শহিদ মাতাদিন বাল্মীকির প্রতি ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের শ্রদ্ধার্ঘ্য

Spread the love
  • 27
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    27
    Shares

 

অরিন্দম রায় চৌধুরী, ব্যারাকপুরঃ ব্যারাকপুর শহর, ১৮৫৭ সালের ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ বা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম যুদ্ধের কথা বলে। অনেক গবেষকরা বেশ কয়েকটি বই এবং নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন সময় এই নিয়ে। ১৮৫৭ সালের মহান ঘটনার অনেক ঘটনা এবং দিক গুলি ইতোমধ্যে গভীরভাবে আলোচনাও করা হয়েছে নানা স্থানে নানা সময়। আমাদের উদ্দেশ্য বিদ্রোহ সম্পর্কে সুপরিচিত বিবরণ পুনরাবৃত্তি করা হয় না। অনেকেরই হয়তো অজানা দলিত সম্প্রদায়ের একজন সাফাই কর্মীর সাথে সম্পর্কিত দমদম অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরী থেকে ছড়িয়ে পড়া ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি ঘটনার প্রতি সকলের মনোযোগ আকর্ষণের করা।

এটি এখন একটি গ্রহণযোগ্য সত্য যে বিদ্রোহটি ভারতীয় সৈন্যবাহিনী দ্বারা পরিচালিত হলেও তা বাংলার সেনা বাহিনীর মধ্যে সীমিত ছিল না, সাধারণ জনগণের সাথেও ইংরেজ বাহিনীর সাথে নানাবিধ বিদ্রোহের ঘটনা সেই সময় দেশের নানা অংশে ছড়িয়ে পরেছিল।

ভারতবর্ষের ইতিহাসে ব্যারাকপুরের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ১৮৫৭ সালের সিপাই বিদ্রোহের কাহিনী। যা এই ব্যারাকপুরেই প্রথম সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল। তাই ব্যারাকপুর শহর ঐতিহ্যবাহী শহর। সকলেই জানেন যে মঙ্গল পাণ্ডেই প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের শহিদ কিন্তু মঙ্গল পাণ্ডেকে সে কারণে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল ইংরেজ সরকার সেই মামলার প্রথম দণ্ডপ্রাপ্ত হলেন মাতাদিন বাল্মীকি। কর্মসূত্রে তিনি দমদম অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরির সাফাই কর্মী ছিলেন আর সেখান থেকে তিনি প্রথম জানান দেন গরু ও সুকরের চর্বি দিয়ে তৈরি তখনকার দিনে নতুন বন্দুকের গুলি যা তখন প্রত্যেক সিপাইকে দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে নিজের বন্দুকে ভরতে হতো তার সম্বন্ধে। তার কারণেই সিপাই ছাওনি দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে সংগ্রামের আগুন। এই অপরাধে মাতাদিন বাল্মীকি কে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় এবং তার ফাঁসি হয়। মাতৃভূমির জন্য মাতাদিন বাল্মীকি ও তার সহধর্মিণী তাদের নিজের জীবনের বলিদান দেন।

অনেকেই এতদিন হয়েতো এই ইতিহাস থেকে বঞ্চিত ছিলেন যা ২০১৮-র আগস্ট মাসে ব্যারাকপুর ধোবিঘাটের বাস স্টপের নামকরণ হওয়ার পর জানতে পারলেন। এই বাস স্টপটি ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের সি.ই.ও অনন্ত আকাশের তত্বাবদনে তৈরি হয়। এই প্রসঙ্গে সি.ই.ও অনন্ত আকাশ আমাদের বলেন, “দেখুন বাল্মীকি সমাজের তরফ থেকে লোকজন এসে আমার সাথে দেখা করে আমাকে মাতাদিন বাল্মীকির সম্বন্ধে বলেন ও অনুরোধ করেছিলেন যে মাতাদিন বাল্মীকিকে নিয়ে কিছু করতে। তাই আমাদের তরফ থেকে এই ছোট্ট প্রচেষ্টা করা হয়েছে। আমরা ব্যারাকপুর ধোবিঘাট বাস স্টপকে নির্মাণ করে তা মাতাদিন বাল্মীকির নামে উৎসর্গ করলাম। এই প্রথম শহিদ মাতাদিন বাল্মীকি কে স্মরণ করে একটি বাস স্টপের নামকরণ করা হল। শুধু এটাই নয় আগামী দিনে ব্যারাকপুর কোর্টের পাশে আম্বেদকর পার্কার পুনঃ নির্মাণ করে সেখানে একটা আম্বেদকরজির মূর্তি স্থাপন করবো ও পার্কেটিকে একটি বিনোদনমূলক স্থান হিসেবে গড়ে তুলবো।” তিনি এই পিছিয়ে পড়া বর্গের উন্নয়ন নিয়ে বলেন, “আসল ব্যাপারটাই শিক্ষার উপর দাড়িয়ে। তাই বাল্মীকি সমাজ ও তার সাথে সাথে সকল ধর্ম বর্গের মানুষকে শিক্ষিত করা গেলেই আমাদের সমাজ আরও এগিয়ে যাবে। তাই কিছু কম্পিটিটিভ পরীক্ষার আমরা ফ্রি কোচিং এর ব্যাবস্থা করার কথাও আমরা ভাবছি।”

ব্যারাকপুরের বাল্মীকি ওয়েলফেয়ার সোসাইটির পক্ষ থেকে রাজেন বাল্মীকি বলেন, “ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এমন অনেক নিম্ন বর্গের মানুষ যেমন চেতন যাতভ,বাল্লু মেথর, বাঙ্কে চামার বা ভিড়া পাসির মতন অনেকে তাদের আত্মবলিদানের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভাগীদার কিন্তু তারা সকলেই বরাবর অবহেলিত। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ মামলার প্রথম আসামি মাতাদিন ভঙ্গি ছিলেন যিনি ব্রিটিশ কোর্টে দোষী সাব্যস্ত হন এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। এই মামলায় দ্বিতীয় অভিযুক্ত মঙ্গল পান্ডে ছিলেন। এই প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ ডঃ এম.এস. জয়প্রকাশ বলেন, যেহেতু একজন ভঙ্গি এই সিপাহী বিদ্রোহে অংশগ্রহণের জন্য মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত প্রথম অভিযুক্ত হন, তাই তিনিই প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকৃত নায়ক ছিলেন। আজ ৮ই আগস্ট ২০১৮ আমরা ব্যারাকপুর বাল্মীকি ওয়েলফেয়ার সোসাইটির তরফ থেকে ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের সি.ই.ও অনন্ত আকাশ মহাশয় যে ব্যারাকপুরে ধোবিঘাট বাস স্টপের নাম করন মাতাদিন বাল্মীকির নামে করেছেন তার জন্য ওনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।”

ক্যান্টনমেন্টে বোর্ডের নতুন এই যুব সি.ই.ও-র কর্ম পন্থা যে আপামর ব্যারাকপুর বাসীর কাছে সাধুবাদের যোগ্য তা বলাই বাহুল্য। এখন দেখার আগামী দিনে ঐতিহ্যবাহী ব্যারাকপুর শহরের শ্রী বৃদ্ধি ঘটাতে অনন্ত আকাশ মহাশয়ের অবদান কতটা থাকে।

সম্পর্কিত সংবাদ