দেশের অন্যতম ২৫টি নোংরা শহরের মধ্যে ১৯টিই পশ্চিমবঙ্গের !!

Spread the love
  • 11
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    11
    Shares

 

অরিন্দম রায় চৌধুরী, ব্যারাকপুরঃ সম্প্রতি কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগরোয়ন্নন মন্ত্রকের এক সার্ভে রিপোর্টে উঠে এসেছে এমন তথ্যই৷ তালিকায় রয়েছে, দার্জিলিং, শিলিগুড়ি, শ্রীরামপুর, মধ্যমগ্রাম, উত্তর বারাকপুর, বাঁকুড়ার নাম৷ বিভিন্ন স্যানিটেশন ইন্ডিকেটরের নিরিখে এই রিপোর্ট পেশ করা হয়৷ এরমধ্যে ছিল আবর্জনার ঠিকমত সাফাই, বর্জ্য পদার্থের যথাযথ নিকাশি ব্যবস্থা, খোলা জায়গায় শৌচকর্ম করা৷ সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, তিনটি ক্ষেত্রেই বাংলার বহু জায়গার ছবি হতাশাজনক৷ অতএব স্বচ্ছতা সর্বেক্ষণ সার্ভে-২০১৮ এ যে ডাহা ফেল পশ্চিমবঙ্গ তা বলাই বাহুল্য।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে ভারতের ১ লাখের বেশি জনসংখ্যা বিশিষ্ট ৫০০ শহর ও রাজ্যগুলোর উপর পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে আবর্জনা সংগ্রহের মতো একাধিক বিষয়ে সমীক্ষা চালিয়ে একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। কারভি ডাটা ম্যানেজমেন্ট সংস্থার ২৭০০ কর্মী ৪২০৩টির বেশী এলাকা ঘুরে এই তালিকা তৈরি করেছেন। এই কাজ করতে মোট সময় লেগেছে ৬৬ দিন।

উল্লেখ্য, মোট ৬টি বিষয়ের ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে পুরসভার থেকে কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহন, বর্জ্যের প্রক্রিয়াকরণ ও অপসারণ, সুষ্ঠু শৌচব্যবস্হা, আবর্জনা সাফাই ও প্রক্রিয়াকরণের বাস্তবায়ন। সেনা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলোকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সম্প্রতি আবাসন ও নগর বিষয়ক মন্ত্রক এই তালিকা প্রকাশ করেছে। এই রিপোর্ট অনুযায়ী সবচেয়ে অপরিচ্ছন্ন ২৫ টি শহরের মধ্যে ১৯টিই হল পশ্চিমবঙ্গের। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দার্জিলিং, শিলিগুড়ি, শ্রীরামপুর, মধ্যমগ্রাম, উত্তর বারাকপুর ও বাঁকুড়া। এই তালিকায় বিহার ও উত্তরপ্রদেশের তিনটি করে শহর আছে।

কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগর বিষয়ক দপ্তরের গতমাসেই প্রকাশিত ‘স্বচ্ছ সর্বেক্ষণ’ ২০১৮-র তালিকা অনুসারে দেশের ২৫টি অপরিষ্কার শহরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেরই ১৯টি শহরের নাম। দেশের মধ্যে সবথেকে অপরিচ্ছন্ন চারটি রাজ্যের নাম পশ্চিমবঙ্গ, নাগাল্যান্ড, পুদুচেরি এবং ত্রিপুরা। শনিবার ইন্দোরে এই সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

