উড়ালপুলে ২০ চাকা পণ্যবাহী গাড়ী ওঠা নিষেধ হতে চলেছে।

Spread the love
  • 24
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    24
    Shares

 

অরিন্দম রায় চৌধুরী, সোদপুরঃ হেলিতে দুলিতে চলেছেন তারা। আর রাতের শহরের উড়ালপুলে তাই যানজট। এবার আর তাদের দেখা যাবে না। কারা তারা? তার আগে জানুন মাঝেরহাট সেতুর ভবিষ্যত কী হবে? রাজ্যের অন্যান্য উড়ালপুলের স্বাস্থ্য রক্ষা করতেই বা কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে? এসব নিয়ে গত ৬ই সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার নবান্নে বিভিন্ন দফতরের সঙ্গে বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। বৈঠকের পর তিনি জানান, মাঝেরহাট সেতুর শুধুমাত্র ভাঙা অংশ মেরামত করা হবে নাকি নতুন করে গোটা সেতুটিই তৈরি করা হবে সেবিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বিশেষজ্ঞ কমিটি। কিন্তু সেতুভঙ্গের দায় কার? মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি তদন্ত করে তার রিপোর্ট দেবে। এক্ষেত্রে দোষী যারাই হোক, কেউ ছাড়া পাবেন না বলে এদিন আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী।

গত সপ্তাহের বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পূর্তসচিব অর্ণব রায়ের কাছে জানতে চান, কেন ছ’বার টেন্ডার ডেকেও মাঝেরহাট সেতু সারাইয়ের কাজ শুরু করা গেল না? বর্তমান পূর্তসচিব কেন তাঁর পূর্বসূরি ইন্দিবর পাণ্ডে ও অর্থ দফতরের সঙ্গে কথা বলেননি তানিয়েও উষ্মা প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। মাঝেরহাট সেতু কেন ভেঙে পড়ল, রাজ্যের মুখ্যসচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটি তার কারণ অনুসন্ধান করছে। সেই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত জোকা-বি বা দী বাগ মেট্রো প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকবে বলে বৃহস্পতিবার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এতে মেট্রোর কাজ আরও বিলম্বিত হবে বলে আশঙ্কা করছেন প্রকল্পের কিছু আধিকারিক। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী এও মেনে নিয়েছেন, রাজ্যের অনেক সেতুর হালও খুবই খারাপ।


ওই দিন সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, অনেক সেতুরই আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে গিয়েছে। কোনটা কবে তৈরি হয়েছিল, আয়ুষ্কাল কত দিন, সে সব অবিলম্বে খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা হচ্ছে। ২০টি ব্রিজের আয়ুষ্কাল বা কর্মক্ষম থাকার মেয়াদ শেষ বলে তিনি জানতে পেরেছেন, বলেন মুখ্যমন্ত্রী। সাঁতরাগাছি সেতু, উল্টোডাঙা সেতু, ঢাকুরিয়া সেতু, শিয়ালদহ সেতু-সহ বেশ কয়েকটি সেতুর নামও তিনি জানিয়েছেন। সাঁতরাগাছি সেতুতে অবিলম্বে ভারী যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি জানিয়েছেন, সাঁতরাগাছি সেতু দিয়ে এখন মূলত যাত্রিবাহী গাড়ি চলবে। ভারী গাড়ি চলতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, “আমাকে তো ব্রিজগুলো বাঁচাতে হবে। এতগুলো একসঙ্গে দু্র্বল হয়ে গিয়েছে শুনছি। গত ১০০ বছর কেউ খোঁজ রাখেনি। এখন সব ক’টা একসঙ্গে খারাপ হলে তো মুশকিল।” ব্রিজ ভাঙলে তা নতুন করে তৈরি করার বা মেরামত করার জন্য টাকার অভাব হবে না মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দেন। কিন্তু এত সেতু একসঙ্গে নষ্ট হলে সড়ক পরিবহণ ব্যবস্থায় বড়সড় সমস্যা হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাই মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে এ বার থেকে ভারী গাড়ির উপরে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চলেছে পুলিশ।

মাঝেরহাট-কাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা আর যাতে না ঘটে সেজন্য একাধিক উদ্যোগ নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, সাঁতরাগাছি, উল্টোডাঙা, বেলগাছিয়া, শিয়ালদহ, ঢাকুরিয়া, চিংড়িহাটা, মাঝেরহাট-সহ ২০টি উড়ালপুল সারাইয়ের কাজ দ্রুত শুরু করবে সরকার। উল্টোডাঙা উড়ালপুলের মেরামতি নিয়ে রেলের সঙ্গে কথা হবে বলেও মুখ্যমন্ত্রী জানান। পূর্ত দফতর, সেচ দফতর ও কেএমডিএ-র অধীনে থাকা সেতুগুলির রক্ষণাবেক্ষণে আলাদা আলাদা সেল তৈরি করবে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

এবার আসা যাক সেই প্রাথমিক প্রশ্নে। কাদের রাজ্যের আর কোনও উড়ালপুলে দেখা যাবে না। উত্তরটাও খুবই সহজ। রাজ্যের কোনও উড়ালপুলেই আর ২০ চাকার গাড়ি উঠতে দেওয়া হবে না। উড়ালপুলে ওভারলোডেড গাড়িও যাতে উঠতে না পারে সেজন্য পুলিসকে নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, কোথাও কোনও সেতুর নীচে কাউকে থাকতে দেওয়া যাবে না। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। কোনও সেতুর ওপরই বিটুমিনের বোঝা বাড়িয়ে প্যাচ ওয়ার্ক করা যাবে না।

