রাজা রামমোহন রায় এবং কলকাতা পুলিশ মিউজিয়াম

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

ওয়েবডেস্ক, বেঙ্গলটুডে, কলকাতাঃ

 

কে ওই মেয়েটি ? সবার থেকে আলাদা! ভিড়ের মধ্যেও চোখে পড়তে বাধ্য।

নাচের আসর জমজমাট। যাঁরা নাচছেন,তাঁদের পোশাকে রঙের রোশনাই। শরীরে ঝলমল গয়নাগাটি থেকে আলো ঠিকরোচ্ছে যেন। রকমারি বাদ্যযন্ত্র সুর তুলছে মাতোয়ারা। তালে তালে নাচছে মেয়েরা।যাদের মধ্যে একজন,ওই মেয়েটি, বিভঙ্গের বাহারে নজর কাড়ছে মন্ত্রমুগ্ধ অতিথিদের।নাচছে তো নয়, যেন উড়ে বেড়াচ্ছে।

‘ Who is she ?’ গৃহকর্তাকে জিজ্ঞেস না করে পারেন না ফ্যানি।

গৃহকর্তার চেহারায়-চলনে-বলনে আভিজাত্যের অনায়াস আধিপত্য। দীর্ঘকায়, সৌম্যদর্শন, কথাবার্তা অত্যন্ত মার্জিত। যেমন পাণ্ডিত্য, তেমনই রুচিবোধ। অতিথি ফ্যানির প্রশ্নের জবাব দেন সহাস্যে।

‘ ওই মেয়েটি ? ওর নাম নিকি। দেশের সেরা নর্তকী বলতে পারেন স্বচ্ছন্দে। কয়েক ঘন্টার নাচের জন্য পারিশ্রমিক কত নেয়, আন্দাজ করুন দেখি ? এক হাজার টাকা !”

ফ্যানি হাঁ হয়ে যান শুনে। ফ্যানি পার্কস,উনিশ শতকের ব্রিটিশ পর্যটক,এবং ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্ট চার্লস ক্রফোর্ড পার্কসের সহধর্মিনী। যিনি পরে বিখ্যাত হবেন “Begums,Thugs and White Mughals” বইটির রচয়িতা হিসাবে। সুদূর ওয়েলস থেকে ভারতে এসেছেন। ভারতের বহু রাজারাজড়া-জমিদারের বাড়িতে নিমন্ত্রিত হয়েছেন। কিন্তু কলকাতার ৯৩, আপার সার্কুলার রোডের এই বাগানবাড়ির ব্যাপারস্যাপারই আলাদা। এসেছেন নৈশভোজের আমন্ত্রণে। পোশাকি নাম ‘ নৈশভোজ’, আসলে পার্টি। একটু সুর,একটু সুরা,একটু স্বাস্থ্যপান। আতিথ্যে যাতে তিলমাত্র ত্রুটিও না হয়, কড়া নজর বাড়ির মালিকের।

গৃহকর্তার নাম আন্দাজ করার জন্য কোন পুরস্কার নেই। সেই ১৮২৩ সালে,সে কালের অতি রক্ষণশীল সমাজের চোখরাঙানিকে অগ্রাহ্য করে খাস কলকাতায় নিজের বাড়িতে নাচাগানা-খানাপিনার এলাহি আয়োজন করার মতো বুকের পাটা আর কারই বা ছিল? ভারতীয় নবজাগরণের প্রাণপুরুষ রাজা রামমোহন রায় ছাড়া ?

ফ্যানির স্মৃতিচারণায় অবশ্য নিকির নৃত্যশৈলী বা গৃহকর্তার আতিথ্যের চেয়েও বেশি প্রশংসা পেয়েছিল ওই বাড়িটি। যার স্থাপত্য মুগ্ধ করেছিল ফ্যানিকে। আসবাবপত্রে হোক বা অন্দরসজ্জায়,এ বাড়ি ছিল আর পাঁচটা বাগানবাড়ির থেকে আলাদা। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাবেক কলকাতার অনেক ইতিহাস। জড়িয়ে আছে কলকাতা পুলিশেরও অতীত। এবং বর্তমান। সেই কাহিনিই আজ।