এই তালিকা অনুসারে দেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন রাজ্য ঝাড়খণ্ড। দ্বিতীয় মহারাষ্ট্র ও তৃতীয় ছত্তিশগড়। দেশের পরিচ্ছন্ন শহরগুলির মধ্যে প্রথম নাম রয়েছে ইন্দোরের। এই তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে আছে ভূপাল ও চণ্ডীগড়। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী কেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত বারাণসী এই তালিকায় গতবারের ৩২ তম স্থান থেকে উঠে এসেছে ২৯ তম স্থানে। রাজ্যগুলির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ রয়েছে ৩৮ তম স্থানে। আর পশ্চিমবঙ্গের মোট ৬০টি শহরের মধ্যে যেমন হাবড়া রয়েছে ১ম স্থানে তেমনই আবার সর্বশেষ অর্থাৎ ৬০তম শহর হলো ভদ্রেশ্বর, কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে দেখা যাচ্ছে ঐতিহ্যপূর্ণ শহর ব্যারাকপুর ও উত্তর ব্যারাকপুর শহর রয়েছে যথাক্রমে ২৭তম ও ৫৮তম স্থানে। যা সম্পূর্ণ ভারতবর্ষের ৪৭১টি শহরের মধ্যে ৪৪৮ তম ও ৪৬৯তম স্থান। অর্থাৎ একেবারে পেছনের দিকে। বা ভারতবর্ষের নোংরা শহরগুলির প্রথম দিকে।


যদিও এই রিপোর্ট প্রকাশ হতেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া উঠে আসছে বিভিন্ন মহল থেকে৷ কেউ বলছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলতেই এই তালিকা তুলে ধরা হয়েছে৷ কারও বা মত, যেসব রাজ্যগুলিকে কেন্দ্র মাথায় তুলে নিয়ে নাচছে তাদের অধিকাংশ বিজেপি শাসিত৷ সুতরাং এইক্ষেত্রেও রাজনীতির গন্ধ পাচ্ছেন কেউ কেউ৷

অনেকেই বলছেন, বাংলাকে কোন ঠাসা করার আগে কেন্দ্র সরকারের মনে রাখা উচিৎ WHO গতবছর যে রিপোর্টটি প্রকাশ করেছিল তার কথা৷ বিশ্বের ১৫টি দূষিত শহরের মধ্যে ১৪টি শহরই ছিল ভারতের৷ আর এই তালিকায় শীর্ষে ছিল কানপুরের নাম৷ এমনকি সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্টেশনগুলির পরিচ্ছন্নতা নিয়ে রেলের তরফে একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে৷ সেই রিপোর্ট বলছে, কানপুর সেন্ট্রল স্টেশন দেশের মধ্যে সবথেকে নোংরা রেল স্টেশন৷


উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুর মহকুমার অন্তর্গত উত্তর ব্যারাকপুর শহরটি অবশ্য ঐতিহ্যবাহী শহর যা গঙ্গার তীরবর্তী অবস্থান হওয়ায়ে বেশ নিরিবিলি ও ছিমছাম এলাকা বলেই পরিচিত। এই এলাকার প্রায় ৬৫% অঞ্চল জুড়ে রয়েছে আর্মি, এয়ারফোরস ও নেভাল বেস। এলাকাজুড়েই রয়েছে নানা সুপ্রাচীন বড় বড় গাছ-গাছালী। এই সমস্ত এলাকার পরিষেবার ভার রয়েছে উত্তর ব্যারাকপুর পৌরসভার উপর। এই বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে উত্তর ব্যারাকপুর পৌরসভার পৌরপ্রধান মলয় ঘোষ বলেন, “কোথায় কোন সার্ভে হলো, কাদের দিয়ে করালও, আমরা তো কিছুই জানিনা। আমাদের তো জানাতে হবে যে সার্ভে হচ্ছে। যেমনই আজকে অর্থাৎ ২৭শে জুনের খবরের কাগজে দিয়েছে যে ব্রিটিশ একটা সংস্থা সার্ভে করে দেখেছে যে ভারতবর্ষে মেয়েদের নিরাপত্তা নেই। এখন ভারত সরকার কেন চিৎকার করছে তাহলে? তাই আমার এখানে যখন কোন সার্ভে করতে হবে তখন সেটা তো আমার ইউ.এল.বি কে জানাতে হবে, আর আমরা কিছুই জানি না, কারা কি সার্ভে করে চলে গেল আর আমাকে সেটা মেনে নিতে হবে? তা তো হয়ে না।”