এদিকে মাঝেরহাট ব্রিজ বিপর্যয়ের পর নজরদারি চালাতে গিয়ে দেখা যায় ডানলপ সেতুর পিলারের উপরের গার্ডারগুলিকে যে বিয়ারিং ধরে রেখেছে, সেখানে সমস্যা তৈরি হয়েছে। সরে গিয়েছে বেশ কিছু বিয়ারিং। অবিলম্বে তা মেরামত না হলে সমস্যা তৈরি হতে পারে। সেই কারণে সংস্কার চালানো হবে অতি সত্বর। তার আগে ব্রিজটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে ডানলপ মোড়ের যানজট ফের বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মাত্র ছ’বছর আগে তৈরি হওয়া সেতুই পড়ে গেল ‘বাতিলে’র তালিকায়। পুজোর আগে যান চলাচল নিষিদ্ধ হল ডানলপ ব্রিজে। আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ভারী কোনও যান চলাচল করতে পারবে না এই ব্রিজ দিয়ে। মাঝেরহাট ব্রিজ বিপর্যয়ের পরই অন্যান্য সেতু ও উড়ালপুলের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় নামার পরই রোগ ধরা পড়ল ডানলপ ব্রিজে।

উত্তর শহরতলির গুরুত্বপূর্ণ এই ডানলপ ব্রিজ। এই ব্রিজটি হওয়ার পর ডানলপ মোড়ের যানজট মুক্তি ঘটেছিল। কিন্তু মাত্র ছ-বছরের মধ্যে ব্রিজটি বাতিলের তালিকায় পড়ে যাওয়ায় ফের পুরনো সমস্যা ফিরে আসতে পারে। পুজোর আগে তীব্র যানজট তৈরি হতে পারে দক্ষিণের পর উত্তরেও। কলকাতার দুই প্রবেশদ্বারই সমস্যাকীর্ণ হয়ে পড়তে চলেছে এর ফলে। রাজ্যের তরফে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ভারী যান চলাচলে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। সে জন্য বাঁশের ব্যারিকেড করে শুধু বাইক বা সাইকেল যাওয়ার মতো সংকীর্ণ করে দেওয়া হচ্ছে অ্যাপ্রোচ রোড। ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে এই ডানলপ ব্রিজ চালু হয়েছিল।


এদিকে এই সেতুগুলি কেন এত তাড়াতাড়ি ধ্বংসের মুখে যাচ্ছে তা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন পশ্চিমবঙ্গ সরকার। কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে পরিবহন শিল্পের বেশ কিছু সংস্থা সহজে বেশী লাভ করার জন্য পণ্যবাহী গাড়ীর বহন ক্ষমতার চেয়ে বেশী মাল নিয়ে যাতায়াত করে বলে অভিযোগ। কিন্তু তাতে একদিকে যেমন রাস্তারগুলোর উপর চাপ পড়ে ঠিক তেমনই সেতুগুলির উপর বহন ক্ষমতার চেয়ে বেশী ওজনের চাপ গিয়ে পড়ছে। আর তাতেই বয়েসের সাথে সাথে সেতুগুলির অবস্থা বেশ কিছুটা খারাপ হচ্ছে। যার জ্বলন্ত উধাহরন ডানলপ ব্রিজ। মাত্র ৬ বছরেই বেহাল অবস্থার সম্মুখীন এই সেতু।

১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ সোদপুর মোড়ে রাত ১০টা থেকে তারই প্রমাণ মিলল যখন দেখা গেল ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটের ট্র্যাফিক বিভাগের সাথে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রোড ট্র্যাফিকের দপ্তর ও স্থানীয় খড়দহ থানার পুলিশের আর.এফ.এস.২ সম্মনয় যৌথ অপারেশন। রাতের দিকে যথারীতি পণ্যবাহী গাড়ীগুলিকে সতর্কতার সাথে কাগজপত্র পরীক্ষা করে দেখে তার মালের ওজন করিয়ে দেখে নিচ্ছিলেন সংলিষ্ট দপ্তরের আধিকারিকরা। ১৪ তারিখ রাতে এই যৌথ অভিযানে হাতে নাতে ধরাও পড়ে বেশ কিছু পণ্যবাহী গাড়ী। এদিনের অভিযানে হাজির ছিলেন ব্যারাকপুর ট্র্যাফিকের ওসি সেন্ট্রাল রাজেশ মন্ডল, ওসি ব্যারাকপুর সাব ট্র্যাফিক গার্ড বিজয় ঘোষ সোদপুর সাব ট্র্যাফিক গার্ডের এক আধিকারিক সহ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিবহন দপ্তরের অরুণ দাস ও নাজিমুল হক। বলাই যায় এবার নড়ে চড়ে বসেছে সরকারী দপ্তরগুলি তাই আগামী দিনে আরও বড় কোন অভিযান যে হতে চলেছে তা বলাই বাহুল্য।

সম্পর্কিত সংবাদ