আপার সার্কুলার রোডের (অধুনা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড) উপর তৈরি হয়েছিল এই বাড়ি। বাড়ির ইতিহাস দীর্ঘ। এমনকি রাস্তারও। আঠারো শতকে বর্গিদের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে প্রায় তিন মাইল লম্বা খাল কেটেছিল ইংরেজরা। পরে গভর্নর জেনারেল ওয়েলেসলির নির্দেশে সেই খালই বুজিয়ে তৈরি হয়েছিল আপার সার্কুলার রোড। শ্যামবাজার থেকে বউবাজার পর্যন্ত। রামমোহনের বাড়িটি ছিল এই রাস্তার উপরেই সুকিয়া স্ট্রিটের কাছাকাছি। এই বাড়িতে চোদ্দ বছর বসবাস করেছিলেন রামমোহন। ১৮১৬ থেকে ১৮৩০।

তখনকার কলকাতায় জায়গার অভাব ছিল না। বাড়িটি গড়ে উঠেছিল প্রায় ১৫ বিঘা জমি নিয়ে। স্থাপত্যরীতিতে পাশ্চাত্যের নিরঙ্কুশ দাপট। ফ্যানি পার্কসের লেখনীতে,” The house was very handsomely furnished, everything in European style, with the exception of the owner.”

বাড়ির সীমানার ভিতরে তিন-তিনটে পুকুর। চারপাশে বাগান আর গাছপালায় সবুজে সবুজ। বাড়ির দোতলায় রামমোহন নিজে থাকতেন। আড্ডা-গানবাজনা-আলোচনাসভা,সব মিলিয়ে ভারি প্রাণচঞ্চল থাকত রামমোহনের এই প্রিয় বসতবাটি। যে বাড়ি ছিল উনিশ শতকীয় বাংলার নবজাগরণের অন্যতম ধাত্রীভূমি।

এমন রাজকীয় বাসভবনও বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হল রামমোহনকে, ১৮৩০ সালে। ইংল্যান্ডে পাড়ি দেওয়ার আগে। কলকাতায় আশু ফেরার সম্ভাবনা কম। তাছাড়া হাতে কিছু টাকারও প্রয়োজন।’ সমাচার দর্পণ’ পত্রিকায় বাড়ি বিক্রির সেই বিজ্ঞাপন হুবহু তুলে দিলাম নিচে।

“৯ই জানুয়ারি ১৮৩০/২৭ পৌষ ১২৩৬

ইশতেহার – স্থাবরধন পাবলিকসেলে অর্থাৎ নীলামে বিক্রয় হইবেক ।

সন ১৮৩০ সালে আগামি ২১শে জানুয়ারি বৃহস্পতিবার টালা কোম্পানির সাহেবরা তাহাদের নীলামঘরে নীচের লিখিত স্থাবরধন পাবলিক অক্সেন অর্থাৎ নীলাম করিবেন বিশেষতঃ আপার সার্কুলার রোড সিমলার মানিকতলাস্থিত বাটী ও বাগান যাহাতে এক্ষণে বাবু রামমোহন রায় বাস করেন । ঐ বাটির উপরে তিন বড় হাল অর্থাৎ দালান ছয় কামরা দুই বারান্দা ও নীচের তলায় অনেক কুটরী আছে এবং ঐ বাটীর অন্তঃপাতি গুদাম ও বাবুর্চিখানা ও আস্তাবল প্রভৃতি আছে ।

এবং ১৫ বিঘা জমির এক বাগান ও বাগানে অতিউত্তম সমভূমি ও পাকা রাস্তা ও তাহাতে নানাবিধ ফলের গাছ ও তিনটা পুষ্করিণী আছে । ঐ বাগানে কলিকাতার সীমার মধ্যস্থ গভর্নমেন্ট হাউস হইতে গাড়িতে বিংশ মিনিটে পৌঁছন যায় ।

ঐ বাটি ও ভূমির চতুঃসীমা এই বিশেষতঃ উত্তরদিগে গদাধর মিত্রের বাগান দক্ষিণদিগে সুকেশের স্ট্রীট নামে রাস্তা পূর্বদিগে সার্কুলার রোড নামে সড়ক এবং পশ্চিমে ও উত্তরপশ্চিমে রূপনারায়ণ মল্লিকের বাগান । ঐ বাটী ও বাগান যিনি দেখিতে চাহেন তাঁহার দেখিবার কিছু বাধা নাই । ”

বাড়ি কিন্তু সহজে বিক্রি হয়নি।’ কলিকাতা দর্পণ’ পত্রিকায় রাধারমণ মিত্রের ( লেখক,এবং মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত বিপ্লবী) লেখা থেকে জানা যায়, বিজ্ঞাপন প্রকাশের বেশ কিছুকাল পরে এক আর্মেনিয়ান ভদ্রলোক বাড়িটি কেনেন। সরকার বাড়িটি ভাড়া নেয় আরও অনেক পরে।