মলয় বাবু আরও বলেন, ” উত্তর ব্যারাকপুর পৌরসভার অন্তর্গত এলাকায় ৬৫% কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থা আছে। যার মধ্যে মেটাল অ্যান্ড গান শেল ফ্যাক্টরি থেকে শুরু করে এয়ার ফোরস, অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি, শেলের মত কেন্দ্রীয় সরকারী সংস্থা আছে। তাদের গারবেজ দিয়ে এলাকা পলিউটেড করে দিচ্ছে। আমি দিনের পর দিন তাদের চিঠি দিচ্ছি কিন্তু সেদিকে তাদের খেয়াল নেই। এটা তো পশ্চিমবাংলায় মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর ‘নির্মল বাংলা’ -এ ভারতবর্ষের মধ্যে শ্রেষ্ট, সেখানে অন্যান্য বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি পিছিয়ে যাচ্ছে বলেই এটা বানানো হয়েছে। এই সার্ভে কোথায় করলো? তারা দেখাক না এই উত্তর ব্যারাকপুর এলাকায় ওনারা যে সার্ভে করেছে তার চিঠি আমাদের দিয়েছে সেটা দেখাক না”

মলয় বাবু বেশ কটাক্ষের শুরেই বলেন, “এটা একদম রাজনৈতিক ভাবে উদ্যেশ্যপ্রনদিত ভাবে আমাদের রাজ্যকে ছোট করার জন্য এই সার্ভে। আসলে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী সারা ভারতবর্ষে তার যে একটা সম্মোহনী শক্তি প্রভাবিত করতে সক্ষম হচ্ছেন তাই বিজেপি ভয় পেয়ে যাচ্ছে। এটা তো ক্রিয়েটেড তা সহজেই বোঝা যায়।”

মলয় বাবু উত্তর ব্যারাকপুর পৌরসভার কাজকর্ম বোঝাতে গিয়ে বলেন, ” ‘নির্মল বাংলা’ প্রকল্প অনুযায়ী আমাদের পৌরসভা দুই বেলা এই সাফাই কাজ করা হয়ে। এই সার্ভে রিপোর্টের জন্য উত্তর ব্যারাকপুরের মানুষ ধিক্কার জানাবে। কারণ উত্তর ব্যারাকপুরের মানুষ তো জানে তাদের পৌরসভা কেমন। কেমন পৌর পরিসেবা পায় এখানকার মানুষ তা সকলেরই জানা। আমরা বাড়ি বাড়ি থেকে আবর্জনা সংগ্রহ করি, তা দুই বেলা পরিষ্কার করা হয়। কোথাও কোন জল জমার ব্যাপার নেই। এখানে কে. এম. ডিএর এত পাইপ লাইনের কাজ হচ্ছে, সেখানেও কোথাও কোন সমস্যা নেই অথচ তারা সার্ভে করে লিখে দিল যে ভারতবর্ষের নোংরা শহরের মধ্যে একটা এই উত্তর ব্যারাকপুর শহর? এটা সর্ববৈব মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্যেশ্য প্রণোদিত। আমি এর বিরুধ্যে চিঠি দিয়ে জানতে চাইবো যে কিসের ভিত্তিতে তারা এটা বললেন।

বেশ অভিযোগের সুর শোনা গেল মলয় বাবুর কণ্ঠে, বললেন, “অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি আমাদের সার্ভিস চার্জ দেয় না। ওদের কাছে প্রায় ২০ কোটি টাকা ন্যায্য পাওনা। সেই জন্য আমি চিঠিও দিয়েছি অনেক, এটা তারই প্রতিহংসা পরায়ণ হতে পারে।

অপরদিকে সূত্রের খবর অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের পৌর ও নগরোন্নয়ন বিষয়ক দপ্তরের মুখ্যসচিব সুব্রত গুপ্ত জানিয়েছেন যে তারা এ সমস্ত সার্ভে বা রিপোর্টের কথা কিছুই জানেননা, এই রাজ্যে নিজস্ব নির্মল বাংলা নামে নিজস্ব স্বচ্ছতা অভিযান আছে। এই ব্যাপারে তিনি আর কোন মন্তব্য করতে চাননি।

সম্পর্কিত সংবাদ