমার আর। নিজের আর পরিবারের আরো ৪ টি পেট চালাতে হয় আমাকে।” বোঝাই যাচ্ছিল পুলিশ কর্মীরা বেশ নরম হয়ে পরছিল ছেলেটির কথা শুনে। আর হবেই বা না কেন? পুলিশও তো মানুষ আর তাই তাদেরও মানবিকতা আছে। তাকে শেষ বারের মতো সতর্ক করে গাড়িটা ছেড়ে দিলো ট্রাফিক পুলিশ। সে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেলো স্কুটি নিয়ে।

উপস্থিত সিভিক ও উপস্থিত পুলিশ কর্মী এবং বরানগর থানার এক দায়িত্বপ্রাপ্ত এস. আই. মানবিকতার জায়গা থেকে বলেই ফেললেন, “আমরা আর কি করবো বলুন, আইন অনুযায়ী শাস্তি হওয়া উচিত ছিল এই কাজের জন্য কিন্তু ওর গাড়ি বাজেয়াপ্ত করলে হয়তো ওর বাড়িতে হাঁড়িটাও চড়বে না। এরকম অনেক কিছু আমরা দেখেও না দেখার ভান করে থাকতে হয়। আরে দাদা আমরাও তো এই সমাজেরই মানুষ। কোন মঙ্গলগ্রহের প্রাণী নই। আমরাও বুঝি উপায় নেই এই ছেলেটির। সবাই পেটের খিদের জন্য লড়ছে। কেউ আইনের চোখে অপরাধী হচ্ছে আবার কেউ আইন নিয়ে খেলা করছে। এতসব দেখার পর এবার উপস্থিত সকলেরই শঙ্কিত ও লজ্জিত হওয়ার পালা।

সমাজের কাছে পুলিশ এক নিকৃষ্ট প্রাণী যা সকলেই নানা মাধ্যমের দয়ায়ে দেখেছেন ঠিকই কিন্তু পুলিশও যে মানুষ তা দেখতে পেলেন আজ। তাদেরও মায়া হয়ে তাদেরও দয়া হয়ে। কিন্তু আমাদের সামাজিক কাঠামোর গলদ ও তার আর্থিক বৈষম্যের সামনে দাঁড়িয়ে। গোটা ঘটনা ক্যামেরা বন্দি করা হয়ে ও সাংবাদিকতার দায়িত্ব শেষে মানবিকতার জায়গা থেকে কিছু প্রশ্ন তুলে গেলো ছেলেটি। তার সেই উক্তি “স্বভাবে নয় দাদা অভাবে এই সব করি” কথাটা এখনো কানে বাজছে। এই সমস্যা সমাধানের কোন উপায় বা পথে কারো জানা নেই। কেউ এর দায়িত্বও নেবে না। যে সকল পুলিশ কর্মী তাদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হাড়িয়েছেন, আজ ৩০শে সেপ্টেম্বর পুলিশ শহীদ দিবসে আর পাঁচজনের মত আমরাও জানাই আমাদের আন্তরিক সমবেদনা। শেষে শুধু এই টুকুই বলা যেতেই পারে “মানুষের আর এক নাম পুলিশ তাই মানবিক”।

You May Share This
  • 33
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    33
    Shares

One thought on “মানুষের আর এক নাম পুলিশ তাই মানবিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.