কলকাতা পুলিশের সঙ্গে এ বাড়ির যোগসূত্র ১৮৭৪ সাল থেকে। সুকিয়া স্ট্রিট থানার কাজকর্মের জন্য ভাড়া নেওয়া হয় বাড়িটি। ভাড়াবাড়িতেই থানার কাজ চলেছিল বেশ কিছুদিন। ১৯১৮ সালের পয়লা এপ্রিল তদানীন্তন সরকার বাড়িটিকে কিনেই নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সময়ে দাম পড়েছিল ১৫,৯০৯ টাকা। কম নয় নেহাত!

ঠিকানা ততদিনে বদলে গিয়ে হয়েছে ১১৩,আপার সার্কুলার রোড। মূল বাড়ির লাগোয়া আর একটি ভবন নির্মিত হয়েছে, যা ব্যবহৃত হত ডিসি নর্থের কার্যালয় হিসাবে। এখনও ওখানেই অফিস ডিসি-র।

আরও দশ বছর পরে, ১৯২৮ সালে সুকিয়া স্ট্রিট থানা অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়। নামও বদলে হয় আমহার্স্ট স্ট্রিট থানা। এই বাড়ির সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। হেরিটেজ বিল্ডিংটি তখন ব্যবহৃত হত কলকাতা পুলিশের বিভিন্ন কার্যালয় হিসাবে। দীর্ঘদিন এমনই চলেছিল।

এগিয়ে যাই বেশ কয়েক দশক। আটের দশক পেরিয়ে নয়ের শুরুর দিক। সময়ের ধকল সইতে না পেরে বাড়িটি তখন স্বাস্থ্য হারিয়েছে। জরাজীর্ণ ভগ্নপ্রায় দশা। বাড়িটির সংস্কার এবং সংরক্ষণ প্রয়োজন,সিদ্ধান্ত নেয় কলকাতা পুলিশ। স্থির হয়, এই বাড়ির ইতিহাসকে যথাযথ মর্যাদা দিতে একটি সংগ্রহশালা নির্মাণ করা হবে। রামমোহনের স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িতে কলকাতা পুলিশের সেই সংগ্রহশালার দ্বারোদঘাটন হয় ১৯৯৬ সালে।

সংগ্রহশালা চালু হওয়ার কিছুদিন পরে স্থানাভাব দেখা দিল । ঠিক হল,বাড়ির স্থাপত্য ও কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখেই ঘরের সংখ্যা বাড়ানো হবে। চালু হওয়ার সময় ঘরের সংখ্যা ছিল তিন। সংস্কারের পর বেড়ে দাঁড়াল এগারোয়। ২০০৭ সালের ৬ জুলাই এই সংগ্রহশালা নবকলেবরে আত্মপ্রকাশ করল।

রামমোহন রায়ের দ্বিশতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহাসিক বাড়ি। যার চার দেওয়ালের মধ্যে এখন একত্রে বসবাস বহু নথির, ইতিহাসের অচেনা-অদেখা নানা সম্ভারের। রয়েছে আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলার অস্ত্রশস্ত্র-বোমা-গুলি। তৎকালীন চিফ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড সাহেবকে হত্যা করার জন্য বিপ্লবীরা তৈরি করেছিলেন যে বইবোমা, সেটিও রয়েছে সংরক্ষিত।

১৯৪৭ সালে দাঙ্গার সময় মহাত্মা গান্ধীর অনুরোধে তাঁর কাছে জনসাধারণ কর্তৃক সমর্পণ করা অস্ত্রশস্ত্র আছে এখানে, আছে ১৯১০ সালের ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলার নথি। রয়েছে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের তৎপরতায় উদ্ধার করা প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য মূর্তি কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতার বুকে জাপানিদের ছোড়া বোমার খালি খোলও। অল্পই বলা গেল এখানে, আছে আরও অনেক কিছু।

সব বাড়ি বদলে যায় না। কিছু বাড়ি থাকে, যেখানে ইতিহাস আর ঐতিহ্য হাত ধরাধরি করে হাঁটতে থাকে পাশাপাশি। সোম থেকে শনি, খোলা থাকে এই সংগ্রহশালা। দশটা থেকে পাঁচটা।

সম্পর্কিত সংবাদ

Leave a Comment